ভুলত্রুটি ও অসম্পূর্ণতামাহে রমজানের শিক্ষাকে বছরজুড়ে ধরে রাখার শিক্ষা দেয় শাওয়ালের ছয় রোজা। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘যখন তুমি ফরজ দায়িত্ব সম্পন্ন করবে তখন উঠে দাঁড়াবে এবং তুমি নফল ইবাদতের মাধ্যমে তোমার রবের প্রতি অনুরাগী হবে।’ (সুরা ইনশিরা, আয়াত ৭-৮)।

শাওয়াল মাসের এ ছয়টি রোজা সুন্নতে মুয়াক্কাদা। এ রোজাগুলো রমজানের রোজার ভুলত্রুটি ও অসম্পূর্ণতাকে সম্পূর্ণ করে। শাওয়াল আরবি শব্দ। এর অর্থ উঁচু করা, পূর্ণতা, ফলবতী, পাল্লা ভারী হওয়া, গৌরব করা, বিজয়ী হওয়া, প্রার্থনায় হাত উত্তোলন করা বা ভিক্ষায় হাত প্রসারিত করা। সুতরাং এ মাসের আমলের দ্বারা বান্দার উন্নতি হয়, নেকির পাল্লা ভারী হয়, গৌরব অর্জন ও সাফল্য আসে। রসুল (সা.) স্বয়ং নিজে শাওয়ালের রোজা রাখতেন এবং সাহাবায়ে কিরামকে রোজা রাখার নির্দেশ দিতেন।
মানবজাতিকে আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন একমাত্র তাঁরই ইবাদতের জন্য। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা বলেছেন, ‘আমি জিন ও মানব জাতিকে একমাত্র আমারই ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছি।’ সুরা জারিয়াত, আয়াত ৫৬।
রমজানে আমরা এতটুকু শিখতে পেরেছি যে তাকওয়া অর্জন করে, পরিপূর্ণভাবে হিংসা-বিদ্বেষ, মারামারি-হানাহানি পরিত্যাগ করে আমরা মুমিনরা ভাই ভাই হয়ে গেছি। রমজান আমাদের শিখিয়েছে আর্তমানবতার সেবায় এগিয়ে আসতে হবে এবং আগামী ১১ মাস আল্লাহর আদেশ-নিষেধ যথাযথ মেনে চলতে হবে। এক মাস রোজা রেখেই যেন বান্দা রোজাকে ভুলে না যায় সেজন্য প্রতি চান্দ্রমাসের ১৩ থেকে ১৫ তারিখের রোজা, আশুরার রোজা, ৯ জিলহজ আরাফার দিনের রোজাসহ অন্যান্য নফল রোজার বিধান রেখেছে ইসলাম।
ফরজ নামাজের কমতিগুলো পোষাতে যেমন নফল নামাজ রয়েছে, তেমনি ফরজ রোজার পরও শাওয়ালের সুন্নত রোজা রয়েছে। এ নফলগুলো ফরজের ত্রুটিগুলোর ক্ষতিপূরণের জন্য। রোজাদার যদি অনর্থক বাক্যালাপ, কুদৃষ্টি প্রভৃতি কাজ থেকে সম্পূর্ণ বাঁচতে না পারে তাহলে তার রোজার পুণ্য কমে যায়। আর কমতি পুণ্যকে পূর্ণ করতেই শাওয়ালের ছয়টি রোজা। শাওয়ালের ছয়টি রোজার মাধ্যমে রমজানের রোজার শুকরিয়া আদায় করা হয়।
যখন কোনো বান্দার আমল আল্লাহতায়ালা কবুল করেন তখন তাকে অন্য নেক আমলের তৌফিক দেন। আমাদের পূর্বসূরিদের অনেকে রমজানের পর ছয় মাস আল্লাহর দরবারে এজন্য কাঁদতেন, যেন রমজানে কৃত ইবাদত কবুল হয়। ইবাদত কবুল হওয়ার আলামত হলো আগের অবস্থার উন্নতি হওয়া। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘মৃত্যু পর্যন্ত তোমার রবের ইবাদত করো।’ সুরা আল হিজর, আয়াত ৯৯।
রসুলুল্লাহ (সা.) নিজেও শাওয়ালের রোজা রাখতেন এবং সাহাবায়ে কিরামদের রাখার নির্দেশ দিতেন। হজরত আবু আইয়ুব আনসারী (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি রমজানের রোজা রাখল, এরপর শাওয়ালের ছয়টি রোজা রাখল সে যেন সারা বছরই রোজা রাখল।’ মুসলিম।
রমজানের ৩০ রোজার সঙ্গে শাওয়ালের ছয়টি রোজা যুক্ত হলে মোট রোজার সংখ্যা হয় ৩৬। আর প্রতিটি পুণ্যের জন্য ১০ গুণ পুরস্কারের কথা উল্লেখ রয়েছে কোরআনুল কারিমে। তাহলে ৩৬ রোজার ১০ গুণ হলে ৩৬০ রোজার সমান (এটি পুরস্কারের দিক থেকে)।
অর্থাৎ সারা বছর রোজার সমান সওয়াব হবে। হজরত সাওবান (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘রমজানের রোজা ১০ মাসের রোজার সমতুল্য আর (শাওয়ালের) ছয় রোজা দুই মাসের রোজার সমান। সুতরাং এ হলো এক বছরের রোজা।’ নাসায়ি।
শাওয়ালের ছয়টি রোজা নারী-পুরুষ সবার জন্যই সুন্নত। মাসের শুরু-শেষ কিংবা মাঝামাঝি- সব সময়ই রাখা যায় এ রোজাগুলো। একনাগাড়ে অথবা মাঝে ফাঁক রেখে পৃথকভাবেও রাখা যায়। শাওয়ালে শুরু করে শাওয়ালে শেষ করলেই হলো। তবে ঈদুল ফিতরের পর শাওয়ালের প্রথম দিকে একসঙ্গে ছয়টি রোজা রাখাই উত্তম।
হজরত উবায়দুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘এক দিন রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞাসা করলাম, হে আল্লাহর রসুল! আমি কি সারা বছর রোজা রাখতে পারব? তিনি বললেন, তোমার ওপর তোমার পরিবারের হক রয়েছে। কাজেই তুমি সারা বছর রোজা না রেখে রমজানের রোজা রাখো এবং রমজান-পরবর্তী শাওয়ালের ছয়টি রোজা রাখো, তাতেই সারা বছর রোজা রাখার সওয়াব পাবে।’ তিরমিজি।
শাওয়ালের ছয় রোজা নারী-পুরুষ সবার জন্যই সুন্নত। প্রত্যেক সুস্থ সবল ব্যক্তির উচিত ফজিলতপূর্ণ এ ছয়টি রোজা রেখে পূর্ণ এক বছর রোজা রাখার সমান সওয়াব হাসিল করা।
লেখক : মোহাম্মদ ওমর ফারুক
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


