আজ থেকে প্রায় ৫০০০ বছর আগে, বর্তমান পাকিস্তানের সিন্ধু নদের তীরে গড়ে উঠেছিল এক অবিশ্বাস্য নগরী। আধুনিক নগর পরিকল্পনা, সুপ্রশস্ত রাস্তাঘাট, উন্নত নিকাশি ব্যবস্থা আর বহুতল ভবনের সমাহারে মহেঞ্জোদাডরো ছিল সে সময়ের এক মেগাসিটি। মিশর ও মেসোপটেমিয়ার সমসাময়িক হলেও এই সভ্যতা তার আধুনিকতায় সবাইকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল। সিন্ধি ভাষায় মহেঞ্জোদারো শব্দের অর্থ মৃতদের ঢিবি।

হাজার বছর মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকার পর, ১৯২২ সালে এই হারিয়ে যাওয়া নগরী পুনরায় পৃথিবীর আলো দেখে। ১৯৮০ সালে ইউনেস্কো একে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
ইতিহাস ও আবিষ্কারের নেপথ্যে
সিন্ধু সভ্যতার (খ্রিস্টপূর্ব ৩৩০০ – ১৩০০ অব্দ) অন্যতম প্রাণকেন্দ্র ছিল এই মহেঞ্জোদারো। তবে এর স্বর্ণযুগ ছিল খ্রিস্টপূর্ব ২৬০০ থেকে ১৯০০ অব্দ পর্যন্ত, যাকে বলা হয় পরিপক্ব হরপ্পা যুগ।
প্রায় ৫ কিলোমিটার পরিধির এই শহরে একসময় ৩৫,০০০ থেকে ৫০,০০০ মানুষের বসবাস ছিল।
আবিষ্কারের রোমাঞ্চকর গল্প:
১৯১১: প্রথম এই স্থানে প্রাচীন ধ্বংসাবশেষের চিহ্ন পাওয়া যায়।
১৯২২: বাঙালি প্রত্নতত্ত্ববিদ রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় একটি বৌদ্ধ স্তূপ খনন করতে গিয়ে খুঁজে পান ৫০০০ বছরের পুরনো এই সভ্যতার নিদর্শন।
১৯২৪: জন মার্শাল আনুষ্ঠানিকভাবে মহেঞ্জোদারো আবিষ্কারের ঘোষণা দিয়ে বিশ্বকে চমকে দেন।
১৯৬৫ পরবর্তী: পরিবেশগত ঝুঁকির কারণে বড় ধরনের খননকাজ বন্ধ রাখা হয়েছে, তবে ২০১৫ সালে উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে জানা গেছে যে মাটির নিচে এখনো অনেক রহস্য লুকিয়ে আছে।
স্থাপত্য ও নগর পরিকল্পনা
মহেঞ্জোদারোর প্রতিটি ইট যেন ইতিহাসের একেকটি জীবন্ত সাক্ষী। এর বিশেষত্ব হলো:
পরিকল্পিত গ্রিড সিস্টেম: শহরটি পরিকল্পিতভাবে গ্রিড আকারে সাজানো ছিল।
বিরাট স্নানাগার: এটি ছিল সে সময়ের প্রকৌশলবিদ্যার এক অনন্য নিদর্শন, যা সম্ভবত ধর্মীয় বা সামাজিক আচার-অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত হতো।
উন্নত ড্রেনেজ ব্যবস্থা: প্রতিটি বাড়ির ময়লা পানি বের হওয়ার জন্য ঢাকা দেওয়া ড্রেন ছিল, যা বর্তমান যুগের নিকাশি ব্যবস্থার মতোই আধুনিক।
রহস্যময় বিলুপ্তি
খ্রিস্টপূর্ব ১৯০০ অব্দের দিকে হঠাৎ করেই এই জাঁকজমকপূর্ণ শহরটি পরিত্যক্ত হতে শুরু করে। এর সঠিক কারণ আজও অমীমাংসিত। গবেষকদের মতে:
জলবায়ু পরিবর্তন: দীর্ঘস্থায়ী খরা বা সিন্ধু নদের গতিপথ পরিবর্তন।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ: প্রলয়ঙ্কারী বন্যা বা ভূমিকম্প।
আক্রমণ: বহিঃশত্রুর আক্রমণ।
তবে খননকার্যে পাওয়া আলামত বলে, শহরটি রাতারাতি ধ্বংস হয়নি। বরং মানুষ ধীরে ধীরে তাদের মূল্যবান সম্পদ নিয়ে শহর ছেড়ে চলে গিয়েছিল, আর সময়ের বিবর্তনে এটি চাপা পড়েছিল মাটির নিচে।
ভ্রমণকারীর জন্য টিপস
আপনি যদি ইতিহাসের গলিঘুঁজিতে হারিয়ে যেতে চান, তবে মহেঞ্জোদাড়ো আপনার জন্য এক স্বপ্নপুরী। যেখানে দাঁড়ালে মনে হবে—৫০০০ বছর আগে ঠিক এই জায়গাতেই হয়তো কোনো এক ব্যস্ত বিক্রেতা তার পসরা সাজিয়ে বসেছিল।
সূত্র : কুহুডাক
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


