রাজশাহীর বিভিন্ন উপজেলায় তীব্র জ্বালানি তেল সংকটে অনেকটাই ভেঙে পড়েছে স্থানীয় সেচব্যবস্থা। এর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাবে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন রাজশাহী অঞ্চলের হাজারো কৃষক। তেলের অভাবে সেচযন্ত্র বন্ধ থাকায় পানির তৃষ্ণায় খাঁ খাঁ করছে ফসলের মাঠ, শুকিয়ে যাচ্ছে বোরো ধানসহ পটল, মরিচ ও পানের বরজ।

তেল

Advertisement

এক লিটার জ্বালানির আশায় কৃষকরা মাইলের পর মাইল ছুটছেন। কেউ আবার সেচ পাম্প কাঁধে নিয়েই হন্যে হয়ে ঘুরছেন এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রাম। এই নজিরবিহীন সংকটে ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, যা কৃষকদের মনে চরম দুশ্চিন্তা ও অনিশ্চয়তার সৃষ্টি করেছে।

বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) জেলার পবা উপজেলার বিমানবন্দর সড়কের হাবিব ফিলিং স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে তেলের অপেক্ষায় রয়েছেন মোহনপুর উপজেলার মৌগাছী ইউনিয়নের জাহানাবাদ গ্রামের কৃষক আব্দুল বারী। নিজের সেচযন্ত্রসহ নিয়ে হাজির হন পেট্রোল পাম্পে।

এই কৃষক জানান, তাদের আশপাশের এলাকার কোনো ডিপো ও ফিলিং স্টেশনে জ্বালানি তেল পাওয়া যাচ্ছে না। এ কারণে এলাকার অধিকাংশ কৃষকের সেচযন্ত্র বন্ধ। ফলে জমিতে সেচ দেওয়াও বন্ধ আছে। জমিতে শুকাচ্ছে বোরো খেত।

হাবিব ফিলিং স্টেশনে জ্বালানি নিতে আসা বাগধানীর কৃষক আতাউর রহমান জানান, জমিতে সেচ দেওয়া যাচ্ছে না। পটলের আবাদ, মরিচের আবাদ, বোরো ধান সব খেত খরতাপে শুকিয়ে মরে যাচ্ছে। এক সপ্তাহ ধরে পটলের গাছ মরে যাচ্ছে শুধু সেচের অভাবে।

তিনি আরও জানান, প্রতিদিন তেলের খোঁজে ঘুরে কৃষকদের সময়, শ্রম ও টাকা সবই নষ্ট হচ্ছে। নিজ এলাকায় তেল না পেয়ে তিনি সেচযন্ত্র মাথায় করে পাম্পে এসেছেন, শুধু ফসল বাঁচানোর আশায়।

মোহনপুরের বিদিরপুরের কৃষক কামাল হোসেন জানান, কৃষকেরা এলাকায় তেল পাচ্ছেন না। এই একটা পাম্পে জ্বালানি পাওয়া যাচ্ছে শুনে সেচযন্ত্র নিয়ে চলে এসেছেন। কিন্তু তেল কিনতে আসা যাওয়াতে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা খরচ হচ্ছে।

পবার বড়গাছি ইউনিয়নের কৃষক বাবলু হোসেন বলেন, ১৩ কিলোমিটার দূর থেকে আসছি তেল নিতে। এসে দেখি একেকজনকে মাত্র ৩০০ টাকার তেল দিচ্ছে। এই তেল দিয়ে আমাদের সেচযন্ত্র কতক্ষণ চলবে।

তিনি জানান, পাঁচ কাঠা জমিতে সেচ দিতে গেলেই ৩০০ টাকার তেল শেষ হয়ে যায়। এতে পান, পাটসহ বিভিন্ন ফসলের সেচ কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

একই ধরনের ভোগান্তির কথা জানান মোহনপুরের মৌগাছী ইউনিয়নের গোপালপুর গ্রামের কৃষক মোজাফফর মণ্ডল। তিনি বলেন, পানের বরজ, পেঁয়াজ, পটল ও পাটের আবাদে সেচ দিতে পেট্রোল জরুরি। কিন্তু ১৩ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে পাম্পে এসে তিনি পেয়েছেন মাত্র ৩০০ টাকার তেল।

কৃষক মোজাফফর আরও বলেন, এভাবে এই পরিমাণ তেল দিলে ফসল বাঁচানো কঠিন হবে।

কৃষক মহিদুর রহমান জানান, গম কাটার পর এখন পাট বপনের জন্য জমি তৈরির কাজ করছি। কিন্তু জমিতে পাটের বীজ বপন করেছি। এখন সেচ লাগবে। কিন্তু জ্বালানি পাচ্ছি না।

কৃষকদের অভিযোগ, জ্বালানির এই সংকট এখন শুধু ব্যক্তিগত ভোগান্তির বিষয় নয়। এটি কৃষি উৎপাদনের ওপরও সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। সময়মতো সেচ দিতে না পারলে চলতি মৌসুমে রাজশাহীতে কৃষি উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বেন কৃষকেরা।

এদিকে কৃষকেরা সেচযন্ত্রসহ জ্বালানি কিনতে আসছে জানিয়ে হাবিব ফিলিং স্টেশনের ব্যবস্থাপক রাকিব হোসেন বলেন, ডিপো থেকে পর্যাপ্ত তেল পাওয়া যাচ্ছে না। যে পরিমাণ তেল বরাদ্দ আসছে, তা প্রশাসনের প্রত্যায়নপত্র যাচাই করে কৃষকদের মধ্যে দেওয়া হচ্ছে। কেউ বেশি চাইলেও আমরা দিতে পারছি না। কারণ একজন কৃষককে একবারে তিনশ টাকার বেশি তেল দেওয়া বারণ আছে।

রাজশাহী পবা উপজেলা উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা ও ওই ফিলিং স্টেশনের ট্যাগ কর্মকর্তা সালাহ উদ্দিন আল মামুন জানান, কৃষিকাজের সুবিধার জন্য কৃষি কার্ড ও প্রত্যয়নপত্রের ভিত্তিতে তেল সরবরাহ করা হচ্ছে। প্রতিদিন চাহিদা অনুযায়ী কৃষকদের তেল দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা থেকে বলছি, যে পরিমাণ তেল কৃষকেরা পাচ্ছেন তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। এতে কৃষিকাজ ব্যাহত হচ্ছে। এক্ষেত্রে আমাদেরও কিছু করার নেই।

Zoom Bangla News
Zoom Bangla News
inews.zoombangla.com
Follow

Follow Zoom Bangla News On Google

Open the Google follow page and tap the checkmark option to receive more updates from Zoom Bangla News in your Google news feed.

Follow Zoom Bangla News On Google

Mynul Islam Nadim is a journalist at Zoom Bangla News, contributing to news writing and editorial support. He is involved in refining content to ensure accuracy, clarity, and consistency for digital platforms. His work reflects a commitment to responsible journalism and audience-focused reporting.