শীতে কাঁচা খেজুরের রস খাওয়ার আনন্দ বিষাদে পরিণত হয় নিপাহ ভাইরাসের সংক্রমণে। বাদুড়ের লালা বা প্রস্রাব থেকে এ রোগে আক্রান্ত হতে পারেন যেকেউ। ভাইরাসটি থেকে দূরত্ব তৈরি করতে পারলেই এ রোগ প্রতিরোধ সম্ভব বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সাধারণত শীত এলেই নিপাহ ভাইরাসের সংক্রমণ বেড়ে যায়। প্রতিবছর ডিসেম্বর থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত দেশে এ ভাইরাসের প্রকোপ বাড়তে শুরু করে। পরিসংখ্যান বলছে, ২০০১-২০২৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের ৩২টি জেলায় নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত মোট ৩৪৩ জন রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ২৪৫ জন মারা গেছেন। অর্থাৎ বাংলাদেশে এই রোগে মৃত্যুর গড় হার ৭১ শতাংশ।
ভাইরাসটি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও এটি প্রতিরোধে সংবাদমাধ্যমে কথা বলেছেন ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ল্যাবরেটরি মেডিসিন-এর ভাইরোলজি বিভাগের প্রধান ডা. আরিফা আকরাম বর্না। আসুন তার দেয়া গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলো একে একে জেনে নিই-
উৎস
প্রাণিবাহিত ভাইরাস। মূলত বাদুড়ের লালা বা প্রস্রাব থেকে রোগটি মানুষে ছড়ায়।
রোগ সংক্রমণ
কাঁচা খেজুরের রস ও অর্ধেক খাওয়া যেকোনো ফল থেকে রোগটিতে মানুষ আক্রান্ত হয়। আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে অন্য ব্যক্তিতে রোগটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
শরীরে প্রতিক্রিয়া
শরীরে প্রবেশের ৪ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে নিপাহ ভাইরাস শরীরে প্রতিক্রিয়া শুরু করে। তবে ক্ষেত্রবিশেষে ভাইরাসটি ৪৫ দিন পর্যন্ত সুপ্ত অবস্থায় থাকতে পারে।
লক্ষণ
প্রাথমিক পর্যায়ে রোগীর তীব্র জ্বর, মাথাব্যথা, পেশিতে ব্যথা, বমি ভাব, গলা ব্যথা কিংবা ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো উপসর্গ দেখা দেয়।
রোগটি জটিল আকার ধারণ করলে রোগীর মাথা ঘোরা, অস্বাভাবিক তৃষ্ণা বোধ করা, জ্ঞান হারিয়ে ফেলা, অসংলগ্ন আচরণ, শ্বাস-প্রশ্বাসজনিত মারাত্মক সমস্যায় ভোগেন।
লক্ষণ গুরুতর হলে রোগী মারাও যান। তবে উপসর্গবিহীন এ রোগ মারাত্মক মস্তিষ্কের প্রদাহজনিত সমস্যা তৈরি করতে পারে।
পরীক্ষা ও শনাক্তকরণ
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিপাহ ভাইরাস শনাক্ত করতে আক্রান্ত ব্যক্তির প্রস্রাব, রক্ত, সেরেব্রো স্পাইনাল ফ্লুইড (RCR, ELISA, Culture) পরীক্ষা করা হয়। এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ জীবাণু হওয়ায় সাধারণত বায়োসেফটি লেভেল-৪ ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করা হয়।
তবে সংগ্রহের সময় নমুনাগুলো যদি নিষ্ক্রিয় করা হয়, সেক্ষেত্রে এটি বায়োসেফটি লেভেল-২ পরীক্ষাগারে সাবধানতার সঙ্গে পরীক্ষা করা যেতে পারে।
প্রতিরোধ
নিপাহ ভাইরাসের কোনো প্রতিষেধক বা ভ্যাকসিন এখনও আবিষ্কৃত হয়নি। তাই রোগটি সম্পর্কে সচেতনাই পারে সংক্রমণ রুখে দিতে। এর জন্য যা মেনে চলা জরুরি তা হলো-
১। খেজুরের কাঁচা বা অপরিষ্কার রস খাওয়া থেকে বিরত থাকা।
২। ফলে দাগ, কাটা কিংবা কামড়ের চিহ্ন থাকলে না খাওয়া।
৩। অসুস্থ ব্যক্তি বা প্রাণীর সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা।
৪। আক্রান্ত ব্যক্তির দ্রুত আইসোলেশন ও কন্টাক্ট ট্রেসিং নিশ্চিত করা।
৫। সন্দেহজনক লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া।
৬। সেবা বা জরুরি প্রয়োজনে আক্রান্ত রোগীর কাছে যেতে হলে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা, মাস্ক ব্যবহার করা।
৭। নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত মায়ের শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানো বন্ধ রাখা, সাহচর্যে না থাকা।
৮। নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তি সুস্থ হলেও অনেকক্ষেত্রে মস্তিষ্কের নানা সমস্যায় ভুগতে দেখা যায়। তাই রোগমুক্তির পরও রোগীকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা।
সর্বোপরি নিপাহ ভাইরাস প্রতিরোধ ও মৃত্যু ঝুঁকি কমাতে সরকারী পদক্ষেপও জরুরি বলে মনে করেন চিকিৎসকরা। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নজরদারি বাড়ানো, সরকারি বিধি-নিষেধ জারি, গণমাধ্যমে রোগটি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ প্রচার, এলাকায় পোস্টার ও লিফলেটের মাধ্যমে জনসচেতনতা বাড়ানোর মাধ্যমেই এ রোগ থেকে নিরাপদে থাকা সম্ভব বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


