জুমবাংলা ডেস্ক : এককালের প্রমত্ত পদ্মা তার স্বকীয়তা হারিয়েছে। আগে পদ্মার একুল থেকে ওকুল তাকালেই চোখে পড়তো বিশাল জলরাশি আর ঢেউয়ের পর ঢেউ। কালের পরিক্রমায় সেই পদ্মা এখন ছোট নদীতে পরিণত হয়েছে। স¤প্রতি মাওয়া থেকে শিবচর মাদারীপুর সবচেয়ে ছোট ফেরি ডিএফ লেংটিং ডি ৮০৬১ যোগে পদ্মা নদী পাড়ি দেয়ার সময় দেশের জনপ্রিয় দৈনিক পত্রিকা ইনকিলাবের দুই সাংবাদিকের চোখে পদ্মার স্বকীয়তা হারানোর বিষয়টি নজরে পড়ে। পদ্মার বুক চিরে জেগে উঠেছে বিশাল বিশাল চর। সেখানে চকচকে নতুন টিন দিয়ে নির্মিত হয়েছে ঘরবাড়ি। ফসলাদির চাষ হচ্ছে। গরু, ছাগলসহ বিভিন্ন গবাদি পশুও চরে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

চর

Advertisement

নদী পারাপারে চলছে দ্রুতগামী স্পিডবোট, লঞ্চ ও ফেরি চলাচল করছে। তবে যখনই তিনটি জলযান পাশাপাশি কিংবা আগে পিছে চলাচল করছে তখন পদ্মাকে খালের মতো সরু দেখাচ্ছে। নদীতে গভীরতাও অনেক কম তাই কোথাও কোথাও ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে বালু উত্তোলন করে গভীরতা বৃদ্ধির কাজ চলছে।

পদ্মাসেতু থেকে দৌলতদিয়া ঘাট পর্যন্ত প্রায় ৫০ কিলোমিটার পথ। গোটা প্রমত্তা পদ্মার বুক জুড়ে শুধুই ধুধু বালুচর। নদীর মাঝখানে কোথাও বালুর মাঠ। কোথাও বিশাল বিশাল চড়। আবারও কোথাও পদ্মা শুকিয়ে হয়েছে ফাঁকা হাট ও ফাটা মাঠ। মোটকথা, পদ্মা জুড়েই এখন বালুর পথ। পদ্মাসেতু থেকে দৌলতদিয়া ঘাট পর্যন্ত প্রমত্ত পদ্মার দুই তীরে এখন বালুর কৃত্রিম সড়কে পরিণত হয়েছে। পদ্মা বেষ্টিত এই পথ দিয়ে মানুষ এখন কৃত্রিম সড়ক তৈরি করে বালুর পথেই হাঁটছে মানুষ। এ পথের নাই কোনো শেষ। কারণ কাঁদা সড়ক ও কাঁদা মাটির সড়কে হাঁটলে পথ আগানোও গেলেও বালুর পথে আগানো সম্ভব নয়।

পদ্মা সেতুতে একদিকে যেমন বৃহত্তর ফরিদপুরসহ দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলসহ ২১ জেলার মানুষের ভাগ্যের দুয়ার খুললেও পদ্মা পাড়ের মানুষের ভাগ্যের দুয়ার বন্ধ হয়ে গেছে। এক সময় যারা পদ্মা নদীর উপর নির্ভর হয়ে সংসার সন্তান এবং জীবন-জীবিকা পরিচালিত করত সে সকল পরিবারগুলো আজকে পথে বসতে শুরু করছে। এই বিষয়ে কথায়, ফরিদপুর নদী গবেষণার কর্মকর্তার সাথে। তিনি পানি এবং নদী নিয়ে কাজ করেন, এরকমই একজন বিশেষজ্ঞদের সাথে। তিনি নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক।

তিনি বলেন, পদ্মা সেতু হওয়ার আগে পদ্মার বুকে এত বিশাল বিশাল চর এবং দুপাশে বালুর পথ কখনোই দেখা যায়নি। তিনি কারণ হিসেবে দেখছেন, উজান থেকে ধেয়ে আসা বানের পানির সাথে যে পরিমাণ বালু মাটি এবং পলি মাটি আমাদের অঞ্চলে ডুকছে সেই বালু মাটি এবং পলিসহ স্রোতের তোরে পদ্মার প্রত্যেকটি পিলারের সাথে ধাক্কা খেয়ে আবার বিপরীত দিকে ছুটছে।

সেই বালু ও পলিযুক্ত বালুগুলো ঘুরে আবার পদ্মাসেতুর উপরিভাগেও সরতে থাকে। ফলশ্রুতিতে, পদ্মারসেতুর ওপর পাশে তথা বিপরীতমুখী বালুচরও। সেতুর পূর্বে বালুর মাঠ। পশ্চিমেও বালুর মাঠ। মাঝখানের পদ্মা এখন মরা খাল। এবং প্রমত্ত পদ্মার দুই পাশে হয়ে উঠছে কৃত্রিম বালুর পথ।

সাথে কথা হয় মাদারীপুর জেল শিবচর উপজেলার কাঠালবাড়িয়া লঞ্চঘাটের রহমত তালুকদারের সাথে। তিনি বলেন, পদ্মাসেতু নির্মাণ হওয়া যেমন ২১ জেলাবাসী সড়ক পথে এবং রেলপথে ব্যাপক সুযোগ সুবিধা ভোগ করছেন। তেমনি যোগাযোগ বিপ্লবও ঘটেছে। পাশাপাশি ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, বরিশাল, ভোলা, পটুয়াখালী, পিরোজপুর, বরগুনার সাথে যোগাযোগ ব্যবস্থায় যেমন দুই গুন সময় কমেছে। তেমনি সড়কপথে ব্যবসা-বাণিজ্যের খরচের পরিমাণ কমে আসছে।। এক কথায় সময় ও কমছে খরচ কমছে।অপরদিকে, ফরিদপুর থেকে উল্লেখিত জেলাগুলোতে ব্যবসা করেন মো. রহমান আলী তিনি ইঞ্জিনচালিত নৌকা করে ফরিদপুর থেকে পাট, খড়ি, শনপাতা সহ নানা ধরনের সামগ্রী ভোলা পটুয়াখালী পিরোজপুর ওই এলাকায় নিয়ে যান এবং ওই এলাকা থেকে সুপারি পেয়ারা এগুলো কিনে ফরিদপুরে আনেন সবকিছুই করে নৌপথে। তিনি আরো বলেন, নদীপথে খুব আরামে যাই এবং আরামে আসি চোর ডাকাতের ভয় ও নেই চাঁদাও দেয়া লাগে না এবং খরচ কম। যেখানে নৌকা নিয়ে সহজে পৌঁছানো যায় সেখানে সড়কপথে ডাবল খরচ হয়।

ফরিদপুর জেলার ভাঙ্গা উপজেলার চান্ডা বাজারের মোহাম্মদ আজাদ মোল্লা সাথে। তিনি বলেন, একসময় পদ্মার মধ্যে সারারাত জেগে নৌকায় বসে জাল দিয়ে মাছ ধরে চান্দ্রা বাজারে পাঁচ থেকে সাত হাজার টাকা বিক্রি করতাম। আজকে সেই পদ্মায় পানি নাই। নাই নৌকা চালানোর জায়গাটুকু। সেতু হওয়ার আগেই আমরা ভালো ছিলাম। তবে সড়ক যোগাযোগ ভাল হইছে।

সাথে কথা হয় ভাঙ্গা পুলিয়া বাজারের মো. রহমান বেপারীর সাথে তিনি পেশায় একজন বলগেট চালক। তিনি বলেন, এই পদ্মা দিয়ে চান্দ্রা বাজার এলাকা থেকে বড় বড় ফরিয়ে নৌকা এবং ইঞ্জিনচালিত নৌকা নিয়ে ঢাকা দোহার সদরঘাট, নারায়ণগঞ্জ মুন্সিগঞ্জ নবাবগঞ্জ দোহর এলাকায় পাট-পাট খড়ি এবং নৌকা নিয়ে ব্যবসা করতাম। এখন এই সময় ছিল ব্যবসার ভরা মৌসুম। অথচ এ সময় পদ্মায় পানি নেই। যেদিকে তাকাই সেদিকেই শুধু ধুধু বালুচর বালুর পথ আর বালুর মাঠ।

এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় সদরপুর উপজেলার সরমানার এলাকার স্কুলশিক্ষক মোহাম্মদ কোবাদ ব্যাপারীর সাথে। তিনি বলেন, আমি ছোটবেলায় পদ্মার পাড়ে বাদাম এবং আলু চাষ করতাম। সেই সময় দেখেছি প্রমত্তা পদ্মার চোখের সামনে মিনিট এবং সেকেন্ডের মধ্যে বহু বাড়িঘর ভেঙে নিয়ে গেছে শত শত বিঘা জমিসহ। আজকে সেই পদ্মায় পানি নেই। বালুর মাঠ বালুর পথ কোথাও খেলার মাঠ। কোথাও পর্দা জুড়ে সবুজের সমাহার।

প্রতিবেদকের সঙ্গে সাথে কথা হয় সদরপুর উপজেলার হাজিগঞ্জ বাজার ব্যবসায়ী মো. আবুল হোসেন হাওলাদারের সাথে তিনি বলেন, সিএন্ডবি ঘাট থেকে হাজিগঞ্জ বাজারে আমরা নৌকায় আসতাম আরাম করে। আনন্দ ভ্রমণ হতো ব্যবসায় ও যাতায়াতে। আজ সেই প্রমত্ত পদ্মা এখন মরা খাল। পদ্মা জুড়েই মরুভ‚মি। ধুধু বালুচর আর ধুধু বালুর মাঠ। পদ্মা নদীর দুই পাড়েই জেগেছে কৃত্রিম বালুর রাস্তা।

প্রতিবেদকের সঙ্গে সাথে কথা হয় চর হরিরামপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা মোহাম্মদ কমলের সাথে, তিনি বলেন, পদ্মাসেতু হওয়ায় আমাদের বিশাল উপকারও হয়েছে ঠিক। যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো হয়েছে কিন্তু পদ্মার বুকে বালু আর পলি জমে বিশাল বিশাল চর জেগে উঠায় হাজার জেলেরা বেকার হয়েছে। পদ্মা এখন খেলার মাঠ। কোথাও পালন হচ্ছে ঘুরি উৎসব।

ব্যবসা-বাণিজ্য সহজ যোগাযোগের রাস্তা নদীপথ। বেশিরভাগই নিরাপদ আরামদায়ক এবং সাশ্রয়ী। কিন্তু সেই নদী পথ এখন শুকিয়ে পরিণত হয়েছে মরা খালে। ফরিদপুর জেলার সদর, সদরপুর, চরভদ্রাসন, গোয়ালন্দ, হাজীগঞ্জ বাজার, কাঁঠালবাড়িয়ার মুল ঘাট থেকে পদ্মার পানি নিচে নেমে যাওয়ায় শহর ও উপর শহরের খেয়াঘাটগুলো ৪/৫ কিলোমিটার উত্তরে সরে গেছে। ফলে চরবাসীর চরম ভোগান্তি বাড়ছে। খেয়াঘাট পর্যন্ত পৌঁছাতে আবার অন্য বাহন ব্যবহার করতে হয়। অর্থের অভাবে যারা গাড়ীতে উঠেন না তারা কমপক্ষে দুই আড়াই কিলোমিটার কোথাও তিন কিলোমিটার পায় হেঁটে খেয়াঘাটে গিয়ে নৌকায় উঠতে হয়।এক সময় পদ্মা এলাকার তথা নদী সংলগ্ন এলাকার শত শত মানুষ যারা নৌকা এবং জাল দিয়ে মাছ ধরে বাজারে বিক্রি করতেন। জেলেরা জাল দিয়ে এবং বাঁশের তৈরি দুয়ারী এবং মাছ মারার বিভিন্ন ফান পেতে মাছ ধরে বাজার বিক্রি করত। জেলেদের মাছ ধরার সেই নির্ধারিত এবং নির্দিষ্ট স্থানগুলোতে অর্থাৎ মাছের অভয় অরণ্যের জায়গায় শুধুই ধুধু বালুচর বালুর মাঠ এবং বালুর পথ। জেলেদের মাছ ধরার জায়গা থেকে পানি সরে গেছে কমপক্ষে ৫ কিলোমিটার উত্তরে।

পদ্মার বুক জুড়ে শুধু নৌকা আর নৌকা। পড়ে শত শত বাঁশের তৈরি মাছ মারার দুয়ারী। পদ্মার বুক জোড়া চরে নৌকা আছে নাই পানি। কারণ এই নৌকা দিয়েই ছেলেরা মাছ ধরতে পদ্মার বুকে। এখন সে নৌকা এবং মাছ ধরার দুয়ারী এবং জাল অলসভাবে পড়ে আছে বালুচরে।

পদ্মা সেতু থেকে দৌলতদিয়া ঘাট পর্যন্ত প্রায় ৫০ কিলোমিটার নদীপথে দুপাশে এখন বালুর পথ। মাঝে মাঝে পদ্মার বুকে বিশাল বড় বড় চর চর এবং বালুর পথ কেটে স্থানীয় ক্ষমতাবান ব্যক্তিরা বালু লুটের নেশায় মেতে উঠছেন। রাতভর জলে পদ্মায় বালু কাটার উৎসব। কোথাও চলে সন্ধ্যা ভোরের আজান পর্যন্ত বাল লুটেরন উৎসব। ফরিদপুর সদর, সদরপুর, চরভদ্রাসন, কাঠালবাড়ি ঘাট, মুন্সিগঞ্জের পদ্মানদী, মেলেং, নবাবগঞ্জ, দোহার, ন্যাচরাগঞ্জ, হাজীগঞ্জ, হরিরামপুর, কাঁঠালবাড়ি ঘাট, কাঁচি কাটারচর, শয়তান খালীর চর, ধুলার মোড়, সিএন্ডবি, গোয়ালন্দ উপজেলার উজানচর ইউনিয়নের পদ্মা, এলাকায় বালুকাটার উৎসব চলছে অবিরাম।

পদ্মার দু’পাশে জেগে ওঠেছে বালুর পথ। পদ্মা নদীর একই নিয়ম। নদীর এক পাশ ভাঙ্গে এবং একপাশ গড়ে। সেই ভাঙ্গা গড়ার মধ্য দিয়ে, ফরিদপুর অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রা এগিয়ে যাচ্ছে। অথবা কেউ পিছিয়ে পড়ছে। বের সাথে কথা হয় মাদারীপুর জেলার শিবচর উপজেলার পাচ্চর বাজারে মো. সুমন শিকদারের সাথে তিনি বলেন, আমাদের দেখা মত এবং জানামতে পাচ্চর এলাকার কমপক্ষে ১ থেকে ১৫০ জন জেলা পরিবার নদীতে মাছ মেরে তাদের জীবন সংসার চালাত। আজকে পদ্মায় পানি নেই। জেগে উঠছে শত শত বিঘা বালুর মাঠ।

সফল উদ্যোক্তা হতে গেলে যা করবেন

জেলেরা বাধ্য হয়ে তাদের পেশা পরিবর্তন করছেন। কেউ দিন মজুর। কেউ মাটি কেটে পেট চালায়। কেউ নাপিত কেউ হয়েছে ধোপা। বাদাম বিক্রেতা পান দোকানি কেউ বুট পালিশ ওয়ালা। পেটের দায় এবং সংসারের সন্তানের মুখে একমুঠু ভাত তুলে দেয়ার জন্য কেউ কাজ করছেন, কাজ না রাজমিস্ত্রির জোগালিয়া হয়ে।

সূত্র : দৈনিক ইনকিলাব

Zoom Bangla News
Zoom Bangla News
inews.zoombangla.com
Follow

Follow Zoom Bangla News On Google

Open the Google follow page and tap the checkmark option to receive more updates from Zoom Bangla News in your Google news feed.

Follow Zoom Bangla News On Google

Shamim Reza is an experienced journalist and sub-editor at Zoom Bangla News, with over 13 years of professional experience in the field of journalism. Known for his strong writing skills and editorial insight, he contributes to producing accurate, engaging, and well-structured news content. Born and brought up in Jashore, his background and experience shape his deep understanding of social and regional perspectives in news reporting.