বাংলাদেশ ও সৌদি আরব–এর সময়ের পার্থক্য মাত্র তিন ঘণ্টা। ঘড়ির হিসাবে এই ব্যবধান সামান্য। কিন্তু প্রায় প্রতিবছরই দেখা যায়, সৌদিতে ঈদ উদযাপিত হয় একদিন আগে, আর বাংলাদেশে একদিন পরে।

Moon

Advertisement

এমন পার্থক্যের কারণে সাধারণ মানুষের মনে স্বাভাবিক ভাবে প্রশ্ন, তিন ঘণ্টার সময় পার্থক্য কীভাবে ২৪ ঘণ্টার ক্যালেন্ডার ব্যবধানে রূপ নেয়? বিষয়টি কি শুধু ধর্মীয় সিদ্ধান্তের, নাকি এর পেছনে রয়েছে জ্যোতির্বিজ্ঞান ও ভৌগোলিক বাস্তবতা।

ইসলামি ক্যালেন্ডার সম্পূর্ণ চন্দ্রনির্ভর। নতুন মাস শুরু হয় নতুন চাঁদ দেখার মাধ্যমে। জ্যোতির্বিজ্ঞান অনুযায়ী, চাঁদের জন্মমুহূর্ত সারা পৃথিবীর জন্য এক সময়েই ঘটে। কিন্তু সেই মুহূর্তে চাঁদ দৃশ্যমান হয় না।

খালি চোখে দেখা যাওয়ার জন্য চাঁদের একটি নির্দিষ্ট বয়স, সূর্য থেকে কৌণিক দূরত্ব এবং সূর্যাস্তের সময় দিগন্তের উপরে পর্যাপ্ত উচ্চতায় থাকা প্রয়োজন। পৃথিবী পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে ঘোরে। ফলে নতুন চাঁদ সূর্যাস্তের পর পশ্চিম আকাশে প্রথমে দেখা যায়।

পশ্চিমের দেশগুলো অনেক সময় পূর্বাঞ্চলের আগে চাঁদ দেখার সুযোগ পায়।

আর বাংলাদেশ সৌদি আরবের পূর্বে অবস্থিত। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, সৌদি আরবে সূর্যাস্তের সময় চাঁদের বয়স ও অবস্থান এমন হয় যে সেটি দৃশ্যমান হতে পারে।
কিন্তু বাংলাদেশে তখন চাঁদ হয়তো খুব নিচুতে থাকে, নয়তো সূর্যাস্তের সময় তা দৃশ্যমানতার মানদণ্ড পূরণ করে না। ফলে বাংলাদেশকে পরবর্তী সূর্যাস্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। এখানেই তিন ঘণ্টার সময় ব্যবধান একদিনের ক্যালেন্ডার ব্যবধানে রূপ নেয়।

ভৌগোলিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. মো. আব্দুর কাদের বলেন, নতুন চাঁদ থেকে আরেক নতুন চাঁদ পর্যন্ত সময় লাগে গড়ে ২৯ দশমিক ৫ দিন। একে বলে সিনোডিক মান্থ বা চন্দ্রমাস। এনএএসএ (নাসা)-এর তথ্য অনুযায়ী, সিনোডিক মাসের দৈর্ঘ্য ২৯ দিন ১২ ঘণ্টা ৪৪ মিনিট ৩ সেকেন্ড।

এই ২৯ দশমিক ৫ দিনের হিসেবে চন্দ্রবর্ষ হয় ৩৫৪ বা ৩৫৫ দিনে। সৌরবর্ষ থেকে প্রায় ১১ দিন কম। অর্থাৎ সূর্যের ১১ দিন আগেই চাঁদের এক বছর হয়ে যায়। ফলে প্রতিবছর ঈদ সৌরবর্ষের হিসাবে ১০-১১ দিন করে এগিয়ে আসে। ২০২৫ সালে ৩১শে মার্চে ঈদ হয়েছে, তাই ২০২৬ সালে ঈদ হবে ২০ বা ২১শে মার্চে।

বাংলাদেশ সৌদি আরবের চেয়ে ৩ ঘণ্টা এগিয়ে। এই ৩ ঘণ্টা মূলত সৌরবর্ষ বা সূর্যের হিসাবে, চন্দ্রবর্ষের হিসাবে না। চাঁদের হিসাবে এই পার্থক্যটা ৩ ঘণ্টার নয়, বরং ২১ ঘণ্টার।

পশ্চিম আকাশে যখন সুর্য ডুবে, তার ঠিক পরপর এই পশ্চিম আকাশেই নতুন চাঁদ ওঠে। আর খালি চোখে নতুন চাঁদ দেখার জন্য সূর্য ও চাঁদের মধ্যে কমপক্ষে ১০ দশমিক ৫ ডিগ্রি কোণ তৈরি হতে হয়, আর এই কোণে পৌঁছতে চাঁদের সময় লাগে ১৭ থেকে ২৪ ঘণ্টা।

সেই হিসাবে সৌদি আরবে চাঁদ দেখার সুযোগ আসে বাংলাদেশের প্রায় ২১ ঘণ্টা আগে। সৌদি আরব আমাদের পশ্চিমে হওয়ায় সেখানে সন্ধ্যা হয় আমাদের চেয়ে ৩ ঘণ্টা পরে। আর চাঁদ যেহেতু ২১ ঘণ্টা এগিয়ে চলে, তাই সেখানে চাঁদ ওঠে আমাদের ১ দিন আগে।

মজার বিষয় হলো, জাপান বা ইন্দোনেশিয়া বাংলাদেশের পূর্বে হওয়া সত্ত্বেও তারা সৌদি আরবের সাথে একই দিনে ঈদ করে। কারণ জাপানে যখন সূর্য ও চাঁদের মধ্যবর্তী কোণ ১০ দশমিক ৫ ডিগ্রি হয়, বাংলাদেশে তখন তার চেয়ে কম হয়। কখনও ১০ দশমিক ৫ ডিগ্রি হলেও সেটা ভূপ্রাকৃতিক আবহাওয়ার কারণে দেখা যায় না। কারণ ১০ দশমিক ৫ ডিগ্রি হল সর্বনিম্ন, এর কম ডিগ্রিতে খালি চোখে চাঁদ দেখা সম্ভব না।

ফলে দৃশ্যমান হতে হতে চাঁদের প্রায় ১৭ থেকে ২৪ ঘণ্টা লেগে যায়। তাই আমরা জাপানের চেয়ে পরে চাঁদ দেখি। আর জাপান সৌদি আরবের সাথে একই তারিখে ঈদ করতে পারে। মূলত ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে পশ্চিম-পূর্ব দুই দিক থেকেই চাঁদের হিসেবে বাংলাদেশ একদিন পিছিয়ে।

বাংলাদেশে জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটি দেশের ভৌগোলিক সীমানার ভেতরে চাঁদ দেখার সাক্ষ্যের ভিত্তিতে মাস শুরুর ঘোষণা দেয়। অন্যদিকে সৌদি আরব তাদের নিজস্ব পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়। এই নীতিগত পার্থক্যও তারিখে ব্যবধান তৈরি করে।

আবহাওয়াবিদ ড. আবুল কালাম মল্লিক জানান, চাঁদের পজিশন সৌদি আরব এবং বাংলাদেশে এক নয়। মূলত অক্ষাংশ এবং দ্রাঘিমাংশের পার্থক্যের কারণে এবং সূর্য যেহেতু স্থির থাকে, পৃথিবী সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘোরে তাই স্থানীয় সমযের পার্থক্য ঘটে।

আর এই পার্থক্যের কারণ বাংলাদেশ যখন দিন, সৌদি আরবে সন্ধ্যা নেমে আসে। স্থানীয় সময়ের পার্থক্য দুই দেশের কয়েকঘণ্টা হলেও চাঁদ দেখা যায় বাংলাদেশ থেকে একদিন পরে।

বিশ্লেষকদের মতে, তাত্ত্বিকভাবে বাংলাদেশ, সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশের সাথে মিল রেখে একই দিনে ঈদ পালন করা সম্ভব। যদি পুরো বিশ্বের মুসলিম উম্মাহ মক্কাকে কেন্দ্র করে একটি নির্দিষ্ট ক্যালেন্ডার অনুসরণ করে, অন্যদিকে খালি চোখে চাঁদ দেখার ওপর নির্ভর না করে বৈজ্ঞানিক হিসাব ব্যবহার করলে এই বিভ্রান্তি দূর হয়। তুরস্কসহ অনেক দেশ এখন এই পদ্ধতি অনুসরণ করছে।

তবে আলেমদের মতে, শরীয়তে স্থানীয়ভাবে চাঁদ দেখার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আবার জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা বলছেন, আধুনিক প্রযুক্তি এখন অত্যন্ত নির্ভুলভাবে চাঁদের অবস্থান ও দৃশ্যমানতা গণনা করতে পারে। নীতিগত ঐকমত্য হলে আগাম তারিখ নির্ধারণও সম্ভব।

বিএনপির চেয়ারম্যান ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২০২৫ সালের ২ মার্চ লন্ডন থেকে ভার্চুয়ালি এক ইফতার মাহফিলের বক্তব্যে বলেছিলেন, ‘আমরা আধুনিক বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে চাই। সৌদি আরবের সাথে আমাদের সময়ের ব্যবধান মাত্র কয়েক ঘণ্টা, অথচ রোজা- ঈদ উৎসবের ক্ষেত্রে আমরা একদিন পিছিয়ে থাকি।’

তিনি আরও বলেছিলেন, ‘বিজ্ঞানের এই যুগে ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে কীভাবে সারা বিশ্বের মুসলিম উম্মাহ একই দিনে ঐক্যবদ্ধভাবে উৎসব পালন করতে পারে, তা নিয়ে আমাদের চিন্তাভাবনা করা প্রয়োজন। এটি কেবল ধর্মের বিষয় নয়, এটি আমাদের বিশ্ব নাগরিক হিসেবে একীভূত হওয়ারও একটি অংশ।’

এ প্রসঙ্গে কদমতলী হাজী ইউনুস কওমী মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল মাওলানা মোরশেদুল আলম বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বর্তমানে দেশের ক্ষমতার উচ্চ পর্যায়ে রয়েছেন। এখন তিনি চাইলে সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশের সঙ্গে আলোচনা ও পর্যালোচনার মাধ্যমে এ বিষয়ে সমাধানের কার্যকর উদ্যোগ নিতে পারেন।

বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের মধ্যে ঈদের একদিনের ব্যবধান ঘড়ির সময়ের কারণে নয়। এটি চাঁদের অবস্থান, সূর্যাস্তের সময়, পৃথিবীর ঘূর্ণন এবং স্থানীয় পর্যবেক্ষণ নীতির সমন্বিত ফল।

বর্তমান সরকার এবং ধর্মীয় বিশেষজ্ঞরা যদি ‘আঞ্চলিক চাঁদ’ দেখার পরিবর্তে ‘বৈশ্বিক চাঁদ’ দেখার নীতি গ্রহণ করেন, তবেই এই একদিনের পার্থক্য ঘুচবে। তবে এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী নীতিগত সিদ্ধান্তের বিষয়। যতদিন পর্যন্ত প্রতিটি দেশ নিজস্ব ভূখণ্ডে চাঁদ দেখার ওপর গুরুত্ব দেবে, ততদিন এই একদিনের ব্যবধান বজায় থাকার সম্ভাবনাই বেশি।

তরুণ লেখক মাওলানা রাকিবুল ইসলাম বলেন, চাঁদ দেখার ক্ষেত্রে আলেমদের মধ্যে দুটি মত দেখা যায়। অধিকাংশের মত হলো, যে দেশে যখন চাঁদ দেখা যাবে, সে দেশে তখনই রমজান শুরু হবে। অল্পসংখ্যক কিছু সালাফি আলেম মনে করেন, সারা বিশ্বে একই দিনে রমজান ও ঈদ পালন করতে হবে।

আরও পড়ুন : ২০২৬ সালে যে ৮ দক্ষতা আপনাকে সফলতা এনে দেবে

অবশ্য বাংলাদেশের জাতীয় মসজিদের খতিব মাওলানা মুহাম্মাদ আব্দুল মালেক দ্বিতীয় মতটির দীর্ঘ খণ্ডন করতে গিয়ে বলেন, ‘সমগ্র বিশ্বে একই দিনে রোযা শুরু করা, রমজান মাস শেষ হলে একই দিনে ঈদ করা এবং একই দিনে ঈদুল আযহা করা—ভৌগোলিক ও জ্যোতির্শাস্ত্রীয় বাস্তবতার দিক থেকে এগুলো মূলত সম্ভবই নয়। কার্যত যা সম্ভব নয়, শরীয়ত নাযিলের সময় সে বিষয়ের ধারণা থাকলেও, শরীয়ত এর হুকুম দেয় না।… কুরআন-হাদিসে চাঁদ দেখে রোযা রাখা ও চাঁদ দেখে রোযা ভাঙ্গার কথা বলা হয়েছে। সবাইকে একই দিনে রোযা ও ঈদ করার কথা কোথাও বলা হয়নি এবং ভৌগোলিক কারণে এটি সম্ভবও না।’

সূত্র : বাংলানিউজ২৪

Zoom Bangla News
Zoom Bangla News
inews.zoombangla.com
Follow

Follow Zoom Bangla News On Google

Open the Google follow page and tap the checkmark option to receive more updates from Zoom Bangla News in your Google news feed.

Follow Zoom Bangla News On Google

Shamim Reza is an experienced journalist and sub-editor at Zoom Bangla News, with over 13 years of professional experience in the field of journalism. Known for his strong writing skills and editorial insight, he contributes to producing accurate, engaging, and well-structured news content. Born and brought up in Jashore, his background and experience shape his deep understanding of social and regional perspectives in news reporting.