জুমবাংলা ডেস্ক : ভাড়া বাড়তে যাচ্ছে ১০০ কিলোমিটারের অতিরিক্ত দূরত্বের সব ধরনের যাত্রীবাহী ট্রেনের। মূলত ১০০ কিলোমিটারের বেশি ভ্রমণে রেয়াতি (ছাড়) সুবিধা বাতিলের মাধ্যমে এ ভাড়া বাড়ানো হচ্ছে। এর পাশাপাশি ট্রেনে নির্ধারিত সংখ্যার অতিরিক্ত সংযোজিত কোচের ভাড়ার সঙ্গে বাড়তি চার্জ যুক্ত করার মাধ্যমেও আয় বাড়ানোর পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

ট্রেন

Advertisement

এ বিষয়ে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের কাছ থেকে এরই মধ্যে অনুমোদন পেয়ে গেছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। বর্ধিত ভাড়া কার্যকরের জন্য টিকিট ব্যবস্থাপনায় নিযুক্ত বেসরকারি অপারেটর সহজকে (জেভি) এরই মধ্যে স্টেশন টু স্টেশন বাণিজ্যিক দূরত্বের হিসাবও হস্তান্তর করা হয়েছে। অনলাইনের পাশাপাশি অফলাইনেও (ম্যানুয়াল প্রক্রিয়া) ভাড়া বাড়ানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। আগামী মাসেই নতুন এ ভাড়া কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে। সেক্ষেত্রে আগামী ১ এপ্রিল থেকেই এটি কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা বেশি বলে রেলওয়ে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

রেল কর্মকর্তারা বলছেন, সড়ক ও নৌপথের তুলনায় ভাড়া কম হওয়ায় সাম্প্রতিক বছরগুলোয় রেলের যাত্রী বাড়লেও রাজস্ব আয় সেভাবে বাড়েনি। আয়ের বিপরীতে ব্যয় বেশি হওয়ায় লোকসানের বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসতে পারছে না রেলওয়ে। ট্রেনের ভাড়া সর্বশেষ বাড়ানো হয়েছিল ২০১৬ সালে। এরপর রেলের জ্বালানি-যন্ত্রাংশ এবং কর্মীদের বেতন-ভাতাসহ পরিচালন ব্যয় বাড়লেও সংস্থাটির ভাড়া বাবদ আয় তেমন বাড়েনি। কয়েক দফায় রেলের ভাড়া বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তা রাজনৈতিক বিবেচনায় কার্যকর হয়নি। যদিও আয়-ব্যয়ের অসামঞ্জস্যে লোকসান থেকে বের হতে পারেনি রেলওয়ে।

রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে বাংলাদেশ রেলওয়ের ব্যয় ছিল ৩ হাজার ৩০৭ কোটি টাকা। যদিও একই সময়ে আয় করেছে ১ হাজার ৭৮৩ কোটি টাকা। এ অনুযায়ী গত অর্থবছরে আয়ের চেয়ে ১ হাজার ৫২৪ কোটি টাকা বেশি ব্যয় করেছে রেলওয়ে। সংস্থাটি এর আগে নিট লাভে ছিল শুধু ১৯৯৮-৯৯ অর্থবছরে। ওই সময়ে সংস্থাটির নিট লাভ ছিল ১৮ কোটি ৪৭ লাখ ৯১ হাজার টাকা। এরপর প্রায় আড়াই দশক ধরে টানা লোকসান দিয়েছে সংস্থাটি। এ অবস্থায় পরিচালন আয় বৃদ্ধিতে নানামুখী পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে রেলওয়ে। যাত্রী ভাড়া বাবদ আয় বাড়ানোর পাশাপাশি মনোযোগ দেয়া হচ্ছে রুট বৃদ্ধি ও পণ্য পরিবহনেও।

এর আগে ২০১২ ও ২০১৬ সালে ভাড়া বাড়িয়েছিল রেলওয়ে। ২০১২ সালের অক্টোবরে সর্বনিম্ন ৫ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ১১০ শতাংশ পর্যন্ত ভাড়া বাড়ানো হয়েছিল। পরে ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে আরেক দফায় রেলের ভাড়া বাড়ানো হয় ৭-৯ শতাংশ। এর প্রায় সাত বছর পর ২০২৩ সালের শেষার্ধে রেলওয়ের বিভিন্ন সেতু ও ভায়াডাক্টে পন্টেজ চার্জ আরোপের মাধ্যমে আয় বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হয়। এর ধারাবাহিকতায় এখন উদ্যোগ নেয়া হয়েছে ১০০ কিলোমিটারের বেশি ভ্রমণে যাত্রীদের ভাড়ায় রেয়াতি সুবিধা প্রত্যাহারের। এর পাশাপাশি বিভিন্ন ট্রেনে সংযোজিত অতিরিক্ত কোচে শ্রেণীভেদে বাড়তি ভাড়া (রিজার্ভেশন চার্জ) যুক্ত করা হচ্ছে। রেলসংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, রেয়াতি সুবিধা প্রত্যাহার ও রিজার্ভেশন চার্জ আরোপের মাধ্যমে ভাড়া বাড়ানো হলে রেলের বার্ষিক রাজস্ব আয় বাড়বে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা।

এ বিষয়ে নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে বাংলাদেশ রেলওয়ের অপারেশন বিভাগের শীর্ষস্থানীয় এক কর্মকর্তা বলেন, ‘রেলওয়ের উন্নয়নে সরকার এরই মধ্যে ১ লাখ কোটি টাকারও বেশি বিনিয়োগ করেছে। বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে রেলসেবাকে আন্তর্জাতিক মানে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে রেলের ভাড়া বাড়ানো নিয়ে সরকারের কিছুটা দোটানা রয়েছে। যদিও প্রতি বছর রেলের লোকসান বেড়েই চলেছে। এজন্য বিদ্যমান বিভিন্ন সুবিধা প্রত্যাহার করে ভাড়া বাবদ আয় বাড়ানোর পথে হাঁটতে হচ্ছে রেলওয়েকে।’

রেলের ভাড়ায় দূরত্বভিত্তিক রেয়াতি সুবিধা চালু হয়েছিল ১৯৯২ সালে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ওই সময় রেলের যাত্রী ও মালামাল পরিবহন হতো সক্ষমতার তুলনায় কম। যাত্রী ও মালামাল পরিবহন আকৃষ্ট করতে ওই সময় দূরত্ব ও সেকশনভিত্তিক রেয়াতি সুবিধা চালু করা হয়। এর মধ্যে সেকশনভিত্তিক রেয়াতি প্রত্যাহার করা হয় ২০১২ সালে। দূরত্বভিত্তিক রেয়াতি সুবিধার কারণে দূরপাল্লার ভ্রমণে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের ভাড়া নির্ধারণ হয় দূরত্বের তুলনায় কম। ঢাকা-কক্সবাজার নতুন রেলরুট ছাড়া (ঢাকা-কক্সবাজার) সারা দেশের সব ট্রেনেই ১০০ কিলোমিটারের বেশি দূরত্বের জন্য রেয়াতি সুবিধা বহাল রয়েছে। এক্ষেত্রে ১০১ থেকে ২৫০ কিলোমিটার দূরত্বের জন্য রেয়াতের হার ২০ শতাংশ। আর ২৫১ থেকে ৪০০ কিলোমিটারের জন্য রেয়াতের হার ২৫ শতাংশ।

রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ বলছে, রাজধানী ঢাকার সঙ্গে চট্টগ্রামের নন-এসি বাসের ভাড়া ৬৮০ টাকা। যদিও রেলের আন্তঃনগর ট্রেনের একই সুবিধার আসনে ভাড়া ৩৪৫ টাকা। এছাড়া লোকাল, মেইল বা এক্সপ্রেস ট্রেনে ঢাকা-চট্টগ্রামে ভাড়া ১২০ থেকে ১৫০ টাকার মধ্যে। এতে রেলযাত্রায় বাড়তি চাপ সৃষ্টির পাশাপাশি টিকিট কালোবাজারি হলেও প্রাপ্য রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে রেলওয়ে। গত অক্টোবরে পন্টেজ চার্জ আরোপের মাধ্যমে বিভিন্ন রেলসেতুর প্রতি কিলোমিটারকে ২৫ কিলোমিটার এবং ভায়াডাক্ট বা রেল ফ্লাইওভারের প্রতি কিলোমিটারকে পাঁচ কিলোমিটার হিসাব করে বাণিজ্যিক দূরত্ব নির্ধারণের প্রক্রিয়া শুরু হয়। এতে রেলপথে প্রকৃত দূরত্বের সঙ্গে বাণিজ্যিক দূরত্ব বেড়ে রেলের আয় স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়েছে।

আবার যাত্রী চাহিদা বাড়ার পাশাপাশি বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি পর্যায়ে গ্রুপ টিকিটের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন ট্রেনে প্রায়ই নির্ধারিতের অতিরিক্ত কোচ সংযোজন করা হয়। এতে জ্বালানি খরচ বেড়ে যাওয়া ছাড়াও অতিরিক্ত জনবল নিয়োগ দিতে হচ্ছে। গমন ও ফেরত (আপ অ্যান্ড ডাউন)—দুই ক্ষেত্রেই এ অতিরিক্ত কোচের চাহিদা থাকলে রেলের কিছু বাড়তি আয় হয়। কিন্তু চাহিদা একমুখী হলে (শুধু গমন) ফিরতি যাত্রায় টিকিট অবিক্রীত থেকে যায়। এজন্য অগ্রিম আবেদনের মাধ্যমে সংযুক্ত বাড়তি কোচ বা বাড়তি চাহিদার সময়ে সংযোজিত কোচের টিকিটে শোভন শ্রেণীর ক্ষেত্রে ২০ শতাংশ, স্নিগ্ধা ও অন্যান্য উচ্চশ্রেণীতে ৩০ শতাংশ রিজার্ভেশন সার্ভিস চার্জ আরোপ করা হবে।

এজন্য গত ১৩ ফেব্রুয়ারি রেলপথ মন্ত্রণালয় থেকে প্রধানমন্ত্রী বরাবর সারসংক্ষেপ আকারে উত্থাপনের জন্য একটি প্রস্তাব তৈরি করা হয়। এতে সই করেন রেলপথ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মো. জিল্লুল হাকিম ও সচিব ড. মো. হুমায়ুন কবীর । এরপর ২ মার্চ প্রস্তাবে সই করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের পর ৭ মার্চ রেলপথ মন্ত্রণালয়ের উপসচিব সালাহ্উদ্দিন আহমেদ রেলওয়ে মহাপরিচালক বরাবর যাত্রী পরিবহনে দূরত্ব রেয়াতি সুবিধা প্রত্যাহার এবং অতিরিক্ত সংযোজিত কোচের টিকিট বিক্রিতে রিজার্ভেশন চার্জ আরোপের জন্য চিঠি দেন।

মাত্র পাঁচ ঘণ্টায় যাওয়া যাবে রংপুর থেকে ঢাকা!

রেয়াতি সুবিধা প্রত্যাহার করে আয় বৃদ্ধির পরিকল্পনার বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রধান পরিকল্পনা কর্মকর্তা এসএম সলিমুল্লাহ বাহার বলেন, ‘‌বাংলাদেশ রেলওয়ের মান ও সেবা অনুযায়ী ভাড়া প্রতিযোগিতামূলক বাজারের চেয়ে অনেক কম। জনগণ এর সুবিধা পেলেও রেলওয়ে লোকসানে থাকে। রেলকে আরো গতিশীল করতে ভাড়া বাড়িয়ে সড়ক যানবাহনের সমান পর্যায়ে নিয়ে আসা জরুরি। কিন্তু আপাতত মূল ভাড়া না বাড়িয়ে বিদ্যমান রেয়াতি সুবিধাগুলো প্রত্যাহারের মাধ্যমে আয় বাড়ানোর চিন্তাভাবনা চলছে। রেলের বিভিন্ন আধুনিকায়ন পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়নের পর ধারাবাহিকভাবে আয় বৃদ্ধির মাধ্যমে লোকসানও কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।’ সূত্র : বণিক বার্তা

Zoom Bangla News
Zoom Bangla News
inews.zoombangla.com
Follow

Follow Zoom Bangla News On Google

Open the Google follow page and tap the checkmark option to receive more updates from Zoom Bangla News in your Google news feed.

Follow Zoom Bangla News On Google

Tarek Hasan is a professional journalist and currently works as a sub-editor at Zoom Bangla News. With six years of experience in journalism, he is an experienced writer with a strong focus on accuracy, clarity, and editorial quality. His work contributes to delivering reliable and engaging news content to digital audiences.