দেশে জ্বালানি খাতের অস্থিরতা কমাতে এবং পেট্রোল পাম্প মালিকদের অবৈধ মজুত রোধে নতুন উদ্যোগ হিসেবে ট্যাগ অফিসার নিয়োগ দিয়েছে সরকার। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় শুরু হওয়া এই পদক্ষেপ এরই মধ্যে ইতিবাচক ফল দিতে শুরু করেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

তেলের পাম্প

Advertisement

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রতিটি নির্ধারিত পেট্রোল পাম্পে একজন করে ট্যাগ অফিসার দায়িত্ব পালন করছেন। তাদের মূল কাজ হচ্ছে জ্বালানির মজুত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং পাম্পে শৃঙ্খলা বজায় রাখা। এতে কোনো পাম্প মালিক যেন কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করতে না পারেন, সে বিষয়টি নিশ্চিত করা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আগে অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগ ছিল- কিছু পাম্প মালিক চাহিদা থাকা সত্ত্বেও তেল সরবরাহ না করে অবৈধভাবে মজুত রাখতেন, পরে উচ্চমূল্যে বিক্রির চেষ্টা করতেন। ট্যাগ অফিসার নিয়োগের ফলে এসব অনিয়ম অনেকটাই কমে এসেছে।

মাঠ পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করা একাধিক ট্যাগ অফিসার জানিয়েছেন, তারা নিয়মিতভাবে পাম্পের স্টক রেজিস্ট্রার যাচাই করছেন এবং সরবরাহের সঙ্গে মজুতের মিল খতিয়ে দেখছেন। কোথাও কোনো অসঙ্গতি পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিকভাবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হচ্ছে। পাম্প মালিকরাও সরকারের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাদের মতে, এতে বাজারে স্বচ্ছতা বাড়ছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, এই উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে দেশের জ্বালানি বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে। পাশাপাশি ভোক্তাদের ভোগান্তিও কমবে।

তবে তারা সতর্ক করে বলেছেন, ট্যাগ অফিসারদের কার্যক্রম যেন নিয়মিত মনিটরিংয়ের আওতায় থাকে এবং কোনো ধরনের দুর্নীতি বা পক্ষপাতিত্ব যেন না হয়, সেদিকে নজর রাখতে হবে।

যেসব কাজ করছেন ট্যাগ অফিসাররা

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে ট্যাগ অফিসারদের কর্মপরিধির বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সেগুলো হলো:

১. ফিলিং স্টেশনের দৈনিক প্রারম্ভিক মজুত রেকর্ডভুক্ত করা।

২. ডিপো থেকে সরবরাহ করা জ্বালানি তেল নিজ নিজ ফিলিং স্টেশনে উপস্থিত হয়ে পরিমাপ করে গ্রহণ করা এবং ফিলিং স্টেশনের পে-অর্ডার ও ডিপোর চালান/রিসিটের সঙ্গে তেলের পরিমাণ মিলিয়ে দেখা।

৩. নিজ নিজ ফিলিং স্টেশনে ডিপ রড/ডিপ স্টিকের মাধ্যমে সরবরাহকৃত জ্বালানি তেল বুঝে নেওয়া।

৪. ফিলিং স্টেশনে সংরক্ষিত রেজিস্ট্রারে ডিপো থেকে দৈনিক জ্বালানি তেল গ্রহণের হিসাব লিপিবদ্ধ হয়েছে কি না তা মনিটরিং করা।

৫. ফিলিং স্টেশনের ডিসপেন্সিং মেশিনের দৈনিক মিটার রিডিং সংক্রান্ত রেজিস্ট্রার পর্যবেক্ষণ করে দৈনিক বিক্রির সঙ্গে মিলিয়ে দেখা।

৬. দৈনিক বিক্রি শেষে ফিলিং স্টেশনের সমাপনী মজুত পর্যালোচনা।

৭. ফিলিং স্টেশনের ডিসপেন্সিং মেশিনের পরিমাপ যথাযথ হচ্ছে কি না তা নিয়মিত তদারকি করা।

৮. ফিলিং স্টেশন অনুমোদন প্রাপ্তির সময় বিস্ফোরক পরিদপ্তর থেকে অনুমোদিত লে-আউট প্ল্যানে পণ্যভিত্তিক মজুত ক্ষমতার তথ্য এবং বিদ্যমান মজুত ক্ষমতার তথ্য যাচাই করা।

৯. ফিলিং স্টেশনের আশপাশে অননুমোদিত কোনো ট্যাংক/স্থাপনা আছে কি না তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা।

১০. ডিপো থেকে-পাম্প, পাম্প থেকে ভোক্তা সরবরাহ ব্যবস্থাকে দৃশ্যমান করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা।

১১. প্রতিটি ডিপো, ট্যাঙ্কার, পাম্প এবং খুচরা বিক্রির তথ্য একত্রে পর্যবেক্ষণ করা এবং প্রতিটি পাম্পে দিনে অন্তত ৩ বার (সকাল, দুপুর, সন্ধ্যা) স্টক আপডেট বাধ্যতামূলক করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা।

১২. ডিপো থেকে জ্বালানি নেওয়ার পর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে খুচরা বিক্রি শুরু না করলে তা লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য করতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, জ্বালানি গ্রহণের ১ ঘণ্টার মধ্যে বিক্রি শুরু বাধ্যতামূলক করতে হবে। প্রথমবার সতর্কতা, দ্বিতীয়বার মোবাইল কোর্ট, তৃতীয়বার সাময়িক স্থগিতাদেশ ইত্যাদির জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

১৩. পাম্প খোলা আছে কি না, স্টক রেজিস্ট্রার সঠিক আছে কি না, ডিসপ্লে বোর্ড আছে কি না, ক্যাশ মেমো দেওয়া হচ্ছে কি না, নির্ধারিত সীমা মানা হচ্ছে কি না, কনটেইনারে অবৈধ বিক্রি হচ্ছে কি না, সারি ব্যবস্থাপনা কেমন—এসব বিষয় জিও-ট্যাগ প্রমাণসহ রিপোর্ট করা।

যা বলছেন ট্যাগ কর্মকর্তারা

নওগাঁর রানীনগর উপজেলার উপ-সহকারী উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তা মো. নাজমুল হুদা একই উপজেলার শাহী পেট্রোল পাম্পে ট্যাগ অফিসারের দায়িত্ব পেয়েছেন। নিজ অফিসের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি আবার পেট্রোল পাম্পে একাধিকবার পরিদর্শন ও দায়িত্ব পালন করছেন।

মুঠোফোনে তিনি বলেন, ‘আমাদের এখানে ডিজেলের কোনো সংকট নেই। সবাই ডিজেল নিতে পারছে। আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে আমার পাম্পে অকটেন পাইনি। আমরা শুধু পেট্রোল দিতে পারছি। পেট্রোলে তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার লিটার বরাদ্দ পাওয়া যাচ্ছে। দেড়শ থেকে দুইশ গাড়ির সিরিয়াল থাকে। তার বেশিও হতে পারে। প্রথমদিকে একজনকে ২০০ টাকার তেল দেওয়া হতো। এখন ৫০০ টাকার করে দেওয়া হয়।’

তিনি আরও বলেন, পাম্পে অনেক সিরিয়াল থাকে। জনগণকে পাম্পের কর্মচারীরা ঠিকভাবে বুঝাতে পারে না। অনেক সময় পাম্পের লোকজনের পছন্দের বা পরিচিতদের আগে সিরিয়াল দিতো। আমরা সকালে এবং রাতে পাম্পের স্টক লিখে নিয়ে আসি। এতে তারা কালোবাজারি করতে পারে না। আমরা মনিটরিং করায় কালোবাজারি করার সুযোগ নেই।

রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা রাতু রুমানা খাতুন। দায়িত্ব পেয়েছেন উপজেলার রামনাথপুরের মিরপাড়ায় অবস্থিত মেসার্স বদরগঞ্জ ফিলিং স্টেশনে। নিজের দপ্তরের কাজ সামলে ট্যাগ অফিসার হিসেবে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। জানালেন চ্যালেঞ্জের কথাও।

রাতু রুমানা খাতুন বলেন, পাম্পে তেল আনলোড করার সময় আমি থাকি। সবাই যেন সিরিয়াল মেনে তেল নিতে পারে সে বিষয়ে লক্ষ্য রাখতে হয়। তেলের মজুত যতক্ষণ থাকছে জনগণই তেল পাচ্ছে। যখন তেলের মজুত শেষ হয়ে যায় আমরা তখন চলে আসি। আবার আমাদের মাঠের কার্যক্রমও দেখতে হচ্ছে। তেলের গাড়ি এলে ম্যানেজার আমাদের ফোন দেয়, তখন গিয়ে ওখানকার দায়িত্ব পালন করি।

তিনি বলেন, আমি যেই পাম্পের দায়িত্বে ওখানে তিন হাজার লিটার করে তেল আসে। একদিন ৪ হাজার লিটার এসেছিল। এখানে ডিজেলের কোনো সংকট নেই। তবে অকটেন পাচ্ছি না। পেট্রোল পাই তবে মাঝে মধ্যে মিস হয়। আমরা পাম্পে থাকাকালীন লাইন ছাড়া কেউ তেল নিতে আসে না। তবে সরকারি গাড়ি এলে আমরা একটু আগে দিয়ে দেই। অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো ঘটনা ঘটে না, জনগণ সুন্দরভাবেই এখানে তেল নেয়।

রাতু রুমানা খাতুন বলেন, ট্যাগ অফিসার নিয়োগ দেওয়ার কারণে ইচ্ছা করলে পাম্প সংশ্লিষ্টরা কালোবাজারি করতে পারে না। তারা মনে করে এখানে তো দায়িত্বপ্রাপ্ত একজন আছে, তাকে হিসাব দিতে হবে। জনগণেরও আস্থা থাকে যে এখানে একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত আছে সেহেতু দুর্নীতি হবে না, সুষ্ঠুভাবেই তেল পাওয়া যাবে।

তিনি বলেন, আমাদের বিভাগের অনেক দায়িত্ব, অনেক কাজ। কাজের পাশাপাশি পেট্রোল পাম্পের দায়িত্ব পালন করা আমাদের জন্য একটু চাপ হয়ে যায়। তারপরও সংকটকালীন সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা দায়িত্ব পালন করছি।

ঝিনাইদহ সদর উপজেলার উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মিঠুন দাস ট্যাগ অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন স্থানীয় খড়িখালী এলাকার ইয়াফাদ ফিলিং স্টেশনে।

দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা সুখকর নয় জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের এখানে তেলের সংকট নেই। সমস্যাটা করছে স্থানীয় জনগণ। পাম্পের আশপাশে যাদের বাড়ি তারা একটা প্রেশার তৈরি করে বারবার তেল নিতে চায়।’

তিনি বলেন, ‘আমরা এখানে একটা সিস্টেম চালু করেছি। মোটরসাইকেলে তেল ফুল ট্যাংকি দিচ্ছি কিন্তু টায়ারে সাদা রং লাগিয়ে দিচ্ছি। আর স্থানীয়রা পাম্পের যেই অংশে দাঁড়িয়ে ঝামেলা তৈরি করার চেষ্টা করে সেখানে ট্রাক রেখে দিয়েছি। এরপর স্থানীয় লোকজন পাম্পের ম্যানেজারের ওপর অনেকটা চড়াও হয়েছে। পরে পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করেছে।

মিঠুন দাস আরও বলেন, পাম্পে গিয়ে কী পরিমাণ তেল আসছে, সেটি আমরা পরিমাপ করে নিচ্ছি। এরপর বিক্রি শুরু হচ্ছে। লাইনে সিরিয়াল অনুযায়ী তেল দেওয়া হচ্ছে।

এই ট্যাগ অফিসারের ধারণা, পাম্পগুলোতে স্থানীয় একটি চক্র বারবার ফুল ট্যাংকি তেল নিচ্ছে। এরপর সেগুলো বোতলজাত করে বাড়তি দামে বিক্রি করছে। এটি অনেকটা ব্যবসা বা পেশার মতো হয়ে গেছে। অনেক চাকরিজীবী আছেন যারা ৩-৪ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে তেল নিতে চায় না। এই সুযোগটাকে কাজে লাগাচ্ছে এই চক্র।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলার, ডিস্ট্রিবিউটারস, এজেন্টস এবং পেট্রোল পাম্প অনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য সচিব মীর আহসান উদ্দিন পারভেজ বলেন, ট্যাগ অফিসার নিয়োগে পাম্পগুলোতে কিছুটা হলেও স্বস্তি এসেছে। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও জোরদার ভূমিকা রাখার আহ্বান জানাচ্ছি। কিছু পাম্পে উচ্ছৃঙ্খল কিছু ক্রেতার কারণেই বিশৃঙ্খলা ঘটছে। ট্যাগ অফিসারের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেও জোরদার ভূমিকা রাখতে হবে। একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটার পরে যদি প্রশাসন আসে তখন আর কিছু করার থাকে না। পাম্পের স্টাফদের নিরাপত্তা প্রয়োজন। অন্তত কিছুক্ষণ পরপর হলেও যেন পাম্পগুলোতে পুলিশি টহল থাকে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সাবেক অধ্যাপক, জ্বালানি ও টেকসই উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন বলেন, এখন সাংঘাতিক রকমের একটা ক্রিটিক্যাল সময় চলছে। আমি যেই পাম্পগুলোর সামনে দিয়ে যাচ্ছি সেখানে দীর্ঘ সিরিয়াল দেখছি। এই ক্রিটিক্যাল সময়ে যত ম্যানপাওয়ার ব্যবহার করা যায় ততখানি ব্যবহার করতে হবে। অন্যান্য যেসব পদক্ষেপ নিলে পরিস্থিতি ইম্প্রুভ করবে সেগুলোও দ্রুত নেওয়া উচিত।

আরও পড়ুন : ২০২৬ সালে যে ৮ দক্ষতা আপনাকে সফলতা এনে দেবে

ইজাজ হোসেন বলেন, তবে আমাদের শ্রীলঙ্কার মতো পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। কিউআর কোডের মাধ্যমে একটি নিবন্ধিত যানবাহন যেন নির্দিষ্ট পরিমাণ তেল নিতে পারে। আমাদের ওই ডিজিটাল সিস্টেমে চলে যেতে হবে। আর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আমাদের ডিজেল এবং অকটেনের মজুত বাড়াতে হবে। অন্তত ৬০ দিন মজুতের ব্যবস্থা রাখতে হবে।

সূত্র ও ছবি : জাগো নিউজ

Zoom Bangla News
Zoom Bangla News
inews.zoombangla.com
Follow

Follow Zoom Bangla News On Google

Open the Google follow page and tap the checkmark option to receive more updates from Zoom Bangla News in your Google news feed.

Follow Zoom Bangla News On Google

Shamim Reza is an experienced journalist and sub-editor at Zoom Bangla News, with over 13 years of professional experience in the field of journalism. Known for his strong writing skills and editorial insight, he contributes to producing accurate, engaging, and well-structured news content. Born and brought up in Jashore, his background and experience shape his deep understanding of social and regional perspectives in news reporting.