জীবন আর মৃত্যুর মাঝখানের এক ধূসর সীমান্তে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি দীর্ঘ ১৩টি বছর। না ছিল কথা বলার শক্তি, না ছিল নিজের হাতে এক গ্লাস পানি খাওয়ার ক্ষমতা। অবশেষে ভারতের সুপ্রিমকোর্টের এক ঐতিহাসিক রায়ে সেই ‘অন্ধকার’ থেকে মুক্তি পেতে যাচ্ছেন ৩১ বছর বয়সী হরিশ রানা।

তাঁর বৃদ্ধ বাবা-মায়ের আর্তিতে সাড়া দিয়ে আদালত হরিশের ‘লাইফ সাপোর্ট’ সরিয়ে নেয়ার অনুমতি দিয়েছে, যা ভারতে ‘প্যাসিভ ইউথানেশিয়া’ বা পরোক্ষ ইচ্ছামৃত্যুর ক্ষেত্রে এক অনন্য নজির হয়ে থাকবে।
২০১৩ সাল। পাঞ্জাব ইউনিভার্সিটির উজ্জ্বল ছাত্র হরিশ রানা একটি দালানের চার তলা থেকে পড়ে গিয়ে মাথায় মারাত্মক চোট পান। সেই থেকে বিছানাই ছিল তাঁর পৃথিবী।
শ্বাস-প্রশ্বাসের আর খাবারের জন্য দুটো বিশেষ মেডিক্যাল টিউবের মাধ্যমেই টিকে ছিল তাঁর প্রাণস্পন্দন। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় তিনি ছিলেন ‘পারসিস্টেন্ট ভেজিটেটিভ স্টেট’-এ। অর্থাৎ, তাঁর চোখ খুলত, ঘুমের চক্র ছিল, কিন্তু পারিপার্শ্বিক জগতের সাথে কোনো সংযোগ ছিল না।
সুপ্রীমকোর্টের বিচারপতি জে বি পারদিওয়ালা এবং বিচারপতি কে ভি বিশ্বনাথনের বেঞ্চ তাদের রায়ে ব্রিটিশ নাট্যকার ও লেখক শেক্সপিয়রের ‘হ্যামলেট’ নাটকের সেই কালজয়ী উক্তি উদ্ধৃত করেন, ‘টু বি অর নট টু বি’ (থাকা কি না থাকা)। আদালত বলেছে, যখন সুস্থ হবার কোনো আশা থাকে না, তখন একজন চিকিৎসকের চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার বাধ্যবাধকতাও শেষ হয়ে যায়।
আদালতের হৃদস্পর্শী পর্যবেক্ষণে আরও বলেছে, গত ১৩টি বছর ধরে বৃদ্ধ বাবা-মা যেভাবে হরিশের সেবা করেছেন, তাকে আদালত নিঃস্বার্থ ভালোবাসার এক পরম উদাহরণ হিসেবে বর্ণনা করেছে। আদালত নির্দেশ দিয়েছে যে, এই লাইফ সাপোর্ট সরানোর প্রক্রিয়াটি যেন সর্বোচ্চ মেডিক্যাল সংস্থার তত্ত্বাবধানে অত্যন্ত মর্যাদার সাথে এবং পরিকল্পিতভাবে করা হয়, যাতে হরিশের শেষ বিদায়টি যন্ত্রণাময় না হয়।
ভারতে ২০১১ সালে অরুণা শানবাগের মামলার পর পরোক্ষ ইচ্ছামৃত্যু বৈধ হলেও এর প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল। বর্তমান রায়ে সুপ্রিমকোর্ট কেন্দ্রকে অনুরোধ করেছে যেন ‘প্যাসিভ ইউথানেশিয়া’ নিয়ে একটি নির্দিষ্ট আইন তৈরির কথা বিবেচনা করা হয়। আদালতের মতে, এই সিদ্ধান্ত শুধু যুক্তি বা আইনের ওপর ভিত্তি করে নয়, বরং ‘ভালোবাসা, জীবন এবং হারানোর বেদনা’র ওপর দাঁড়িয়ে নেওয়া হয়েছে।
আরও পড়ুন : ২০২৬ সালে যে ৮ দক্ষতা আপনাকে সফলতা এনে দেবে
১৩ বছর আগে যে তরুণের পৃথিবী থমকে গিয়েছিল, আজ আদালতের এই রায় তাঁকে সেই স্থবিরতা থেকে মুক্তি দিল। হরিশ রানার গল্পটি শুধু যন্ত্রণার নয়, বরং এক পরিবারের অবিরাম লড়াই এবং শেষ পর্যন্ত প্রিয়জনকে শান্তিতে বিদায় দেওয়ার এক করুণ উপাখ্যান হয়ে থাকবে।
তথ্যসূত্র: এনডিটিভি ও টাইমস অব ইন্ডিয়া
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


