আন্তর্জাতিক ডেস্ক: তিন বছর বয়সে অনাথ হওয়া রোমান আব্রামোভিচ এক সময় হয়ে ওঠেন বিশ্বের অন্যমত শীর্ষ ধনী; এখন তাকে দেখতে হচ্ছে জীবনের আরেক দিক; রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে সম্পর্কের কারণে তাকে হারাতে হচ্ছে ব্যবসা আর মর্যাদা।
২০০৩ সালে যুক্তরাজ্যের চেলসি ফুটবল ক্লাবটি কিনে নেওয়ার পর এই রুশ ধনকুবের বলেছিলেন, “আমার প্রতি মানুষের কৌতুহল তিন-চার দিন থাকবে, তারপর সেটা কেটে যাবে, আমি নিশ্চিত। তারা ভুলে যাবে আমি কে, আর সেটাই আমি চাই।”
এখন অবশ্য পরিস্থিতি সেরকম নেই। বিশেষ করে গত কয়েক সপ্তাহের ঘটনাবলী তাকে আড়ালে থাকতে দিচ্ছে না।
বিবিসি এক প্রতিবেদনে লিখেছে, যুক্তরাজ্যে রোমান আব্রামোভিচের ব্যবসা আর লেনদেনের তথ্য আরও ভালোভাবে নিরীক্ষা করার দাবি তোলা হচ্ছিল বহু বছর ধরে। তবে ব্রিটিশ সরকার তাতে গা করেনি।
কিন্তু ইউক্রেইনে রাশিয়া যুদ্ধ বাধিয়ে দেওয়ার পর যুক্তরাজ্যও আর আব্রামোভিচকে ছাড় দিতে পারছে না। সেদেশে তার সম্পদ অবরুদ্ধ করেছে ব্রিটিশ সরকার, এর মধ্যে তার মালিকানাধীন বাড়ি, শিল্পকর্ম এবং চেলসি ফুটবল ক্লাবও রয়েছে। তার ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞাও জারি করা হয়েছে।
ইউক্রেইনে রুশ সেনা অভিযানে প্রেসিডেন্ট পুতিনকে সমর্থন যোগানোর অভিযোগ আনা হয়েছে তার বিরুদ্ধে।
তার মত মানুষের জন্য এটা বড় ধরনের পতন, বিশেষ করে যিনি কিছুদিন আগেও ব্রিটিশ ফুটবলের একজন প্রভাবশালী চরিত্র ছিলেন।
বিবিসি লিখেছে, আব্রামোভিচের বিরুদ্ধে ব্রিটিশ সরকারের এই ব্যবস্থা নিয়ে ক্রীড়ামোদীরা দ্বিধা বিভক্ত। তাদের একটি অংশ অবশ্য ওই নিষেধাজ্ঞাকে সমর্থনই দিয়েছে। তবে আব্রামোভিচ এর আগেও বিপদের মোকাবেলা করেছেন, বিশেষ করে তরুণ বয়সে।
অনাথ থেকে ধনকুবের
আজকের ইউক্রেইন সীমান্ত থেকে কয়েকশ মাইল দূরে, রাশিয়ার দক্ষিণ-পশ্চিমের সারাতোভে ১৯৬৬ সালে রোমান আরকাদিয়েভিচ আব্রামোভিচের জন্ম।
তার বয়স যখন এক বছর, রক্তের বিষক্রিয়ায় তার মায়ের মৃত্যু হয়। দুই বছর পর একটি ক্রেইন দুর্ঘটনায় মারা যান বাবা।
এরপর আব্রামোভিচের বেড়ে ওঠা শুরু হয় আত্মীয়-স্বজনদের কাছে, রাশিয়ার উত্তর-পশ্চিমে কোমিতে। সেসব দিনে টাকা-পয়সার টানাটানি আর শীতকালের ঠাণ্ডা, দুটোই ছিল প্রবল।
গার্ডিয়ানকে দেওয়া বিরল এক সাক্ষাৎকারে আব্রামোভিচ একবার বলেছিলেন, “সত্যি কথা বলতে কি, আমার শৈশবটা খুব খারাপ কেটেছে তা বলা যায় না। শৈশবের বিষয়গুলোকে তুলনা করা যায় না আসলে। কেউ গাজর খায়, কেউ খায় ক্যান্ডি- দুটোর স্বাদই ভালো। শিশু অবস্থায় আপনি পার্থক্য করতে পারেন না।”
আব্রামোভিচ স্কুলের চৌহদ্দি ছাড়েন ষোলতে, তারপর মেকানিক হিসেবে কাজ করেন। মস্কোতে প্লাস্টিকের খেলনা বিক্রি শুরুর আগে রেড আর্মিতেও ছিলেন।
পরে তিনি ব্যবসা বদলে সুগন্ধীর ব্যবসায় নামেন। সমটাও অনুকূল ছিল। সোভিয়েত নেতা মিখাইল গর্বাচেভের অধীনে সোভিয়েত ইউনিয়ন তখন পশ্চিমা বিশ্বের সামনে দুয়ার খুলতে শুরু করেছে। আব্রামোভিচের মত উদ্যোক্তাদের জন্য তখন দারুণ সুযোগ।
‘বুনো পূব’
সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙন এবং খনিজ সম্পদের ওপর রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ উটে যাওয়ার পর আব্রামোভিচের কপাল খুলে যায়, যৌবনেই আব্রামোভিচের হাতে ধরা দেয় সৌভাগ্য।
বিবিসি লিখেছে, ১৯৯৫ সালে একটি নিলামে কারচুপির মাধ্যমে ২৫ কোটি ডলারে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন তেল কোম্পানি সিবনেফট কিনে নেন আব্রামোভিচ। ২০০৫ সালে সেটাই তিনি আবার সরকারের কাছে বিক্রি করেন এক হাজার ৩০০ কোটি ডলারে।
তার আইনজীবীদের দাবি, আব্রামোভিচ দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন – এমন অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই।
যদিও ২০১২ সালে যুক্তরাজ্যের একটি আদালতে তিনি স্বীকার করেছিলেন, সিবনেফট সংক্রান্ত চুক্তি এগিয়ে নিতে তিনি অবৈধ লেনদেন করেছিলেন।
১৯৯০ এর দশকে ‘অ্যালুমিনিয়াম যুদ্ধে’ জড়িয়ে পড়েন আব্রামোভিচ, যেখানে অলিগার্করা- সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর যারা রাতারাতি বিপুল সম্পদ ও রাজনৈতিক ক্ষমতা হস্তগত করেছিলেন, ওই বিশাল শিল্পখাতের নিয়ন্ত্রণ পেতে তারা লড়াইয়ে লিপ্ত হন।
২০১১ সালে আব্রামোভিচ বলেছিলেন, ওই সময় প্রতি তিন দিনে অন্তত একজনকে খুন হত। নিজের নিরাপত্তা নিয়ে ওই সময় তাকে যে হুমকি মোকাবেলা করতে হয়েছে, সেটাই তাকে একজন একগুঁয়ে মানুষে পরিণত করে।
তবে আব্রামোভিচ যে একজন কঠিন লোক, বিশৃঙ্খলার মধ্যেই কয়েকশ কোটি পাউন্ডের মালিক বনে যাওয়া তার একটি প্রমাণ।
রাজনীতিতে প্রবেশ
প্রেসিডেন্ট বরিস ইয়েলৎসিনের একজন মিত্র হয়ে ওঠার মধ্য দিয়ে সোভিয়েত-পরবর্তী মস্কোর পরিমণ্ডলে একজন রাজনৈতিক খেলোয়াড়ে পরিণত হন আব্রামোভিচ। এমনকি ক্রেমলিনে একটি অ্যাপার্টমেন্টও বরাদ্দ পেয়েছিলেন কিছুদিনের জন্য।
ধারণা করা হয়, ১৯৯৯ সালে ইয়েলৎসিন পদত্যাগ করলে, তার উত্তরসূরী হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণকারী প্রধানমন্ত্রী ও সাবেক কেজিবি স্পাই ভ্লাদিমির পুতিনকে যারা সমর্থন দিয়েছিলেন, তাদের একজন ছিলেন আব্রামোভিচ।
পুতিন নিজেকে ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠা করার প্রক্রিয়ায় অলিগার্কদের ওপর নিজের কর্তৃত্ব পেতে চেয়েছিলেন। সে সময় তার প্রতি যারা আনুগত্য দেখাননি, তাদের কয়েকজনকে কারাগারে পাঠানো হয়, অনেকে নির্বাসিত হন।
আব্রামোভিচকে কোনোটাই করতে হয়নি। ২০০০ সালে তিনি রাশিয়ার উত্তর-পূর্বে সুবিধাবঞ্চিত এলাকা চুকোৎকার গভর্নরের দায়িত্ব পান। সমাজসেবায় নিজের অর্থ বিনিয়োগ করে জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। তবে ২০০৮ সালে তিনি গভর্নরের পদ থেকে সরে দাঁড়ান।
এই পুরো সময়ে তিনি নিজের ব্যবসায়িক স্বার্থ ঠিকই রক্ষা করে গেছেন। সম্পদের পাহাড়ে বসে শিল্পকর্ম, বাড়ি, গাড়ি কিনে গেছেন।
লন্ডন পর্ব
২০০৩ সালে ১৪ কোটি পাউন্ড দিয়ে পশ্চিম লন্ডনের সবচেয়ে বড় ক্লাব চেলসি কিনে নিয়ে নিজেকে ফুটবল বিশ্বে বিখ্যাত করে তোলেন আব্রামোভিচ।
বিবিসির ভাষায়, লাজুক ও মিতভাষী হিসেবে পরিচিত একজন মানুষের জন্য এটা একটু অস্বাভাবিক পদক্ষেপই বলতে হয়।
ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে তিনি বলেছিলেন, “আমার সারা জীবনের দর্শন ছিল, পেশাদার দল গড়ে তোলা। চুকোৎকাতেও আমার পেশাদার দল ছিল এবং আমি এখানেও সেটাই করব।”
হোসে মরিনিয়ো এবং অন্যদের ব্যবস্থাপনায় এবং আব্রামোভিচের সম্পদে ভর করে চেলসি পাঁচটি প্রিমিয়ার লিগ, দুটো চ্যাম্পিয়ন্স লিগ এবং পাঁচটি এফএ কাপ জয় করে।
বিবিসি লিখেছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অলিগার্কদের অর্থের বান ডেকেছে লন্ডনে। শুধু আব্রামোভিচের সম্পদের তালিকায় আছে পশ্চিম লন্ডনের কেনসিংটন প্যালেস গার্ডেনে একটি ১৫ শয়ন কক্ষের ম্যানশন, যার দাম সম্ভবত ১৫ কোটি পাউন্ডের বেশি এবং চেলসিতে একটি ফ্ল্যাট। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডোতে একটি র্যাঞ্চ এবং ফ্রেঞ্চ রিভিয়েরাতে একটি বাগানবাড়িও রয়েছে তার।
তার মালিকানাধীন দ্য সোলারিস ও দ্য একলিপস বিশ্বের অন্যতম বড় দুটি ইয়ট। তিন বার বিয়ে বিচ্ছেদের মধ্যে দিয়ে যাওয়া এই ধনকুবেরের একটি ব্যক্তিগত জেট বিমানও রয়েছে।
মানহানি মামলা
২০০৬ সালে গার্ডিয়ানের পক্ষ থেকে তার কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, টাকা-পয়সা একজন মানুষের জন্য কতটা করতে পারে? আব্রামোভিচের জবাব ছিল, “এটা আপনাকে সুখ কিনে দিতে পারবে না। তবে হ্যাঁ, কিছুটা স্বাধীনতা দিতে পারে।”
নিশ্চিতভাবেই তার বিপুল অর্থ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ব্লুমবার্গের হিসাবে, আব্রামোভিচের সম্পদের পরিমাণ এক হাজার ৩৭০ কোটি ডলার, যা তাকে বিশ্বের ১২৮তম শীর্ষ ধনীতে পরিণত করেছে। আর ফোর্বসের হিসাবে এক হাজার ২৩০ কোটি ডলারের মালিক আব্রামোভিচ বিশ্বের ১৪২তম শীর্ষ ধনী।
তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হল, প্রেসিডেন্ট পুতিনের কাছে তিনি কতটা স্বাধীন।
গত বছর প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান হারপারকলিন্সের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করেন এই ধনকুবের। ক্যাথেরিন বেলটনের লেখা ‘পুতিন’স পিপল’ বইয়ের জন্য ওই মামলা করেন তিনি, যেখানে দাবি করা হয় রুশ প্রেসিডেন্টের নির্দেশেই চেলসি কেনেন আব্রামোভিচ।
পরে বিষয়টি আদালতের বাইরে দুই পক্ষের মধ্যে মিটমাট হয়। প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানটি ওই দাবির বিষয়ে কিছু স্পষ্টীকরণ যোগ করতে রাজি হয়।
তবে প্রেসিডেন্ট পুতিনের বলয় থেকে বের হতে পারেননি আব্রামোভিচ। ইউক্রেইন সীমান্তে রাশিয়া যখন সেনা পাঠাতে শুরু করল, তার নাম আবারও জোরের সাথে ফিরে এল।
আব্রামোভিচসহ আরও ছয় রুশ অলিগার্কের যুক্তরাজ্যে থাকা সম্পদ অবরুদ্ধ করার ঘোষণা দেওয়ার সময় ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী লিজ ট্রস বলেন, “পুতিনের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠতা থাকায়, তারাও এই আগ্রাসনের জন্য দায়ী। ইউক্রেইনের নাগরিকদের রক্ত তাদের হাতেও লেগেছে।”
অবরোধ আরোপ করার আট দিন আগে আব্রামোভিচ চেলসি বিক্রি করে দেওয়ার ঘোষণা দেন। কিছু ভক্ত এরপরেও আব্রামোভিচের সমর্থনে শ্লোগান দিয়েছে, কিন্তু অনেক রাজনীতিক এই ধনকুবেরের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার দাবি জানিয়েছেন।
চেলসির সমর্থকদের উদ্দেশে আব্রামোভিচ বলেছিলেন, “আমি আশা করি স্ট্যামফোর্ড ব্রিজে আমি অন্তত শেষবারের মত হলেও সশরীরে উপস্থিত থেকে আপনাদের বিদায় জানাতে পারব।”
তবে আপাতত তার হয়ত পশ্চিম লন্ডনে ফেরার সুযোগ হবে না।
ঘটনার একটি নাটকীয় মোড় দৃশ্যমান হয়েছে সম্প্রতি। জানা যাচ্ছে, আব্রামোভিচকে বিষ প্রয়োগ করা হয়েছিল। আর সেটা সম্ভবত মার্চের শুরুতে, ইউক্রেইন-বেলারুশ সীমান্তে শান্তি আলোচনার সময়। অবশ্য এখন তিনি সেই অসুস্থতা কাটিয়ে উঠেছেন।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।