ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ গঠনের পর নতুন মন্ত্রিসভা নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনা চলছে। বিশেষ করে ‘টেকনোক্র্যাট’ কোটায় কারা মন্ত্রী হয়েছেন—তা নিয়ে সাধারণ মানুষের আগ্রহ চোখে পড়ার মতো। সংসদ সদস্য (এমপি) না হয়েও কীভাবে কেউ মন্ত্রী হন এবং কেন এমন সুযোগ রাখা হয়েছে—এই প্রশ্নই এখন আলোচনার কেন্দ্রে।

টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী কী?
সহজভাবে বলতে গেলে, যিনি সরাসরি নির্বাচনে অংশ নিয়ে সংসদ সদস্য হননি, কিন্তু বিশেষ দক্ষতা, পেশাগত অভিজ্ঞতা বা নীতিনির্ধারণী সক্ষমতার কারণে প্রধানমন্ত্রীর সুপারিশে মন্ত্রিসভায় স্থান পান—তিনিই টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী। অর্থনীতি, তথ্যপ্রযুক্তি, পররাষ্ট্র বা স্বাস্থ্যখাতের মতো জটিল ও বিশেষায়িত ক্ষেত্রে এ ধরনের নিয়োগ বেশি দেখা যায়।
সাংবিধানিক ভিত্তি
বাংলাদেশের সংবিধান–এর ৫৬(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রিসভার মোট সদস্যের অনধিক এক-দশমাংশ সংসদ সদস্য নন—এমন ব্যক্তিদের মধ্য থেকে নিয়োগ দিতে পারেন। তবে শর্ত হলো, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সংসদ সদস্য হওয়ার সব সাংবিধানিক যোগ্যতা থাকতে হবে। অর্থাৎ, তিনি নির্বাচনে অংশ নিলে আইনগতভাবে অযোগ্য হতেন না।
কেন রাখা হয়েছে এ ব্যবস্থা?
সরকার পরিচালনায় বিশেষ প্রয়োজন থেকেই টেকনোক্র্যাট কোটার বিধান রাখা হয়েছে।
রাষ্ট্র পরিচালনার নানা ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ মতামত ও কারিগরি দক্ষতার প্রয়োজন হয়। সরাসরি রাজনীতিতে সক্রিয় না থাকলেও পেশাগতভাবে দক্ষ ব্যক্তিরা নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।
মেধা ও অভিজ্ঞতার মূল্যায়ন: দলের ভেতরে বা বাইরে থাকা উচ্চশিক্ষিত ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের সরকার পরিচালনায় যুক্ত করার সুযোগ তৈরি হয়।
রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা: কোনো জ্যেষ্ঠ বা পরীক্ষিত নেতা নির্বাচনে অংশ নিতে না পারলে বা পরাজিত হলেও তার অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে এ কোটা ব্যবহার করা হয়।
গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর
টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী কাকে বলা হয়? নির্বাচনে জয়ী না হয়ে, বিশেষ যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রধানমন্ত্রীর মাধ্যমে মন্ত্রিসভায় নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে।
সংসদ সদস্য না হয়েও কীভাবে মন্ত্রী হন? সংবিধানের ৫৬(২) অনুচ্ছেদ প্রধানমন্ত্রীর হাতে এ ক্ষমতা দিয়েছে।
কতজন হতে পারেন? মন্ত্রিসভার মোট সদস্যের সর্বোচ্চ এক-দশমাংশ (১০ শতাংশ)।
তাদের যোগ্যতা কী? সংসদ সদস্য হওয়ার সব সাংবিধানিক যোগ্যতা থাকতে হবে।
তারা কি সংসদে ভোট দিতে পারেন? না। তারা বক্তব্য রাখতে পারেন, কিন্তু ভোট দিতে পারেন না।
বেতন-ভাতা ও সুবিধা? পূর্ণ মন্ত্রীর সমান বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা পান।
কার কাছে দায়বদ্ধ? সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর কাছে এবং সামগ্রিকভাবে মন্ত্রিসভার মাধ্যমে সংসদের কাছে।
বিদেশি নাগরিক কি হতে পারেন? না। সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্যতা না থাকলে মন্ত্রী হওয়া যায় না।
প্রতিমন্ত্রী বা উপমন্ত্রী পদেও কি নিয়োগ সম্ভব? হ্যাঁ, সম্ভব।
শপথ পাঠ করান কে? রাষ্ট্রপতি।
এ কোটা ব্যবহার বাধ্যতামূলক কি? না। এটি প্রধানমন্ত্রীর বিবেচনাধীন ক্ষমতা।
বাংলাদেশে নতুন মন্ত্রিসভায় টেকনোক্যাট মন্ত্রী যারা
৪৯ সদস্যের নতুন মন্ত্রিসভায় ২৫ জন পূর্ণ মন্ত্রী ও ২৪ জন প্রতিমন্ত্রী রাখা হয়েছে। এর মধ্যে টেকনোক্র্যাট কোটায় দুজন পূর্ণ মন্ত্রী ও একজন প্রতিমন্ত্রী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
টেকনোক্র্যাট কোটায় পূর্ণ মন্ত্রী হিসেবে রয়েছেন হাজী আমিনুর রশীদ ইয়াছিন ও ড. খলিলুর রহমান। প্রতিমন্ত্রী হিসেবে থাকছেন জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক অধিনায়ক আমিনুল হক।
হাজী আমিনুর রশীদ ইয়াছিন
হাজী আমিনুর রশীদ ইয়াছিন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য এবং কুমিল্লা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি কুমিল্লা–৬ (সদর) আসনে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিলেও দলীয় মনোনয়ন পান মনিরুল হক চৌধুরী। পরে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করার প্রস্তুতি নিলেও গত ১৯ জানুয়ারি তিনি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন।
১৯৯৬ সালের ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি কুমিল্লা-৯ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। ২০০৮ ও ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে কুমিল্লা-৬ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে অংশ নিয়ে পরাজিত হন।
ড. খলিলুর রহমান
ড. খলিলুর রহমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০২৪ সালের ১৯ নভেম্বর তিনি প্রধান উপদেষ্টার রোহিঙ্গা সমস্যা ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিষয়াবলি সংক্রান্ত হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ হিসেবে নিয়োগ পান। পরে তাকে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার দায়িত্ব দেওয়া হয়।
তিনি ১৯৭৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়–এর অর্থনীতি বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তরে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জন করেন। ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (পররাষ্ট্র) ক্যাডারে যোগ দেন।
যুক্তরাষ্ট্রের Tufts University ও Harvard University থেকে আইন ও কূটনীতিতে এমএ এবং অর্থনীতিতে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন তিনি।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দক্ষিণ এশিয়া বিভাগে এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে ১৯৮৩-৮৫ সময়কালে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৫ সালে নিউইয়র্কে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনে বদলি হন। ১৯৯১ সালে জেনেভায় জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সম্মেলনে (আঙ্কটাড) বিশেষ উপদেষ্টা হিসেবে জাতিসংঘ সচিবালয়ে যোগ দেন।
আরও পড়ুন : ২০২৬ সালে যে ৮ দক্ষতা আপনাকে সফলতা এনে দেবে
আমিনুল হক
জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক অধিনায়ক আমিনুল হক টেকনোক্র্যাট কোটায় প্রতিমন্ত্রী হচ্ছেন। তিনি ঢাকা-১৬ আসন থেকে জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেন। ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করে জামায়াত ইসলামের প্রার্থী কর্নেল (অব.) আব্দুল বাতেনের কাছে পরাজিত হন।
বাংলাদেশে কোনো সাবেক ক্রীড়াবিদ নির্বাচনে পরাজিত হয়ে বা টেকনোক্র্যাট কোটায় মন্ত্রী হওয়ার নজির খুব কম। স্বাধীনতার পর সাবেক তারকা ফুটবলার মেজর হাফিজ প্রথম মন্ত্রিত্ব পান। এরপর দীর্ঘদিন পর সাবেক জাতীয় ফুটবলার আরিফ খান জয় ক্রীড়া উপমন্ত্রী হন।
সে ধারাবাহিকতায় আমিনুল হক তৃতীয় সাবেক জাতীয় ফুটবলার হিসেবে মন্ত্রিসভায় যুক্ত হচ্ছেন বলে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা রয়েছে।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


