দেশের পরিবহন খাত থেকে প্রতিবছর বিপুল অঙ্কের রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। মোটরসাইকেল, থ্রি-হুইলার, বাস-মিনিবাস, ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান এবং প্রাইভেট কার—এই পাঁচটি প্রধান খাত থেকে বর্তমানে সরকারের বার্ষিক রাজস্ব আয় প্রায় তিন হাজার ৯৮৩ কোটি টাকা। তবে বিদ্যমান কাঠামো পুরোপুরি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে এই আয় বেড়ে দাঁড়াতে পারে প্রায় সাত হাজার ৫০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, নজরদারির ঘাটতি ও অনিয়মের কারণে বছরে প্রায় তিন হাজার ৫১৭ কোটি টাকার সম্ভাব্য রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার।

রাজস্ব

Advertisement

সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যানবাহন নিবন্ধন, ফিটনেস ফি, রুট পারমিট ফি, আমদানি শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক ও বার্ষিক কর আদায় সরকারের রাজস্ব আয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎস হতে পারে। অথচ বাস্তবে এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হচ্ছে না। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, আইন ও নীতিমালা যথাযথভাবে কার্যকর করা গেলে এই খাত থেকেই রাজস্ব আয় প্রায় দ্বিগুণ করা সম্ভব।

খাত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, এই ঘাটতির প্রধান কারণ ফিটনেসবিহীন, নিবন্ধনহীন ও মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহনের অবাধ চলাচল। পাশাপাশি রুট পারমিট ছাড়া যান চলাচল এবং কর ফাঁকিও বড় ভূমিকা রাখছে।

খাতভিত্তিক তথ্যে দেখা যায়, মোটরসাইকেল খাত থেকে বর্তমানে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রাজস্ব আসে। এই খাত থেকে বছরে প্রায় এক হাজার ৩৬০ কোটি টাকা আদায় হলেও সম্ভাব্য আয় দুই হাজার এক কোটি টাকার বেশি। অর্থাৎ শুধু এই খাতেই প্রায় ৬৪১ কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতি রয়েছে। ধারণা করা হয়, প্রায় চার লাখ মোটরসাইকেল ফিটনেসবিহীন বা নিবন্ধন নবায়ন ছাড়া চলাচল করছে।

সিএনজি ও এলপিজিচালিত থ্রি-হুইলার খাতে বর্তমানে প্রায় ৩৬২ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হলেও সম্ভাব্য আয় প্রায় ৮৮০ কোটি টাকা। এতে রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়ায় প্রায় ৫১৭ কোটি টাকা।

অন্যদিকে ব্যাটারিচালিত ইজি বাইক খাতে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। এই খাতে বর্তমানে রাজস্ব আদায় মাত্র ১৭ দশমিক ৫ কোটি টাকা হলেও সম্ভাব্য আয় ৯০৫ কোটি টাকার বেশি। ফলে একক এই খাত থেকেই প্রায় ৮৮৮ কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। দেশে প্রায় চার থেকে পাঁচ লাখ অনিবন্ধিত ইজি বাইক চলাচল করছে বলে ধারণা করা হয়।

বাস ও মিনিবাস খাতে রুট পারমিট ও ফিটনেস সমস্যার কারণে রাজস্ব ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এখানে সম্ভাব্য আয় ৬৭০ কোটি টাকা হলেও বর্তমানে আদায় হচ্ছে মাত্র ১৯৮ কোটি টাকা। ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান খাতে সম্ভাব্য আয় ৬৯৭ কোটি টাকা হলেও বাস্তবে আদায় হচ্ছে ২৭৫ কোটি টাকা। প্রাইভেট কার খাতেও কর ফাঁকি ও ফিটনেস নবায়ন না করার কারণে প্রায় ৫৬০ কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই ক্ষতি শুধু অর্থনৈতিক নয়, বরং পরিবেশ ও সড়ক নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিবছর প্রায় ৩১ হাজার ৫৭৮ জনের মৃত্যু ঘটে। যদিও সরকারি হিসাবে এই সংখ্যা অনেক কম। বিশেষজ্ঞদের মতে, অননুমোদিত ও ফিটনেসবিহীন যানবাহনের চলাচল এসব দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ অনুযায়ী বাসের ইকোনমিক লাইফ ২০ বছর, ট্রাকের ২৫ বছর এবং সিএনজি/এলপিজি থ্রি-হুইলারের ক্ষেত্রে ১৫ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে। মোটরসাইকেলের জন্য নির্দিষ্ট মেয়াদ না থাকলেও ফিটনেস সার্টিফিকেট বাধ্যতামূলক। কিন্তু বাস্তবে বহু যানবাহন এই নিয়মের বাইরে চলাচল করছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে প্রায় পাঁচ লাখ ৬৮ হাজার রেজিস্টার্ড যানবাহনের ফিটনেস নেই এবং এ সংখ্যা প্রতিবছর বৃদ্ধি পাচ্ছে। এসব যানবাহন ঢাকার বায়ুদূষণের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের জন্য দায়ী।

পরিবহন খাত বিশ্লেষকদের মতে, সমস্যার মূল কারণ তথ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা। নিবন্ধন, ফিটনেস, কর ও রুট পারমিট—এই চারটি ব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয় না থাকায় অনিয়ম নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না।

তাদের মতে, একটি সমন্বিত ডিজিটাল ডেটাবেইস তৈরি করা গেলে কর ফাঁকি ও অনিয়ম অনেকাংশে কমানো সম্ভব।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ফিটনেস ও নিবন্ধন নবায়ন বাধ্যতামূলক করা, অনিবন্ধিত যানবাহনকে আইনের আওতায় আনা, রুট পারমিট ব্যবস্থার ডিজিটালাইজেশন এবং কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে স্ক্র্যাপনীতি কার্যকর করে মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন সড়ক থেকে সরিয়ে ফেলাও প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক পরিকল্পনা, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং কঠোর আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করা গেলে পরিবহন খাতই হতে পারে সরকারের অন্যতম বড় রাজস্ব উৎস। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় সেই সম্ভাবনার বড় অংশই এখনো অধরাই রয়ে গেছে।

সৌজন্যে: কালের কণ্ঠ

Zoom Bangla News
Zoom Bangla News
inews.zoombangla.com
Follow

Follow Zoom Bangla News On Google

Open the Google follow page and tap the checkmark option to receive more updates from Zoom Bangla News in your Google news feed.

Follow Zoom Bangla News On Google

Mynul Islam Nadim is a journalist at Zoom Bangla News, contributing to news writing and editorial support. He is involved in refining content to ensure accuracy, clarity, and consistency for digital platforms. His work reflects a commitment to responsible journalism and audience-focused reporting.