অস্কার মানে শুধু একটি সোনালি ট্রফি নয়–এই সম্মাননা একজন শিল্পীর জীবনে দীর্ঘ সময় ধরে গড়ে ওঠা বিশ্বাসযোগ্যতা, শ্রম ও সততার চূড়ান্ত স্বীকৃতি। অস্কারের সেই পথে এ বছর যাঁর নামটি ধীরে ধীরে প্রায় নিশ্চিতভাবে এগিয়ে চলেছে, তিনি হলেন জেসি বাকলি। অনেকের ভিড়ে দাঁড়িয়ে তিনি আলাদা হয়ে ওঠেন একটি মাত্র কারণে। তা হলো তাঁর অভিনয়। মঞ্চ, গান আর অভিনয়ের ভেতর দিয়ে জেসির বড় হয়ে ওঠা। তাইতো চরিত্রের ভেতরে ঢোকার জন্য তাঁকে আলাদা করে কোনো দরজা খুঁজতে হয় না। চরিত্রই ধীরে ধীরে এসে তাঁকে ঘিরে ধরে। ২০২৫ সালে মুক্তি পাওয়া ক্লোয়ি ঝাওয়ের ‘হ্যামনেট’ সিনেমায় ঠিক এমনটাই ঘটেছে।

এ সিনেমায় উইলিয়াম শেকসপিয়ারের স্ত্রী অ্যাগনেস হ্যাথাওয়ের চরিত্রে অভিনয় করতে গিয়ে জেসি যেন নিজেকে বিলীন করে দিয়েছেন শোকে বিধ্বস্ত এক মায়ের অস্তিত্বে। এই ছবিটি কেবল একটি ঐতিহাসিক চরিত্রের পুনর্নির্মাণ নয়; এটি সন্তান হারানো এক মায়ের যন্ত্রণার গভীর মানসিক পাঠ। সেই যন্ত্রণাকে অভিনয়ের কৃত্রিম আবরণে নয়, বরং অনুভবে তুলে ধরেছেন জেসি। ভোগ সাময়িকীতে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি নিজেই বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন।
তাঁর কথায়, ‘আমি গান আর অভিনয়ের মধ্যে বড় হয়েছি। কৈশোর থেকে শিল্পচর্চা করার কারণে আমি অবচেতনভাবেই চরিত্রের চাহিদা বুঝতে পারি।’ এই বোঝাপড়াটা হয়তো ‘হ্যামনেট’ সিনেমায় তাঁর অভিনয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল। সিনেমাটি দেখার পর অনেকে জানতে চেয়েছেন, কীভাবে তিনি নিজেকে প্রস্তুত করেছিলেন এমন চরিত্রের জন্য। জেসির উত্তরও ছিল সাদামাটা।
তিনি বলেন, ‘সত্যি বলতে, আমি আলাদা কিছু করিনি।’ এই ‘আলাদা কিছু না করা’র মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে একজন পরিণত শিল্পীর দর্শন। জেসি জানতেন, সিনেমাটি শোকাগ্রস্ত এক মায়ের গল্প। চিত্রনাট্যে সেই শোক লেখা ছিল শব্দে শব্দে। শুটিং শুরুর পর তা কেবল চিত্রনাট্য লেখা কাগজে সীমাবদ্ধ থাকেনি; তা প্রবেশ করেছে জেসির চরিত্রের ভেতরে। দৃশ্য থেকে দৃশ্যে, মুহূর্ত থেকে মুহূর্তে।
তিনি বলেন, ‘শুটিং শুরুর পর ধীরে ধীরে অ্যাগনেস হ্যাথাওয়ের সন্তান হারানোর শোক আমার ভেতরে প্রবেশ করে। শুরুতে যে ভয় কাজ করছিল, সেটিও কেটে যায়।’ জেসির এই ভয় আসলে চরিত্রের গভীরতার ভয়, অনুভূতির ভার বইতে না পারার আশঙ্কা। জেসি সেই ভারকে এড়িয়ে যাননি বরং তাকে জায়গা করে দিয়েছেন নিজের ভেতরে। তিনি বলেন, ‘হ্যামনেট আমার ক্যারিয়ারে শুধু আরেকটি সিনেমা নয়, এটি এক আত্মিক অভিজ্ঞতা।’
এই সিনেমায় অভিনয়ের সুবাদে ২০২৬ সালের ‘গোল্ডেন গ্লোব’ পুরস্কারে সেরা অভিনেত্রীর সম্মাননা পান। সেখান থেকেই শুরু হয়েছে অস্কারের পথে যাত্রা।
জেসির এই যাত্রা হঠাৎ শুরু হয়নি। আয়ারল্যান্ডের কিলার্নির পাহাড়ঘেরা ছোট শহরে শুরু হয়েছিল তাঁর পথচলা। জেসির শৈশব কেটেছে এমন এক পরিবারে, যেখানে টেলিভিশনের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল গান আর গল্প। বাবা কবিতা লিখতেন, মা হার্প বাজাতেন ও গান শেখাতেন। এই পরিবেশই জেসিকে শিখিয়েছে, নিজেকে প্রকাশ করতে ভয় পাওয়া যাবে না। তাইতো স্কুলের ‘ওয়েস্ট সাইড স্টোরি’তে পুরুষ চরিত্রে অভিনয় করা সেই কিশোরী তখনই বুঝেছিলেন, শিল্প মানে নিয়ম ভাঙার সাহস। এরপর থিয়েটারের কঠোর প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে জেসি নিজেকে তৈরি করেন একজন অভিনেত্রী হিসেবে। ধীরে ধীরে তাঁর যাত্রা শুরু হয় সিনেমার পর্দায়। সিনেমায় তিনি খুঁজেছেন অস্বস্তিকর, অসম, ভাঙা মানুষদের গল্প। জেসি বাকলি তাঁর অভিনীত প্রতিটি সিনেমায় নিজেকে বারবার নতুন করে ভেঙেছেন, নতুন করে গড়েছেন। তিনি কখনও নিরাপদ চরিত্র বেছে নেননি, বরং এমন চরিত্রই খুঁজেছেন, যেগুলো তাঁকে ভয় দেখায়।
আরও পড়ুন : ২০২৬ সালে যে ৮ দক্ষতা আপনাকে সফলতা এনে দেবে
২০২৬ সালের অস্কারে সেরা অভিনেত্রীর দৌড় যে কতটা তীব্র ও মর্যাদাপূর্ণ, তার প্রমাণ মিলছে সম্ভাব্য মনোনীতদের তালিকাতে। এই দৌড়ে জেসির সামনে আছেন রোজ বার্ন, কেট হাডসন, নরওয়ের শক্তিশালী অভিনেত্রী রেনাটা রেইনসভে এবং ‘বুগোনিয়া’ ছবিতে অভিনয়ের জন্য আলোচনায় থাকা এমা স্টোন। অভিনয়শৈলী আর তারকা–সব দিক থেকেই এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা যেন একাধিক ঘরানার অভিনয়ের মুখোমুখি অবস্থান। তবু এমন প্রখ্যাত অভিনেত্রীদের সঙ্গে একই কাতারে দাঁড়িয়ে জেসি বাকলি আলাদা করে নজর কেড়েছেন। পুরস্কার জিতবেন কিনা, সেটি শেষ কথা নয়; বরং এই অস্কার দৌড়ে তিনি প্রমাণ করে দিয়েছেন, তিনি সব ধরনের ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


