ধর্ম ডেস্ক : রমজান শুধু একটি মাস নয়, বরং এটি সারা জীবনের পথচলার দিকনির্দেশনা, যা হৃদয়ে দোলা দিয়ে যায়, আত্মাকে প্রশিক্ষিত করে এবং ইবাদতের আলোয় আলোকিত করে তোলে। এক মাসের এই প্রশিক্ষণ মুমিনের জীবনে যে পরিবর্তন এনে দেয়, তা যেন সারা জীবনের জন্য একটি দিশারি হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।
এখানে রমজান-পরবর্তী কয়েকটি করণীয় সম্পর্কে বর্ণনা করা হলো-
১. নেক কাজের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা :
মাহে রমজানের আগমন ঘটলে প্রত্যেক মুমিনের হৃদয়ে প্রশান্তির বায়ু প্রবাহিত হয়, যা প্রত্যেককে নেক আমলে উৎসাহিত করে। আর নেক আমল গুনাহের মাধ্যমে আস্তে আস্তে নষ্ট হতে থাকে। এ জন্য রমজান-পরবর্তী সময়ে গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা আবশ্যক।
কোরআনের ভাষায় : ‘তোমরা নিজেদের আমলকে সেই নারীর মতো কোরো না, যে সুতা মজবুতভাবে বুনতে থাকে আবার তা ছিঁড়ে ফেলে।’ (সুরা : নাহল, আয়াত : ৯২)।
তাই রমজানের পরও আমাদের আমল অব্যাহত রাখা একান্ত জরুরি।
২. হেদায়েতবিহীন পথ এড়িয়ে চলা :
প্রাপ্ত হেদায়েত হারিয়ে ফেলা ভ্রষ্টতার পথ গ্রহণেরই নামান্তর। এ জন্য স্রষ্টা প্রদত্ত যে রহমতগুলো প্রাপ্ত হয়েছি তার যথার্থ মূল্যায়ন করা অপরিহার্য।
মহান আল্লাহ বলেন : ‘আর তাদের ওই ব্যক্তির বৃত্তান্ত পড়ে শোনাও, যাকে আমরা দিয়েছিলাম নিদর্শনসমূহ, তারপর সে তা হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, অতঃপর শয়তান তার পেছনে লাগে, আর সে বিপথগামীদের অন্তর্ভুক্ত হয়।’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ১৭৫)।
৩. নাফরমানি থেকে দূরে থাকা :
নাফরমানির মূলহোতা শয়তান। শয়তান মানুষের চিরশত্রু এবং তাকে শত্রুরূপেই গণ্য করতে বলা হয়েছে।
আল-কোরআনের ভাষায় : ‘তারপর অবশ্যই আমি (শয়তান) তাদের কাছে আসব, তাদের সামনে থেকে ও পেছন থেকে, তাদের ডান দিক থেকে ও বাঁ দিক থেকে এবং আপনি তাদের অধিকাংশকে কৃতজ্ঞ পাবেন না।’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ১৭)।
৪. সালাতের প্রতি যত্নবান হওয়া :
সালাত ইসলামের পঞ্চম স্তম্ভের মধ্যে অন্যতম একটি ফরজ ইবাদত। মাহে রমজানে সবারই সালাতের প্রতি কমবেশি ঝোঁক থাকে। আর সেই প্রবণতাকে অন্য মাসেও কার্যকর করা আমাদের একান্ত জরুরি।
৫. পরোপকারী মনোভাব বজায় রাখা :
পরোপকার মানবিকতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ গুণ। ইসলামে পরোপকারিতাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা সৎ কাজ ও তাকওয়ায় একে অপরকে সহযোগিতা করো।’ (সুরা : মায়িদা, আয়াত : ২)
সাধারণভাবে মানুষ রমজানে দান-সদকা বেশি করে থাকে, যা অন্যান্য মাসেও করা প্রয়োজন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ সেই বান্দার সহায় হন, যে তার ভাইয়ের সাহায্যে নিয়োজিত থাকে।’ (মুসলিম)
মনে রাখতে হবে যে পরোপকার শুধু দান-সদকায় সীমাবদ্ধ নয়, এটি সদ্ব্যবহার, সহানুভূতি, পরামর্শ ও সহমর্মিতার মাধ্যমেও প্রকাশ পায়।
৬. পারস্পরিক দ্বন্দ্ব সমাধানে সচেষ্ট থাকা :
মাহে রমজানের একটি বড় শিক্ষা হলো যে যখন কারো মাঝে ঝগড়া লাগবে অথবা কেউ কাউকে গালি দেবে তখন বলবে যে ‘আমি রোজাদার।’ অর্থাৎ মীমাংসাপূর্ণ মানসিকতা দরকার। এমনকি হাদিস শরিফে পারস্পরিক মীমাংসা করাকে রোজা থেকেও উত্তম বলা হয়েছে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আমি কি তোমাদের সিয়াম, সালাত, সদাকাহ্র চেয়েও ফজিলতপূর্ণ কাজের কথা বলব না? সাহাবিরা বলেন, হ্যাঁ, অবশ্যই হে আল্লাহর রাসুল! তিনি বলেন, পরস্পরের মধ্যে মীমাংসা করা। আর পরস্পরের মধ্যে ঝগড়া বাধানো ধ্বংসের কারণ।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ৪৯১৯)।
৭. শাওয়াল মাসের ছয়টি রোজা রাখা :
রমজান-পরবর্তী শাওয়াল মাসের এই ছয়টি নফল রোজা এতটাই তাৎপর্যপূর্ণ যে এই কয়েকটি রোজা রাখলেই বাকি ১১ মাস রোজা রাখার সওয়াব পাওয়া যায়।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি রমজান মাসের সিয়াম পালন করার পরে শাওয়াল মাসে ছয় দিন রোজা রাখবে, তাকে সারা বছর সাওম পালন করার সওয়াব দেওয়া হবে!’ (মুসলিম, হাদিস : ২৬৪৮)।
পরিশেষে মাহে রমজান আমাদের জীবনে একটি প্রশিক্ষণকাল, যা কেবল এক মাসের জন্য নয়, বরং সারা জীবনের জন্য। যদি আমরা রমজানের শিক্ষা বাস্তব জীবনে অনুসরণ করি, তবে আমাদের দুনিয়া ও আখিরাত উভয়ই সুন্দর হবে। মহান আল্লাহ আমাদের সহায় হোন, আমিন।
জাকি মো. হামদান
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।