সোয়াদ সাদমান, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি; চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি) ইনস্টিটিউট অব এডুকেশন এন্ড রিসার্চ (আইইআর) এর আওতাধীন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ল্যাবরেটরী স্কুল এন্ড কলেজের শিক্ষার্থীরা ২৯ মার্চ ফের ক্লাস পরীক্ষা বর্জনের ডাক দিয়েছে। একই সাথে তারা, সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটিতে সংঘটিত বিভিন্ন অনিয়ম, দুর্নীতি ও প্রশাসনিক সমস্যার কারনে শিক্ষা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যর্থ হওয়ার কথা জানিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বরাবর ৩ দফা দাবিতে স্মারকলিপি প্রদান করেছে।

শিক্ষার্থী

Advertisement

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ল্যাবরেটরী স্কুল এন্ড কলেজের শিক্ষার্থীসহ কলেজটি থেকে অপসারিত ১১ জন শিক্ষকের পক্ষ থেকে, শিক্ষক ও অধ্যক্ষ নিয়োগকে কেন্দ্র করে জামায়াতের দলীয় প্রভাব বিস্তার ও প্রশাসনের স্বজনপ্রীতি এবং অনিয়ম সহ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) এর আদেশ অমান্য করে এবং মহামান্য হাইকোর্টে এ সংক্রান্ত বিচারকার্য চলমান থাকা অবস্থায় নিয়োগ প্রক্রিয়া চালু রাখার দীর্ঘদিনের অভিযোগ রয়েছে।

তথ্যসূত্রে জানা যায়, ৯ মার্চ ২০২৫ তারিখ প্রতিষ্ঠানটির প্রকাশিত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে মাধ্যমিক শাখায় ১১টি ও উচ্চমাধ্যমিক শাখায় ১১টি শূন্যপদের কথা উল্লেখ করা হয়। কিন্তু ৮ মে ২০২৫ তারিখে ইউজিসি এক নির্দেশনায় উক্ত সকল প্রকার নিয়োগ স্থগিত করার নির্দেশ দেয়। পরবর্তীতে ভুক্তভোগী শিক্ষকরা ২৩ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে মহামান্য হাইকোর্টে আপিল করেন এবং একই সঙ্গে ১৪ই জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে ইউজিসি ও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এ “ইউজিসি কর্তৃক নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ল্যাবরেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজে অধ্যক্ষ ও প্রভাষক নিয়োগে দুর্নীতি ও স্বজন প্রীতি প্রসঙ্গে” লিখিত অভিযোগ করেন।

অভিযোগ রয়েছে, ইউজিসির স্থগিতাদেশ কার্যকর থাকা অবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ পুরোনো বিজ্ঞপ্তির ভিত্তিতেই অস্বচ্ছ ভাবে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করে ১১ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে স্থায়ীভাবে নিয়োগপত্র প্রদান করে। যদিও উচ্চ মাধ্যমিক শাখায় প্রভাষক পদে ১১টি শূন্যপদের বিপরীতে ৯ জনকে স্থায়ীভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এদিকে, ৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে ইউজিসি পুনরায় নির্দেশনা দেয় নতুন করে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের মাধ্যমে জনবল নিয়োগ কার্যক্রম সম্পন্ন করতে। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, ঐ নির্দেশনা অমান্য করে ৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে পূর্বের স্থায়ী নিয়োগ প্রাপ্তদের মধ্যে অফিস চলাকালীন সময়ে ৮ জন এবং অফিস সময়ের বাহিরে গিয়ে আরও ১ জন (পদার্থবিজ্ঞান) প্রভাষকের যোগদান সম্পন্ন করা হয়। এবংকি যোগদানপত্রে ত্রুটি থাকারও অভিযোগ রয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, নিয়োগ প্রাপ্তদের মধ্যে জামায়াতে ইসলামী এবং ইসলামী ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত এবং বর্তমান প্রশাসনের স্বজনদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির উচ্চ মাধ্যমিক শাখায় স্থায়ী ভিত্তিতে নিয়োগ প্রাপ্ত ৯ প্রভাষক হলেন- ১/ মোঃ আল আমিন, ২/ মোঃ তরিকুল ইসলাম, ৩/ হামেদ হাসান আলব্বী, ৪/ ফারজানা শিরিন, ৫/ শাহরিয়ার মাহমুদ, ৬/ মিশকাত কবির আজাদ, ৭/ আয়েশা আক্তার, ৮/ নুরুল আনোয়ার চৌধুরী, ৯/ ফয়সাল আল ফাহাদ।

অভিযোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, জেদ্দায় বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের ১৬ কোটি টাকা দুর্নীতির মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া মোঃ আবদুল কাইয়ুমকে প্রতিষ্ঠানটির নতুন অধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান রেজিস্ট্রার প্রফেসর ড. মোহাম্মদ সাইফুল ইসলামের আপন ভাই বলে জানা গিয়েছে।

অন্যদিকে, ফ্যাসিবাদ বিরোধী ছাত্র জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর ১৯ অক্টোবর ২০২৪ ইং তারিখে প্রতিষ্ঠানটির গভর্নিং বডির ৪৫ তম সভায় সিদ্ধান্ত দেওয়া হয় যে, উচ্চ মাধ্যমিক শাখায় খন্ডকালীন ও মাধ্যমিক শাখায় এডহক ভিত্তিতে নিয়োজিত সকল শিক্ষকদের বয়স থাকা সাপেক্ষে শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষা বা অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নের মাধ্যমে শূন্য পদ গুলোতে নিয়োগ দেওয়া হবে। এবংকি জুলাই বিপ্লবের পরবর্তী সময়েও ছয় দফায় প্রতিষ্ঠানটির ১১ জন খণ্ডকালীন শিক্ষকের মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়েছিল, তারা গত ৩ আগস্ট ২০২১ ইং তারিখ থেকে প্রায় অর্ধেক পারিশ্রমিকে সারে ৪ বছর যাবৎ প্রতিষ্ঠানটিতে পূর্ণকালীন শিক্ষকের মতোই সম্পূর্ণ কলেজের পাঠ কার্যক্রমের দায়িত্ব পালন করেছেন। ৬ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে অনুষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানটির গভর্নিং বডির ৫০ তম সভায় ভুক্তভোগী ১১ জন শিক্ষকের খন্ডকালীন মেয়াদ ৩ মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছিল।

তবে, পূর্বে অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নের মাধ্যমে স্থায়ীকরণের বিষয়টি উল্লেখ থাকলেও তা বাস্তবায়ন করা হয়নি বলে ভুক্তভোগী শিক্ষকদের অভিযোগ রয়েছে। এবং ৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে নির্ধারিত সময়ের আগেই তাদের অপসারণ করা হয়, যা ভুক্তভোগীদের ভাষায় নিয়মবহির্ভূত ও অমানবিক। অপসারিত ভুক্তভোগী শিক্ষকরা হলেন- ১/ মোঃ মুরাদ হোসেন চৌধুরী, ২/ আয়েশা ফেরদৌস, ৩/ আবদুল মামুন, ৪/ মোঃ ইসমাইল হোসেন, ৫/ মোঃ পারভেজ, ৬/ মোঃ ওমর ফারুক, ৭/ জান্নাতুল নাঈম, ৮/ সজীব রুদ্র, ৯/ শরিফুল ইসলাম, ১০/ অনুপম রুদ্র, ১১/ মোঃ ওসমান গনি।

ভুক্তভোগী শিক্ষকদের দাবি, ইউজিসির নির্দেশনা উপেক্ষা করে ও মহামান্য হাইকোর্টে বিচার প্রক্রিয়া চলাকালীন তড়িঘড়ি করে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে এবং এতে স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা নিশ্চিত করা হয়নি। তারা বিষয়টি তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

এদিকে পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়াটাই অবৈধ বলে গণমাধ্যমে জানিয়েছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ল্যাবরেটরী স্কুল এন্ড কলেজের সাবেক ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নাসিমা পারভীন। তিনি বলেন, দীর্ঘ পাঁচ বছর তাগিদ দেওয়ার পরেও দুঃখজনকভাবে তাদেরকে অপসারণ করা হলো। কিন্তু কলেজটি এতদিন তারাই চালিয়েছে। তিনি আরও বলেন, ইউজিসি বলছে যে, এতোদিন যেভাবে চলেছে সেভাবেই চলুক, চূড়ান্ত অর্গেনোগ্রাম পাস হওয়ার পরে বাজেট আসার পরে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে নতুন করে শিক্ষক নেওয়া হোক। কিন্তু এই প্রশাসন এটা মানে নাই। তিনি দুঃখের সাথে আরও বলেন, কিন্তু ওরা (চবি প্রশাসন) এই দোনটা নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছেন এবং অত্যন্ত অমানবিকভাবে যারা এতদিন কলেজটি চালিয়েছে তাদেরকে অবসায়ন পত্র দিয়ে বের করে দিয়েছে। সেই সাথে আমিও।

এরই ধারাবাহিকতায়, গত ১৮ ফেব্রুয়ারি পূর্ব উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইয়াহইয়া আখতারের আমলে চবি ল্যাবরেটরি কলেজ শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা বর্জন করে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন বরাবর ২ দফা দাবি জানিয়েছিল। সর্বশেষ, একই বিষয়ে আবারও কলেজটির শিক্ষার্থীরা ২৯ মার্চ ক্লাস পরীক্ষা বর্জনের ডাক দিয়ে প্রতিষ্ঠানটিতে সংঘটিত বিভিন্ন অনিয়ম, দুর্নীতি ও প্রশাসনিক সমস্যার কারনে শিক্ষা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যর্থ হওয়ার কথা জানিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের নবনিযুক্ত উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল ফোরকান বরাবর ৩ দফা দাবিতে স্মারকলিপি প্রদান করেছে। শিক্ষার্থীদের উত্থাপিত ৩ দাবি হলো: ১/ ১৬ কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত অধ্যক্ষকে অবিলম্বে অপসারণ করতে হবে। ২/ যে সকল শিক্ষকদের অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে তাদের ফিরিয়ে এনে পূর্ণবহাল করতে হবে। ৩/ হাইকোর্টের সিদ্ধান্ত অমান্য করে, প্রহসন মূলক পরীক্ষা নিয়ে যে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে তা বাতিল করতে হবে।

এ বিষয়ে চবি ল্যাবরেটরী স্কুল এন্ড কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী আবিদ জানান, আমাদের কর্মসূচি ছিল। আমাদের সকল স্টুডেন্ট ক্লাস বর্জন করবে, যতদিন না আমাদের যৌক্তিক দাবি গুলো আমরা আদায় করতে পারছি। তিনি আরও বলেন, ভিসি স্যার আমাদের কে জানিয়েছেন যে, আজকে তিনি কথা বলতে পারবেন না, তবে তিনি আমাদের বিষয় টা জানেন সেটা নিয়ে তিনি, চিন্তা করেছেন। তবে আমরা স্টুডেন্ট রা এস্পষ্ট ভাবে জানিয়ে দিতে চাই যে,আমাদের দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমরা ক্লাস বর্জন করবো।

এ বিষয়ে চবি ল্যাবরেটরী স্কুল এন্ড কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী নাঈম বলেন, আমাদের কলেজে দীর্ঘদিন যাবত যে আন্দোলন চলতেছে সেই আন্দোলনের মূল তিনটি বিষয় হলো আমাদের কলেজে যে অধ্যক্ষ দেওয়া হয়েছে তার নামে ১৬ কোটি টাকার একটি মামলা রয়েছে। আমরা চাই ওই অভিযুক্ত অধ্যক্ষকে অবিলম্বে অপসারণ করতে হবে। এবং আমাদের যেসব শিক্ষককে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে, তাদের পুনরায় ফিরিয়ে এনে ক্লাস পরিচালনা শুরু করতে হবে। এবং হাইকোর্টের সিদ্ধান্ত অমান্য করে প্রহসনমূলক পরীক্ষা নিয়ে যে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তা বাতিল করতে হবে।

Zoom Bangla News
Zoom Bangla News
inews.zoombangla.com
Follow

Follow Zoom Bangla News On Google

Open the Google follow page and tap the checkmark option to receive more updates from Zoom Bangla News in your Google news feed.

Follow Zoom Bangla News On Google

Mynul Islam Nadim is a journalist at Zoom Bangla News, contributing to news writing and editorial support. He is involved in refining content to ensure accuracy, clarity, and consistency for digital platforms. His work reflects a commitment to responsible journalism and audience-focused reporting.