পোকার কবল থেকে আম রক্ষা করতে রাজশাহীর চাষিরা এবার গুনেছেন বাড়তি অর্থ। তাদের যত্নে প্রতিটি গাছেই এখন ঝুলছে থোকায় থোকায় আম। আর কয়েক দিন পরই মধুমাস শুরু হবে। গোপালভোগ দিয়ে শুরু হবে মৌসুম, শেষ হবে গৌড়মতি ও আশ্বিনায়। এবার শেষ পর্যন্ত আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে রাজশাহী জেলায় ৭৮০ কোটি টাকার দুই লাখ ৪৩ হাজার ৯৯৩ টন আম উৎপাদনের আশা করা হচ্ছে।

তবে প্রতিবারের মতো এবারও দাম নিয়ে শঙ্কায় চাষিরা। তারা বলছেন, গত কয়েক বছর ধরেই আমের দাম মিলছে না। দুবছর ধরে বন্ধ রয়েছে বিদেশে আম রপ্তানি। এবারও রপ্তানি নিয়ে নেই কোনো আশার বাণী।
চাষিরা জানান, এবার আমে হাপার ও কারেন্ট পোকার আক্রমণ ছিল খুব বেশি। তাদের যত্নে সেই আক্রমণ থেকে বারবার রক্ষা পেয়েছে আম। তবে বারবার স্প্রে করার ওষুধ কিনতে গিয়ে আমের উৎপাদন খরচ বেড়েছে। আমের মুকুল থেকে গুটি কিছুটা বড় হওয়া পর্যন্ত ছিল প্রচণ্ড খরা ও অনাবৃষ্টি। এ সময় লেগেছে অতিরিক্ত সেচ। সব মিলিয়ে আম উৎপাদন খরচ এবার অন্যবারের তুলনায় বেশি।
চাষির পরম যত্নে গাছে গাছে ঝুলছে আমের থোকা। তবে এটা শুধু আম নয়, তাঁর স্বপ্নও। কোনো কোনো চাষির পরিবারের সারাবছরের আয়, সন্তানের পড়ার খরচ কিংবা দৈনিক বাজারের উৎস হিসেবে এই আমই তাদের সম্বল।
তারা বলছেন, ফলের রাজা হলেও দামের বেলায় আমের কদর নেই। দেশে পেয়ারার কেজি ১০০ টাকা হলেও কোনো অভিযোগ ওঠে না। কিন্তু হিমসাগর, ল্যাংড়ার মতো সুমিষ্ট আম ৪০ টাকা কেজিতে কিনতে দাম নিয়ে হতাশায় থাকেন অনেকেই।
পুঠিয়া সদর পৌরসভার পীরগাছা গ্রামের চাষি আব্দুর রহমান বলেন, আমের দাম নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনে সরকারিভাবে হিমাগার বানাতে হবে। যেন মৌসুমের আম কিছুদিন হিমাগারে থাকে। এই আমগুলো এক মাস সংরক্ষণ করা গেলেও দ্বিগুণ দাম পাবেন চাষিরা। কিছু আম বিদেশে রপ্তানি করা গেলেও ন্যায্য দাম পাওয়া যাবে।
দাম না পেয়ে সাবাড় হচ্ছে আমবাগান
গত বছর রাজশাহী জেলায় আমবাগান ছিল ১৯ হাজার ৬০৩ হেক্টর জমিতে। এ বছর তা কমে হয়েছে ১৯ হাজার ৬২ হেক্টর। দাম না পেয়ে অনেকেই আমবাগান কেটেছেন। তারা বিকল্প লাভজনক ফসলে বা পুকুর খননে ঝুঁকছেন। কৃষি অফিসের হিসাবে, এ বছর প্রায় ৫৪১ হেক্টর জমির আমবাগান কেটে ফেলা হয়েছে।
বাঘা পৌরসভার বিদেশে আম রপ্তানিকারক শফিকুল ইসলাম ছানা বলেন, এ বছর আম ভালো আছে। তবে প্রতিবছরই দাম না পাওয়ায় চাষিরা হতাশায় গাছ কেটে ফেলছেন। বাঘায় সবচেয়ে বেশি কাটা পড়েছে লকনা, ফজলি, আশ্বিনা ও গুটি আমের গাছ। এই আমগুলোর উৎপাদন ভালো হয়, কিন্তু দাম নেই। বাগান কেটে মানুষ পুকুর খনন, সবজি চাষ করছেন। কেউ কেউ লাভজনক বিলম্ব আম ব্যানানা, কাটিমন, বারি-৪ আমবাগান করছেন।
বিদেশে আম যাচ্ছে না
সর্বশেষ ২০২৩ সালে রাজশাহীর চাষিরা বিদেশে আম পাঠিয়েছেন। চাষি শফিকুল ইসলাম ছানা বলেন, আমরা বাঘার ২১ জন চাষি উত্তম কৃষি ব্যবস্থাপনা মেনে রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন করি। বিমান ভাড়া বেশি হওয়ার কারণে বিদেশে আর পাঠানো যাচ্ছে না। পাকিস্তান ও ভারত থেকে এক কেজি আম ইউরোপে পাঠাতে ২০০ টাকা ভাড়া লাগে, আমাদের লাগে ৪০০ টাকা। এবারও আমরা রপ্তানিযোগ্য আম চাষ করছি, কিন্তু রপ্তানির আশা দেখছি না।
কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, এ বছর রাজশাহী জেলায় আমবাগান রয়েছে ১৯ হাজার ৬২ হেক্টর জমিতে। এতে ৭৮০ কোটি টাকার প্রায় দুই লাখ ৪৩ হাজার ৯৯৩ টন আম উৎপাদনের আশা করা হচ্ছে। জেলায় আম চাষি রয়েছেন এক লাখ ৪০ হাজার ৭৪৫ জন। এ ছাড়া আরও কয়েক লাখ মানুষ আমের মৌসুমে যুক্ত থেকে জীবিকা নির্বাহ করেন।
রাজশাহী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক পাপিয়া রহমান মৌরী জানান, বিদেশে আম রপ্তানিতে কিছু প্রতিবন্ধকতা আছে। এ কারণে ২০২৩ সালের পর থেকে বিদেশে আম রপ্তানি করা যাচ্ছে না। কৃষি বিভাগ রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন করতে চাষিদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে।
আরও পড়ুন : ২০২৬ সালে যে ৮ দক্ষতা আপনাকে সফলতা এনে দেবে
এদিকে কৃষি বিভাগ আম নামানোর একটি সম্ভাব্য সময়সীমা নির্ধারণ করেছে। এতে আগামী ১৫ মে থেকে গুটি, ২২ মে থেকে গোপালভোগ, ২৫ মে থেকে লক্ষ্মণভোগ ও রানীপছন্দ, ৩০ মে থেকে হিমসাগর, ১০ জুন থেকে ল্যাংড়া ও ব্যানানা, ১৫ জুন থেকে আম্রপালি ও ফজলি, ৫ জুলাই বারি-৪, ১০ জুলাই আশ্বিনা এবং ১৫ জুলাই গৌড়মতি আম নামানো যাবে।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


