দুই দশক আগের কথা। যখন টেলিভিশনে ভারতীয় ক্রিকেট দল হারলেই এক নাম ভেসে উঠত আলোচনায়—অভিনেত্রী নাগমা। সেই সময় ক্রিকেটপ্রেমীদের একটি বড় অংশের অভিযোগ ছিল— সৌরভ গাঙ্গুলির জীবনে ‘অন্য কারও উপস্থিতি’ নাকি তার খেলায় প্রভাব ফেলছে। আর সেই ‘অন্য কেউ’ বলতে তারা ইঙ্গিত করতেন অভিনেত্রী নাগমার দিকেই।

যদিও প্রকাশ্যে কেউ কখনো মুখ খোলেননি। তবু ক্রিকেট–বলিউড ঘিরে সম্পর্কের সেই গুঞ্জন একসময় তুমুল আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। গত ২৫ ডিসেম্বর সেই অভিনেত্রীর জন্মদিন ছিল। অর্ধশতক পূর্ণ করলেন সেই বলিউডের আলোচিত ও বিতর্কিত নায়িকা নাগমা।
১৬ বছর বয়সে বলিউড ইন্ডাস্ট্রিতে অভিষেক হয় নাগমার। বলি ভাইজানখ্যাত অভিনেতা সালমান খানের বিপরীতে ‘বাঘি’ সিনেমায় অভিনয়ের মধ্য দিয়ে শুরু হয় তার ক্যারিয়ার। অল্প বয়সে হঠাৎ তারকাখ্যাতি, পরিবারের ভাঙন আর ব্যক্তিগত জীবনের চাপ— সব মিলিয়েই অভিনেত্রীর জীবনের শুরুর দিনগুলো ছিল একরকম লড়াইয়ের গল্প। একজীবনে নাগমার জীবনে প্রেম এসেছে, আবার চলেও গেছে।
কিন্তু সবচেয়ে আলোচিত থেকেছে ক্রিকেটার সৌরভ গাঙ্গুলির সঙ্গে তার সেই রহস্যময় সম্পর্ক। ভারত হেরেও তাকে দায় নিতে হয়েছে—এমন ঘটনাও বিরল নয়। বলিউড–ক্রিকেট–রাজনীতি— সব মিলিয়ে নাগমার জীবন যেন এক সিনেমার মতোই রঙিন, আবার একই সঙ্গে ঝড়ঝাপটার গল্পও।
সালমান খানের হাত ধরে বলিউডে যাত্রা শুরু নাগমার। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে আবির্ভূত হন তিনি। মাত্র ১৬–১৭ বছর বয়সেই তার নায়িকা–জীবন শুরু। ১৯৯০ সালে সালমান খানের বিপরীতে ‘বাঘি: এ রেবেল ফর লাভ’ সিনেমায় অভিনয় করে রাতারাতি পরিচিতি পান তিনি। এ সিনেমাটি সেই সময় বলিউডে সর্বাধিক ব্যবসাসফল সিনেমার মধ্যে একটি ছিল। আর নতুন নায়িকা হিসেবেই নাগমা নিশ্চিত জায়গা করে নেন দর্শকদের মনে।
এরপর তার যাত্রা থামেনি—শাহরুখ খান, অক্ষয় কুমার, অজয় দেবগন, সুনীল শেঠি—তখনকার জনপ্রিয় প্রায় সব নায়কের সঙ্গেই কাজ করেছেন নাগমা। শুধু হিন্দি নয়, তিনি সমান সাফল্য পেয়েছেন দক্ষিণী ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতেও— তামিল, তেলেগু, মালায়ালাম এবং কন্নড়ের বহু সিনেমায় অভিনয় করেছেন। এমনকি পরে ভোজপুরি, পাঞ্জাবি ও মারাঠি সিনেমাতেও নিয়মিত দেখা গেছে তাকে। রজনীকান্তের সঙ্গেও তার অভিনয় ছিল বিশেষ আলোচনায়।
সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি যেন রূপকথার মতো ছিল ২০০০ সালের দিকে। কিন্তু শেষটা ছিল ছকভাঙা! আচমকাই বলিউড আর ক্রিকেট মিলিয়ে ছড়িয়ে পড়ে এক কানাঘুষা—ভারতের অধিনায়ক সৌরভ গাঙ্গুলি নাকি প্রেমে পড়েছেন অভিনেত্রী নাগমার।
এ খবর যেন আগুনে ঘি ঢালার মতো ছড়িয়ে পড়ে ইন্ডাস্ট্রিতে। টিভির সংবাদ থেকে পাড়ার চায়ের দোকান—সবখানেই তখন শুধু আলোচনা আর সমালোচনা— দাদা–নাগমা কি তবে সত্যিই প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে? এই সম্পর্কে ‘পরকীয়ার’ অভিযোগ ওঠায় শুরু হয় সমালোচনা।
কিন্তু মজার ব্যাপার হলো—দুজনের কেউ-ই মুখ খোলেননি। এর মধ্যেই শুরু হলো অদ্ভুত এক প্রবণতা। ভারত ম্যাচ হারলেই ভুলটা ধরা পড়ত একদম নাগমার ঘাড়ে! কেউ কেউ বলতেন—‘দাদা নাকি মাঠের বদলে প্রেমেই বেশি মন দিচ্ছেন!’ কতটা সত্যি তার প্রমাণ নেই—তবু এই অভিযোগ এমন নিয়মিত হয়ে উঠল যে, নাগমা যেন অঘোষিতভাবে দলের ‘স্কেপগোট’ হয়ে গেলেন।
এ নিয়েই বাড়তে থাকে চাপ, মিডিয়ার তোলপাড় আর ব্যক্তিজীবনের টানাপোড়েন। বছরের পর বছর নীরবতা বজায় থাকলেও গুঞ্জন থামেনি। আর ঠিক কখন, কীভাবে পথ আলাদা হয়ে গেল—তার উত্তর আজও ধোঁয়াশার মতোই রয়ে গেছে। শুধু এটুকুই সত্য—সৌরভ–নাগমাকে ঘিরে রহস্যটা আজও বলিউড–ক্রিকেট দুনিয়ার সবচেয়ে চর্চিত প্রেমকাহিনিগুলোর একটি।
সৌরভের পর দক্ষিণী তারকা শরৎ কুমারের সঙ্গেও নাগমার নাম জড়িয়ে পড়ে। তখন দুজনকে বেশ কিছু সফল দক্ষিণী সিনেমায় একসঙ্গে অভিনয় করতে দেখা গেছে। কাজের সূত্রে তাদের ঘনিষ্ঠতা বাড়ে—এমনটাই প্রচারমাধ্যমের দাবি।
পরে ভোজপুরি ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ শুরু করলে আবারও নতুন করে তার নাম জড়ায় অভিনেতা রবি কিষাণের সঙ্গে। রবি একাধিক সাক্ষাৎকারে সম্পর্কের ইঙ্গিত দিলেও নাগমা ছিলেন অপেক্ষাকৃত নীরব। একই সময়ে আরেক ভোজপুরি অভিনেতা মনোজ তিওয়ারির সঙ্গেও তার ঘনিষ্ঠতার খবর প্রকাশ্যে আসে। ফলে পর্দার সাফল্যের চেয়ে ব্যক্তিজীবন নিয়ে বিতর্কই যেন বেশি আলোচনায় আসে।
দক্ষিণী ইন্ডাস্ট্রি থেকে দূরে সরে গিয়ে ধীরে ধীরে আড়ালেই চলে যান নাগমা। ক্যারিয়ারের এই মোড় পরিবর্তনের পেছনে ব্যক্তিজীবনের আলোচনাই বড় কারণ হয়ে উঠেছিল—এমনটাই মনে করেন অনেকেই।
২০০৪ সালে রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন নাগমা। কংগ্রেসে যোগ দিয়ে সক্রিয় রাজনীতিতে নাম লেখান অভিনেত্রী। এর পর থেকেই তিনি কংগ্রেসের হয়ে নিয়মিত সভা–সমাবেশ, জনসংযোগ ও প্রচারণায় অংশ নিতে থাকেন এবং ধীরে ধীরে নিজেকে রাজনীতিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি অল ইন্ডিয়া কংগ্রেস কমিটির সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন এবং বিশেষ করে নারী ও সামাজিক অধিকারসংক্রান্ত কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।
২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে তিনি উত্তরপ্রদেশের মিরাট আসন থেকে কংগ্রেসের প্রার্থী হন, যদিও শেষ পর্যন্ত জয় পাননি। তারপরও দলীয় দায়িত্ব থেকে সরে যাননি; বিভিন্ন রাজ্যের নির্বাচন ও প্রচারণায় এখনো কংগ্রেসের মুখ হিসেবে কাজ করে যাচ্ছেন। প্রায় দুই দশক ধরে সিনেমা থেকে দূরে থেকে নাগমা বর্তমানে নিজেকে পুরোপুরি রাজনীতি ও সামাজিক কাজের সঙ্গেই যুক্ত রেখে চলেছেন।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


