চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য খালাসের অপেক্ষায় থাকা ৩৫টি জাহাজে আছে খেজুর, ডাল, চিনিসহ রমজানের বিভিন্ন ভোগ্যপণ্য। চলতি সপ্তাহে এসব পণ্য বাজারজাত করা না গেলে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বেন ব্যবসায়ীরা। সরবরাহ সংকট তৈরি হবে বাজারে। তারপরও টানা ধর্মঘট চলছে বন্দরে।

বন্দরে আমদানি পণ্য নিয়ে আসা প্রতিটি জাহাজকে বাড়তি অপেক্ষার জন্য প্রতিদিন গচ্চা দিতে হচ্ছে গড়ে ২৫ লাখ টাকা (২০ হাজার ডলার)। রপ্তানি কনটেইনারের সংখ্যাও কমে দাঁড়িয়েছে অর্ধেকে।
বাংলাদেশ শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান শফিকুল আলম জুয়েল বলেন, পণ্য নিয়ে এক দিন অপেক্ষা করলে একটি বড় জাহাজকে অন্তত ২০ হাজার ডলার বাড়তি গুনতে হয়। এখন বন্দরে আসা জাহাজকে দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হচ্ছে। রমজানের আগে এমন অপেক্ষার ক্ষতি হবে বহুমুখী। কারণ, ক্ষতির এই টাকা আমদানিকারকের কাছ থেকে আদায় করবে জাহাজ মালিকরা। আর জাহাজ মালিক সেটি আদায় করবে ভোক্তার কাছ থেকে।
বেসরকারি কনটেইনার ডিপো মালিক সমিতির সংগঠন বিকডার মহাসচিব রুহুল আমীন সিকদার বলেন, ধর্মঘটের প্রভাব পড়েছে বন্দর ও ১৯টি ডিপোতে। বিকেল ৫টায় ধর্মঘট শেষ হওয়ার পর বন্দরে কার্যক্রম সচল ছিল। তারপরও স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় অর্ধেক কমে গেছে কার্যক্রম। ধর্মঘট যদি দীর্ঘস্থায়ী হয় রমজানের আগে বড় ধরনের ধাক্কা পড়বে দেশের অর্থনীতিতে।
পণ্য খালাস কমেছে অর্ধেক, ক্ষতির মুখে কাস্টমসও
টানা দুদিনের ধর্মঘটে চট্টগ্রাম বন্দর ও কাস্টমসের ক্ষতি এরই মধ্যে ছাড়িয়ে গেছে শতকোটি টাকার ঘর। এর মধ্যেই আজ সোমবার ফের ধর্মঘটের ডাক দিয়েছেন শ্রমিক-কর্মচারীরা। সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত চলবে আজকের ধর্মঘট। অথচ গত দুদিনের ধর্মঘটে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে পণ্য খালাসের কার্যক্রম নেমে এসেছে অর্ধেকে। ধর্মঘট শুরুর আগের দিন চট্টগ্রাম বন্দর থেকে তিন হাজার ১০২ কনটেইনার পণ্য খালাস হয়েছে। কিন্তু ধর্মঘট শুরুর প্রথম দিনে এটি কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র এক হাজার ৭৫০ টিইইউ। প্রতিদিন গড়ে ১৭০ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করা চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসেরও আয় কমে দাঁড়িয়েছে অর্ধেকে।
রমজানের পণ্য নিয়ে অপেক্ষা করছে ৩৫ জাহাজ
চট্টগ্রাম বন্দরের ওয়েবসাইটে থাকা পোর্ট পারফরম্যান্স পর্যালোচনা করে দেখা যায়, গতকাল রোববার পর্যন্ত বন্দর সীমায় পণ্য নিয়ে অপেক্ষমাণ ছিল ৮৯টি জাহাজ। এর মধ্যে কনটেইনারবাহী জাহাজ আছে ৯টি। এসব জাহাজের একটিতে আছে খেজুর, ডাল, ছোলাসহ রমজানের পণ্য। এর বাইরে গম, চালসহ খাদ্যসামগ্রী বোঝাই জাহাজ আছে ২১টি। চিনির কাঁচামাল বোঝাই জাহাজ আছে চারটি। এর বাইরে তেলের জাহাজ আছে ৯টি। এই ৩৫টি জাহাজের বাইরেও লবণ বোঝাই দুটি, সার বোঝাই চারটি, সিমেন্ট ক্লিঙ্কার বোঝাই ১০টি জাহাজ রয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালক (প্রশাসন) মো. ওমর ফারুক বলেন, রমজানের আগে এমন ধর্মঘট পুরো অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলছে। আশা করছি, শ্রমিক কর্মচারীরা এমন কর্মসূচি থেকে সরে আসবেন। তা না হলে কঠোর ব্যবস্থা নেবে প্রশাসন।
রপ্তানি কনটেইনার কমে গেছে অর্ধেক
ধর্মঘট শুরুর আগের দিন ২০ ফুট এককের (টিইইউ) রপ্তানিপণ্য বোঝাই কনটেইনার গেছে দুই হাজার ৯৪১টি। তবে ধর্মঘট শুরুর প্রথম দিন গেছে মাত্র এক হাজার ৬১০ টিইইউ রপ্তানি কনটেইনার। এ হিসাবে প্রথম দিন প্রায় অর্ধেক কমে গেছে রপ্তানি কনটেইনার। বন্দর থেকে বেসরকারি ডিপোতে নিয়ে ৫২ ধরনের আমদানি পণ্য খালাস করা হয়। ধর্মঘট শুরুর আগের দিন এমন কনটেইনার এসেছে এক হাজার ৪১০ টিইইউ। কিন্তু ধর্মঘট শুরুর প্রথম দিন এসেছে মাত্র ৪৮১ টিইইউ। এটি আগের দিনের তুলনায় এক-তৃতীয়াংশ।
জেটিতে নির্ধারিত সময়ে খালাস হচ্ছে না কোনো পণ্য
চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং টার্মিনাল (এনসিটি), চিটাগং কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) ও জেনারেল কার্গো বার্থের (জিসিবি) বিভিন্ন জেটিতে থাকা কোনো জাহাজই দুদিন ধরে পণ্য খালাস করতে পারছে না নির্ধারিত সময় মেনে। জিসিবিতে চারটি কনটেইনার জাহাজ ও তিনটি জেনারেল কার্গোর জাহাজ রয়েছে। একইভাবে অর্ধডজন জাহাজ রয়েছে এনসিটি ও সিসিটিতে। কোনো জাহাজই ধর্মঘট চলাকালে আট ঘণ্টায় চালাতে পারছে না স্বাভাবিক কার্যক্রম। সময় মতো জাহাজে ওঠাতে পারছে না রপ্তানি কনটেইনার। নামাতে পারছে না আমদানি কনটেইনারও।
বন্দর জেটি ও টার্মিনাল পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন বার্থ অপারেটরস, শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটরস অ্যান্ড টার্মিনাল অপারেটরস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বোটসোয়া) সভাপতি ফজলে একরাম চৌধুরী বলেন, জিসিবি টার্মিনালে জাহাজ থেকে কনটেইনার ও পণ্য ওঠানো-নামানোর কাজ ব্যাহত হচ্ছে। আমরা শত চেষ্টা করলেও টানা দুদিন সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত শ্রমিকরা কাজে যোগ দেননি।
টার্মিনালে যন্ত্রপাতি আছে, নেই অপারেটর
কি গ্যান্টি ক্রেন, স্টাডল ক্যারিয়ার কিংবা রাবার টায়ার্ড গ্যান্টিক্রেনের মতো অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি দিয়ে কনটেইনারের মতো ভারী জিনিস ওঠানো-নামানো করতে হয়। এসব যন্ত্রপাতি পরিচালনা করে অভিজ্ঞ অপারেটর। এসব অপারেটরের কেউই ধর্মঘট চলাকালে কাজ করছে না জেটিতে। একইভাবে যোগ দিচ্ছে না শ্রমিকরাও। আট ঘণ্টা করে মোট তিন শিফটে শ্রমিকরা কাজ করেন বন্দরে।
সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৫টার শিফটে তিন দিন ধরে তেমন কোনো কাজ হয়নি। পরের দুই শিফটে কাজ করেও এই ঘাটতি দূর করতে পারছে না বন্দর কর্তৃপক্ষ। তাই তৈরি হচ্ছে অচলাবস্থা। বাড়ছে জাহাজের অপেক্ষমাণ সময়ও।
ধর্মঘটের দ্বিতীয় দিনেও বন্দরে অচলাবস্থা
ধর্মঘটের কারণে চট্টগ্রাম বন্দরের জেটিতে জাহাজ থেকে কনটেইনার ও পণ্য ওঠানো-নামানোর কাজ বন্ধ ছিল গতকালও। শনিবারের মতো গতকালও সকাল ৮টা থেকে শুরু হয়েছে ধর্মঘট। চলেছে বিকেল ৫টা পর্যন্ত। শনিবার শুধু অপারেশনাল কাজ বন্ধ থাকলেও গতকাল প্রশাসনিক কাজ বন্ধ রেখেছেন আন্দোলনকারীরা। বন্দরের ভেতরে সীমিত পরিসরে কিছু কাজ চললেও পণ্য ওঠানো-নামানোর মূল কাজ বন্ধ ছিল। আজ সোমবার ফের ধর্মঘটের ডাক দিয়েছেন শ্রমিক-কর্মচারীরা। এর মধ্যে বিদেশি প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডকে এনসিটি টার্মিনাল অপারেট করার সিদ্ধান্ত থেকে সরে না এলে আরও কঠোর কর্মসূচি দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে তারা।
সিএমপির নিষেধাজ্ঞা
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গত শনিবার রাতে গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ বন্দর এলাকায় মিছিল-সমাবেশে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। রোববার মধ্যরাত থেকে আগামী ২ মার্চ পর্যন্ত এক মাসের জন্য এই নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। তবে সংসদ নির্বাচনের প্রচার-প্রচারণা এই নিষেধাজ্ঞার বাইরে রাখা হয়েছে। এ আদেশ না মানলে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়। পাশাপাশি বন্দরে ধর্মঘট ডাকার ঘটনায় সরকারের রাজস্ব ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ এবং দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করতে গতকাল ছয় সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। এ ঘটনায় নেতৃত্বদানকারী চার কর্মচারীকে তাৎক্ষণিক চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ঢাকার কেরানীগঞ্জের পানগাঁও নৌ টার্মিনালে বদলিও করা হয়েছে।
বদলি আদেশ পাওয়া আন্দোলনকারী নেতা ইব্রাহিম খোকন বলেন, বিদেশিদের এনসিটি টার্মিনাল দেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে সরে না এলে আরও কঠোর কর্মসূচি দেব আমরা।
আজ কালো পতাকা নিয়ে মিছিল করবে স্কপ
শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ) ধর্মঘটের প্রতি সর্বাত্মক সমর্থন ও পূর্ণ সহযোগিতা ঘোষণা করেছে। গতকাল সংবাদ সম্মেলন করে তারা হঠাৎ বদলি করা চার আন্দোলনকারীকে আগের কর্মস্থলে ফেরানোর দাবি জানান। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দরের সব শ্রমিক-কর্মচারীকে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান। পুলিশ নিষেধাজ্ঞা দিলেও আজ বন্দর অভিমুখে সকাল ১১টায় কালো পতাকা নিয়ে বিক্ষোভ মিছিল করবে বলে জানান জাতীয়বাদী শ্রমিক দল চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক কাজী শেখ নুরুল্লাহ বাহার।
আরও পড়ুন : ২০২৬ সালে যে ৮ দক্ষতা আপনাকে সফলতা এনে দেবে
আরও ১২ কর্মচারীকে বদলি
এনসিটি বিদেশি কোম্পানিকে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে চলমান আন্দোলনের মধ্যে পৃথক দুই আদেশে গতকাল আরও ১২ কর্মচারীকে বদলি করেছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। চট্টগ্রাম বন্দরের ‘চিফ পার্সোনাল অফিসার গতকাল এসব আদেশে সই করেন। আদেশে বদলি করা কর্মচারীদের সোমবার দিনের প্রথম ভাগে বদলি করা জায়গায় যোগদান করতে বলা হয়েছে। এনসিটি ইজারার বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরুর পর এ নিয়ে ১৬ জনকে বদলি করা হলো।
সূত্র ও ছবি : সমকাল
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


