রপ্তানি আয়ের গতি কমে যাওয়ায় আবারও চাপের মুখে পড়েছে দেশের বৈদেশিক বাণিজ্য পরিস্থিতি। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথমার্ধে (জুলাই-ডিসেম্বর) বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে প্রায় ১৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ। একই সময়ে বৈদেশিক লেনদেনের চলতি হিসাবও ঘাটতিতে রয়েছে। তবে বিদেশি বিনিয়োগ, দাতা সংস্থার সহায়তা ও বেসরকারি খাতের বিদেশি ঋণের প্রবাহ বাড়ায় আর্থিক হিসাবে বড় উদ্বৃত্ত তৈরি হয়েছে। ফলে সামগ্রিক লেনদেন ভারসাম্যেও ইতিবাচক অবস্থান দেখা যাচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, টানা ছয় মাস রপ্তানি আয় কমেছে। অন্যদিকে আসন্ন রমজানকে সামনে রেখে আমদানি ব্যয় বেড়েছে, যা বাণিজ্য ঘাটতি বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে।
আমদানি বেড়েছে, রপ্তানিতে ধাক্কা
চলতি অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে দেশে পণ্য আমদানি হয়েছে ৩৩ দশমিক ৬৮ বিলিয়ন ডলারের, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৫ শতাংশ বেশি। অর্থনীতিবিদদের মতে, শিল্প ও উৎপাদন সচল রাখতে এই আমদানি প্রবৃদ্ধি স্বাভাবিক। কিন্তু সমস্যা তৈরি হয়েছে রপ্তানি আয়ের ধারাবাহিক পতনে।
চলতি অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বরে পণ্য রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ২২ দশমিক ১২ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১ শতাংশ কম। আমদানি ও রপ্তানির এই ব্যবধানই বাণিজ্য ঘাটতিকে আরও বড় করেছে।
বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে ১৮ শতাংশের বেশি
আমদানি ব্যয় রপ্তানি আয়ের চেয়ে বেশি হলে যে পার্থক্য তৈরি হয়, সেটিই বাণিজ্য ঘাটতি। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে পণ্য বাণিজ্যে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১৫৫ কোটি ৪০ লাখ ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই ঘাটতি ছিল ৯৭৬ কোটি ৩০ লাখ ডলার। অর্থাৎ ছয় মাসে ঘাটতি বেড়েছে ১৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ।
রপ্তানিকারকদের মতে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পাল্টা শুল্কনীতি ঘিরে বৈশ্বিক বাণিজ্যে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল, তার প্রভাব এখনও কাটেনি। এতে বিশেষ করে তৈরি পোশাক রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যবসা-বাণিজ্যের ধীরগতিও রপ্তানি আয়ে প্রভাব ফেলেছে।
চলতি হিসাবে ঘাটতি কমেছে, তবে স্বস্তি নেই
বাণিজ্য ঘাটতি বাড়লেও বৈদেশিক লেনদেনের চলতি হিসাবের ভারসাম্যে ঘাটতি কিছুটা কমেছে। চলতি হিসাব দেশের নিয়মিত বৈদেশিক আয়-ব্যয়ের চিত্র তুলে ধরে। এতে আমদানি-রপ্তানি ছাড়াও প্রবাসী আয়সহ অন্যান্য লেনদেন অন্তর্ভুক্ত থাকে। এখানে উদ্বৃত্ত হলে চলতি লেনদেনের জন্য দেশকে কোনো ঋণ করতে হয় না। আর ঘাটতি থাকলে ঋণ নিয়ে তা পূরণ করতে হয়।
চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে চলতি হিসাবের ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩৪ কোটি ৩০ লাখ ডলারে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৫১ কোটি ৮০ লাখ ডলার। প্রবাসী আয় প্রায় ১৮ শতাংশ বেড়েছে, তবুও চলতি হিসাবে ঘাটতি পুরোপুরি কাটেনি।
আর্থিক হিসাবে বড় উদ্বৃত্ত
বিদেশি ঋণ, সহায়তা, প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) ও পোর্টফোলিও বিনিয়োগ মিলিয়ে গঠিত হয় আর্থিক হিসাব। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে এই হিসাবে উদ্বৃত্ত দাঁড়িয়েছে ২০৪ কোটি ৭০ লাখ ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে উদ্বৃত্ত ছিল মাত্র ৫২ কোটি ৫০ লাখ ডলার।
এই সময়ে নীট বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে প্রায় ৮৩ কোটি ডলার (আগে ছিল ৫৫ কোটি ডলার)। অন্যান্য বিনিয়োগ এসেছে প্রায় ১৩২ কোটি ডলার, যা আগের বছর একই সময়ে ছিল মাত্র আড়াই কোটি ডলার। নীট বাণিজ্যিক ঋণও ইতিবাচক হয়েছেÑ প্রায় ৯১ কোটি ডলার; যেখানে আগের বছর একই সময়ে তা ঋণাত্মক ছিল ১২৪ কোটি ডলার।
আরও পড়ুন : ২০২৬ সালে যে ৮ দক্ষতা আপনাকে সফলতা এনে দেবে
সার্বিক ভারসাম্যে আবার উদ্বৃত্ত
গত ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষ হয়েছিল ৩২৯ কোটি ডলারের উদ্বৃত্ত নিয়ে। তবে চলতি অর্থবছর শুরু হয় ঘাটতি দিয়ে। জুলাই মাসে ঘাটতি ছিল ৫৪ কোটি ৫০ লাখ ডলার। পরে ধীরে ধীরে পরিস্থিতির উন্নতি হয়।
জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে ৮৫ কোটি ৩০ লাখ ডলারের উদ্বৃত্তে ফেরে সামগ্রিক লেনদেন ভারসাম্য। ওঠানামার পর সবশেষ জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে উদ্বৃত্ত বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৯৪ কোটি ডলারে। অথচ আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৪৬ কোটি ৭০ লাখ ডলারের ঘাটতি।
রপ্তানি আয়ের দুর্বলতা বাণিজ্য ঘাটতি বাড়ালেও বিদেশি বিনিয়োগ ও ঋণপ্রবাহের জোরে সামগ্রিক বৈদেশিক লেনদেনে আপাতত কিছুটা স্বস্তির চিত্র দেখা যাচ্ছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা আনতে রপ্তানি আয় পুনরুদ্ধারই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
সূত্র : আমাদের সময়
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


