দৈনন্দিন জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রকেই প্রভাবিত করে একটি উপাদান। সেটি হলো- তেল। গাড়ির জ্বালানি, ঘর কিংবা বাজারে ব্যবহৃত প্লাস্টিক পণ্য তৈরি, বিদ্যুৎ, এমনকি চাষাবাদে ব্যবহৃত সার উৎপাদনেও তেলের প্রয়োজন হয়।

এত চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতই তেলের ওপর মানুষের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার এক প্রবল আকাঙ্ক্ষা তৈরি করেছে। বিভিন্ন যুদ্ধের কেন্দ্রেও পরিণত হয়েছে তরল পদার্থটি। এটি কোনো জাতিকে যেমন সম্পদশালী করে, তেমনি ঘাটতির কারণে কোনো দেশের অর্থনীতি ধসেও যেতে পারে। কিন্তু কালো, আঠালো এই পদার্থটি কীভাবে বিশ্ব পরিচালনার মূল শক্তিতে পরিণত হলো?
৩০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ: প্রথম ব্যবহার
বর্তমান বিশ্বই তেলকে প্রথম সম্পদ হিসেবে ব্যবহার করছে না। প্রাচীনতম কিছু সভ্যতাও তেলের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল ছিল। প্রাচীন মধ্যপ্রাচ্যের বাসিন্দারা মাটির নিচ থেকে বুদবুদ আকারে ওপরে উঠে আসা অপরিশোধিত তেল ব্যবহার করত। নথিভুক্ত ইতিহাস অনুযায়ী, ব্যবিলনীয়রা (আধুনিক ইরাকিদের পূর্বপুরুষ) তাদের নৌকাকে পানিরোধক করতে এবং ভবন নির্মাণে চুন-সুরকির বিকল্প হিসেবে তেল ব্যবহার করত। মিশরীয়রা মৃতদেহ সংরক্ষণের জন্য মমি তৈরির প্রস্তুতিতেও তেলকে কাজে লাগাত। তবে, এই রহস্যময় কালো পদার্থের পূর্ণ সম্ভাবনা বুঝতে বা তা পুরোপুরি কাজে লাগাতে মানবজাতির আরও দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়।
১৮৫৯: আধুনিক তেল শিল্পের যাত্রা
বর্তমান তেল শিল্পের সূচনা হয়েছিল ১৯ শতকের মাঝামাঝি সময়ে। বাণিজ্যিকভাবে সফল বিশ্বের প্রথম তেল কূপ আবিষ্কার হয় যুক্তরাষ্ট্রে। এরপর উদীয়মান প্রযুক্তি তেল থেকে নতুন নতুন পণ্য তৈরি শুরু করে। যেমন- বসতবাড়িতে আলো জ্বালাতে কেরোসিনের মতো সস্তা জ্বালানি বেশ জনপ্রিয়তা পায়। এর কয়েক বছর পর, পেনসিলভানিয়ার টাইটাসভিলে আমেরিকার প্রথম বাণিজ্যিক তেল কূপ তৈরি করা হয়। ওই কূপের সাফল্য এবং কেরোসিনের ক্রমবর্ধমান চাহিদা তেলের মহোৎসব শুরু করে। যা নতুন নতুন শিল্পের জন্ম দেয়।
১৮৮৫: মোটরগাড়ির জ্বালানি
মোটরগাড়ি আবিষ্কৃত হওয়ার পর তেলের চাহিদা এক লাফে কয়েকগুণ বেড়ে যায়। জার্মান প্রকৌশলী কার্ল বেঞ্জ ১৮৮৫ সালে প্রথম মোটরগাড়ি আবিষ্কার করেন। এই নতুন যানটি চলত গ্যাসোলিন নামক একটি জ্বালানির সাহায্যে। যা ছিল কেরোসিন উৎপাদন প্রক্রিয়ায় উৎপন্ন একটি সস্তা উপজাত। ১৯০৮ সালে হেনরি ফোর্ড যখন সাধারণ মানুষের সাধ্যের মধ্যে গাড়ি তৈরি করেন, তখন থেকে গ্যাসোলিনের চাহিদা নাটকীয়ভাবে বাড়তে শুরু করে।
১৯০৮: আরব রাষ্ট্রে তেল আবিষ্কার
গাড়ির মালিকানা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এর জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত গ্যাসোলিন তৈরির জন্য তেলের চাহিদাও বাড়তে থাকে। ঠিক এই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে তেলের খনি আবিষ্কৃত হয়। অল্প সময়ের মধ্যে ওই অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে আরও তেলের মজুত পাওয়া যায়। সে সময় মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর কাছে তেল উত্তোলনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও জ্ঞান ছিল না। এই সুযোগে পশ্চিমা কোম্পানিগুলো নামমাত্র মূল্যে তেল অনুসন্ধান ও উত্তোলনের অধিকার নিজেদের করে নেয়। পরে মধ্যপ্রাচ্যের এই উৎপাদন এতটাই বাড়ে যে, তা বিশ্বের মোট চাহিদার ৬০ শতাংশের বেশি সরবরাহ করতে শুরু করে।
১৯১৪-১৯১৮: প্রথম বিশ্বযুদ্ধ
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ দেখিয়ে দেয়, একটি জাতির প্রতিরক্ষার জন্য তেল কতটা গুরুত্বপূর্ণ। ওই যুদ্ধের ট্যাঙ্ক, ট্রাক এবং জাহাজ চালানোর জন্য তেলের প্রয়োজন ছিল অপরিহার্য। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে পরাশক্তিগুলোর মধ্যে নৌবাহিনীকে আধুনিক ও সম্প্রসারণের প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছিল। তখন থেকে যুদ্ধজাহাজগুলোকে কয়লার বদলে তেলচালিত ইঞ্জিনে রূপান্তর করা হয়। নিজেদের ভূখণ্ডে না হলেও কেবল উৎপাদনের প্রযুক্তিগত সক্ষমতার করণে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য তেলকে নিজেদের সম্পদ হিসেবে গণ্য করতে শুরু করে। এর অংশ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা তাদের কাছে কৌশলগত অগ্রাধিকারে পরিণত হয়। প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোও একইভাবে তেলের নিজস্ব উৎস নিশ্চিত করতে মরিয়া হয়ে ওঠে।
১৯৪৪: যুদ্ধ শেষে ভাগবাটোয়ারা
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর তৎকালীন বিশ্বনেতারা তেলের আরও গুরুত্ব উপলব্ধি করতে শুরু করেন। তাই তেলের নিয়ন্ত্রণ ছিল যুদ্ধে জয়-পরাজয় নির্ধারণের অন্যতম প্রধান নিয়ামক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালেই সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট এবং ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উনস্টন চার্চিল মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান তেলের মজুতের দিকে নজর রাখছিলেন। ১৯৪৪ সালের ৮ আগস্ট ‘অ্যাংলো-আমেরিকান পেট্রোলিয়াম চুক্তি’ স্বাক্ষরিত হয়। এর মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের তেল যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে ভাগ করে নেওয়া হয়। রুজভেল্ট তখন বলেছিলেন, ‘পারস্যের (ইরান) তেল আপনাদের। ইরাক এবং কুয়েতের তেল আমরা ভাগ করে নেব। আর সৌদি আরবের তেলের কথা যদি বলেন, তবে সেটা আমাদের।’ তবে এই ভাগবাটোয়ারার ব্যবস্থায় সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর জনগণের কোনো মতামত বা অংশগ্রহণ ছিল না।
১৯৫৬: সুয়েজ খাল সংকট
১৯৫০-এর দশকে ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে যেতে শুরু করে। মধ্যপ্রাচ্য তখন তাদের নিজস্ব শক্তির জায়গা বুঝতে পারে। সুয়েজ সংকটের সময় ব্রিটেনের কাছে এই পরিবর্তনটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ব্রিটেন তখন মধ্যপ্রাচ্যের তেল আমদানির জন্য রুট হিসেবে সুয়েজ খাল ব্যবহার করত। মিশর যখন খালের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করে, তখন ব্রিটেনে তেলের দাম বেড়ে যায়। অন্যান্য তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোও তাদের প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে। মুনাফা বাড়াতে আগের চুক্তিগুলো সংশোধন করা হয়।
১৯৭৩: বিশ্বের প্রথম তেল সংকট
উৎপাদনকারী আরব দেশগুলো এ সময় তেলকে তাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে। ১৯৭৩ সালে মিসর ও সিরিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়ায় ইসরায়েল। যা ‘ইয়ম কিপুর’ যুদ্ধ নামে পরিচিত। ওই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে সমর্থন দেয়। এর প্রতিবাদে আরব পেট্রোলিয়াম রপ্তানিকারক দেশগুলোর সংগঠন ‘ওএপিইসি’ পশ্চিমাদের ওপর তেল অবরোধ আরোপ করে। এর ফলে তেলের সরবরাহ কমে যায় এবং দাম প্রায় চার গুণ বাড়ে। বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পশ্চিমা সরকারগুলো মধ্যপ্রাচ্যের একচেটিয়া আধিপত্য ভাঙতে তেলের বিকল্প উৎসের সন্ধান শুরু করে।
১৯৯০: উপসাগরীয় যুদ্ধ
মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর পশ্চিমাদের নির্ভরশীলতা তখনো পুরোপুরি কাটেনি। ১৯৯০ সালে ইরাক যখন কুয়েত আক্রমণ করে এবং দেশটির তেল ক্ষেত্রগুলো দখল করে নেয়, তখন এই নির্ভরশীলতার বিষয়টি স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। দখলদার ইরাকি বাহিনী কুয়েতের ৭০০-এরও বেশি তেলক্ষেত্রে আগুন ধরিয়ে দেয়। সংঘাত বন্ধে কূটনৈতিক সংলাপও হয়েছিল। কিন্তু তা ব্যর্থ হলে মার্কিন নেতৃত্বাধীন বহুজাতিক বাহিনী কুয়েতকে উদ্ধারের অভিযানে নামে। তারা ইরাক দখল করে নেয়। তেলের সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখা ছিল এই যুদ্ধের একটি অন্যতম প্রধান কৌশলগত উদ্দেশ্য।
১৯৯৮: আমেরিকার ফ্র্যাকিং বিপ্লব
পশ্চিমা দেশগুলো তখনো তেল উত্তোলনের নতুন নতুন পদ্ধতি উদ্ভাবনের চেষ্টা করছে। এর মধ্যে ‘ফ্র্যাকিং’ পদ্ধতি উদ্ভাবনের পর তেল শিল্পে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। ফ্র্যাকিং হলো শিলাস্তর বা শেল রক থেকে প্রাকৃতিক গ্যাস ও তেল উত্তোলনের একটি প্রযুক্তি। এই পদ্ধতিতে মাটির গভীরে উচ্চ চাপে তরল পদার্থ পাম্প করা হয়। যা তেলবাহী শিলাগুলোতে ফাটল ধরায় বা ‘ফ্র্যাক’ করে। ফলে সেখান থেকে তেল আহরণ করা সম্ভব হয়। সরকারি অনুদান এবং তেলের উচ্চমূল্যে উৎসাহিত হয়ে ফ্র্যাকিং একটি লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের তেল উৎপাদন বহুগুণ বেড়ে যায় এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল আমদানির পরিমাণ নাটকীয়ভাবে কমে।
আরও পড়ুন : ২০২৬ সালে যে ৮ দক্ষতা আপনাকে সফলতা এনে দেবে
২০১৫: তেলের বাজারে ধস
এই বছর আগে তেলের দাম অনেকটা কমে গিয়েছিল। কারণ, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো তখন তেলকে নতুন হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে। বৈশ্বিক মন্দার কারণে তেলের চাহিদা তখন এমনিতেও কম ছিল। কিন্তু উৎপাদনকারী আরব দেশগুলো সরবরাহ কমানোর পরিবর্তে উৎপাদনের মাত্রা আগের মতোই বজায় রাখে। ফলে দাম কমে যায়। তাদের উদ্দেশ্য ছিল প্রতিদ্বন্দ্বী তেল উৎপাদনকারীদের ক্ষতিগ্রস্ত করা। বিশেষ করে আমেরিকার ফ্র্যাকিং শিল্প, রাশিয়া এবং উত্তর সাগরের তেল উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলো ছিল তাদের লক্ষ্যবস্তু। আয়কে লাভজনক পর্যায়ে রাখতে এসব কোম্পানির জন্য তেলের উচ্চমূল্য ধরে রাখা জরুরি। কিন্তু ২০১৪ সালের শেষ নাগাদ তেলের দাম ৪০ শতাংশের বেশি কমে যায়। ফলাফল পশ্চিমা কোম্পানিগুলো নতুন তেল প্রকল্পে বিনিয়োগের মাত্রা কমিয়ে দেয়।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


