প্রত্যেক মুমিনের সর্বোচ্চ আকাঙ্ক্ষা হলো তার আমলসমূহ, বিশেষত নামাজ, আল্লাহর দরবারে কবুল হওয়া। কিন্তু অজ্ঞতা বা অবহেলার কারণে অনেক সময় নামাজে এমন ত্রুটি থেকে যায়, যা এর গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। নামাজ কবুল হওয়ার জন্য হালাল উপার্জনের পাশাপাশি নামাজের বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীণ উভয় শর্ত পূরণ করা আবশ্যক। কোরআন ও হাদিসের আলোকে নামাজ কবুলের গুরুত্বপূর্ণ শর্তসমূহ নিচে তুলে ধরা হলো।
১. ইখলাস: একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নামাজ
নামাজসহ সকল ইবাদত কবুল হওয়ার প্রথম শর্ত হলো ইখলাস বা একনিষ্ঠতা। অর্থাৎ নামাজ শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই পড়তে হবে; নাম-যশ পাওয়ার উদ্দেশ্যে নয়। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেন- ‘বলুন, আমার নামাজ, আমার কোরবানি, আমার জীবন ও আমার মৃত্যু সবই জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য।’ (সুরা আনআম: ১৬২)
আরও ইরশাদ হয়েছে- ‘যে কেউ দুনিয়ার জীবন ও তার শোভা কামনা করে, দুনিয়াতে আমি তাদের কাজের পূর্ণ ফল দান করি এবং সেখানে তাদের কম দেওয়া হবে না। তাদের জন্য আখেরাতে আগুন ছাড়া অন্যকিছু নেই এবং তারা যা করেছিল পরকালে তা নিষ্ফল হবে। আর তারা যা করত তা ছিল নিরর্থক।’ (সুরা হুদ: ১৫, ১৬)
২. সুন্নত মোতাবেক নামাজ আদায়
নামাজ অবশ্যই রাসুলুল্লাহ (স.)-এর শেখানো পদ্ধতিতে আদায় করতে হবে। কোনো নতুন পদ্ধতি বা বিদআত নামাজকে নষ্ট করে দেয়। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে- ‘যে ব্যক্তি আমাদের দ্বীনের মধ্যে এমন কিছু উদ্ভাবন করল, যা এর অন্তর্ভুক্ত নয়, তা প্রত্যাখ্যাত।” (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)
অতএব, নামাজের প্রতিটি কাজ সঠিকভাবে হাদিসসম্মত পদ্ধতিতে আদায় করতে হবে।
৩. ধীরস্থিরতা ও অঙ্গপ্রতঙ্গ স্থির রাখা
তাড়াহুড়ো করে নামাজ পড়া নামাজের সবচেয়ে বড় ক্ষতি। রুকু, সেজদা, কিয়াম ইত্যাদি কাজগুলোতে পূর্ণ স্থিরতা বজায় রাখতে হবে। রাসুল (স.) এক ব্যক্তিকে দ্রুত নামাজ পড়তে দেখে তিনবার নামাজ পুনরায় পড়তে বলেন এবং বলেন, ‘তোমার নামাজ হয়নি।’ (সহিহ বুখারি)
তাড়াহুড়ো থেকে বিরত থেকে নামাজ আদায় করলে মনোযোগ ও খুশু বৃদ্ধি পায়।
৪. শুদ্ধ তেলাওয়াত ও উচ্চারণ
সুরা ফাতিহা ও অন্যান্য কেরাত সঠিকভাবে তেলাওয়াত করা নামাজের মৌলিক শর্ত। এমন ভুল উচ্চারণ করা যাবে না, যা অর্থ বিকৃত করে দেয়। ফুকাহায়ে কেরাম বলেন- কমপক্ষে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের জন্য যে সুরাগুলোর প্রয়োজন, সেগুলো শুদ্ধ করে নেওয়া আবশ্যক, অন্যথায় সে গুনাহগার হবে। (মুকাদ্দামায়ে জাজারিয়া- পৃ. ১১)
৫. বাহ্যিক পবিত্রতা ও শালীনতা
নামাজ হলো আল্লাহর সঙ্গে সরাসরি কথা বলার মাধ্যম। তাই এই পবিত্র কাজটি করার জন্য আমাদের দেহ, পোশাক এবং স্থান—সবকিছুই পবিত্র হওয়া আবশ্যক। আল্লাহ তাআলা বলেন- ‘হে আদমসন্তান! প্রত্যেক নামাজের সময় নিজেকে পরিপাটি কর।’ (সুরা আরাফ: ৩১)
তাই পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন কাপড় পরা এবং সঠিকভাবে অজু করে নামাজ পড়লে তা কবুলের উপযুক্ত হয়। এক্ষেত্রে মিসওয়াকেরও গুরুত্ব রয়েছে। রাসুল (স.) বলেছেন, ‘মিসওয়াক মুখের পবিত্রতা আনে এবং প্রভুর সন্তুষ্টি লাভ করে।’ (সুনান নাসায়ি)
৬. খুশু-খুজু ও মনোযোগ
নামাজের প্রকৃত আত্মা হলো খুশু—আল্লাহর সামনে বিনম্র উপস্থিতি। আর অর্থ বুঝে পড়া উত্তম। অন্তত সুরা ফাতিহা ও ছোট সুরাগুলোর অর্থ জানা উচিত। মনোযোগ ধরে রাখার জন্য নামাজকে আল্লাহর সাথে আলাপ হিসেবে অনুভব করতে হবে এবং দুনিয়াবি চিন্তা থেকে মুক্ত হওয়ার চেষ্টা করতে হবে।
নামাজ কবুল হওয়া আল্লাহর বিশেষ রহমত। আমাদের কর্তব্য হলো নামাজের বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীণ সব শর্ত যথাসাধ্য পূরণ করা এবং নামাজ কবুল হওয়ার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করা। তিনি বান্দার প্রচেষ্টা ও আন্তরিকতাকে ভালোবাসেন।
বর্তমান ব্যস্ত জীবনে আমরা প্রায়শই নামাজে মনোযোগ হারাচ্ছি। এই শর্তগুলো মনে রাখলে আমাদের নামাজ আরও উন্নত হবে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে তাঁর দরবারে গ্রহণযোগ্য নামাজ আদায়ের তাওফিক দান করুন। আমিন।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।