আন্তর্জাতিক ডেস্ক : জাতীয় উদ্যান বা ন্যাশনাল পার্কগুলো প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ একটি ভূমিকা রাখে। এদের মধ্যে কোনো কোনোটি আকারে সত্যি বিশাল। শুনে চমকে উঠবেন, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় জাতীয় উদ্যান নর্থইস্ট গ্রিনল্যান্ড ন্যাশনাল পার্ক আকারে পৃথিবীর বেশির ভাগ দেশের চেয়ে বড়।

Advertisement

নেপালের সাগরমাথা ন্যাশনাল পার্কের মধ্যে পড়েছে পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্টের (৮ হাজার ৮৪৯ মিটার) দক্ষিণের ঢাল। ভেনেজুয়েলার কানিমা জাতীয় উদ্যানের অংশ বিখ্যাত অ্যাঞ্জেল জলপ্রপাত। ৯৭৯ মিটারের (৩ হাজার ২১২ ফুট) অ্যাঞ্জেল পৃথিবীর উচ্চতম জলপ্রপাত। এদিকে ৪০০ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত, কম্বোডিয়ার আঙ্কর আর্কিওলজিকেল পার্কটি গড়ে তোলা হয়েছে ধর্মীয় স্মৃতিস্তম্ভ এবং প্রাচীন ধ্বংসপ্রাপ্ত নগর সংরক্ষণে। তবে জাতীয় উদ্যানের একটি বড় বিষয় হলো ওই যে বললাম, তাদের আকার।

ডেলাওয়ার থেকে বড় এবং ওয়েলসের প্রায় সমান আকারের ইয়েলোস্টোন জাতীয় উদ্যান ১৮৭২ সালে যখন পৃথিবীর প্রথম ন্যাশনাল পার্ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন এর আকার বিশাল বলেই বিবেচনা করা হয়। তবে বিশ শতকের গোড়ার দিকে এবং একুশ শতকের গোড়ার দিকে এত বিশাল আয়তনের নতুন নতুন জাতীয় উদ্যান গড়ে উঠতে থাকে যে পুরোনো ন্যাশনাল পার্কগুলোর আকার নিয়ে গর্বের আর ছিটেফোঁটাও থাকেনি। এদের কোনো কোনোটি ইয়েলোস্টোনের চেয়ে ৫০ গুণ বড়। এসব তথ্য উঠে এসেছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের এক প্রতিবেদনে।

নেপালের সাগরমাথা জাতীয় উদ্যান। ছবি: ন্যাশনাল-পার্কস ডট ওরগ

এবার বরং বিশ্বের বিভিন্ন মহাদেশের বড় ন্যাশনাল পার্ক বা জাতীয় উদ্যানগুলোর দিকে নজর দেওয়া যাক।

উত্তর আমেরিকা
বিশ্বের বৃহত্তম দ্বীপ গ্রিনল্যান্ডের প্রায় অর্ধেকজুড়ে বিস্তৃত নর্থইস্ট গ্রিনল্যান্ড ন্যাশনাল পার্ক বর্তমানে বিশ্বের একক বৃহত্তম জাতীয় উদ্যান এবং ডাঙ্গার সবচেয়ে বড় সংরক্ষিত এলাকা। এটার আকার কত তা শুনলে চমকে উঠবেন, ৯ লাখ ৭২ হাজার বর্গকিলোমিটার। এতে জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে ২৯টি বাদে বাকি সবগুলোই তার পেছনে পড়েছে।

পার্কের বেশির ভাগ এলাকাজুড়ে গ্রিনল্যান্ডের বরফরাজ্য। তবে এখানে একটি দীর্ঘ, রুক্ষ উপকূলরেখাও রয়েছে। যেখানে কস্তুরি ষাঁড়, মেরু ভালুক এবং আর্কটিক অঞ্চলের অন্যান্য প্রাণীর আবাসস্থল।

পূর্ব গ্রিনল্যান্ডে ট্যুরের ব্যবস্থা করা নানু ট্র্যাভেলের মেট পাইক বারসেলাজসেন বলেছেন, ‘গ্রীষ্মকালে নৌকায় করে, শীতকালে আমাদের স্থানীয় শিকারিদের সঙ্গে কুকুরে টানা স্লেজে চেপে সেখানে যেতে পারেন।’

চিরিবিকেতে জাতীয় উদ্যানের তেপুই এলাকা। ছবি: উইকিপিডিয়ার সৌজন্যে

দক্ষিণ আমেরিকা
দক্ষিণ আমেরিকার সবচেয়ে বড় উদ্যানগুলো গড়ে উঠেছে মহাদেশের সবচেয়ে কম জনবসতিপূর্ণ এলাকা আমাজন ও পাতাগোনিয়ায়। এ ক্ষেত্রে দক্ষিণ-পূর্ব কলম্বিয়ার চিরিবিকেতে জাতীয় উদ্যানের কথা বলতে হয়। আয়তন ৪৩ হাজার বর্গকিলোমিটার। আমাজন রেইন ফরেস্ট, তেপুই বা সমতল চূড়ার পর্বত এবং পাহাড়ি নদীগুলোর বড় একটি অংশকে রক্ষা করা পার্কটিকে দেখলে ‘জুরাসিক পার্কে’র মতো একটা কিছু মনে হতে পারে। ডাইনোসর না থাকলে বড় শিকারি প্রাণীর অভাব নেই জায়গাটিতে।

বিস্তৃত উদ্ভিদ এবং প্রাণীজগতের পাশাপাশি ৭৫ হাজারের বেশি প্রাচীন প্রস্তরচিত্র চোখে পড়বে জায়গাটিতে। কলম্বিয়া ওকাল্টা নামের ট্যুর কোম্পানিটি এখানকার সত্যিকারের ‘হারানো পৃথিবী’কে দেখার সুযোগ করে দেয় আকাশ থেকে।

মুংগা-থিররি-সিম্পসন ন্যাশনাল পার্কের যাত্রা শুরু ২০২১ সালে। ছবি: ন্যাশনাল পার্ক অ্যান্ড ওয়াইল্ডলাইফ সার্ভিস, সাউথ অস্ট্রেলিয়া

অস্ট্রেলিয়া
অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক সংরক্ষিত এলাকাটি খুব বেশি দিন হয়নি গড়ে উঠেছে। মুংগা-থিররি-সিম্পসন ন্যাশনাল পার্কের যাত্রা শুরু ২০২১ সালে। সাউথ অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে উত্তরের অনিন্দ্যসুন্দর মরু এলাকাকে রক্ষার জন্যই জায়গাটিকে ন্যাশনাল পার্ক হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

এই জায়গায় আছে পৃথিবীর বৃহত্তম বালিয়াড়ি এলাকা, অ্যাকাশিয়ার জঙ্গল, ঘেসো জমি, বছরের বিশেষ সময়ে তৈরি হওয়া হ্রদ ইত্যাদি। ১৫০ প্রজাতির বেশি পাখি, অস্ট্রেলীয় বুনো কুকুর ডিংগো, বুনো উট, গুইসাপের মতো দেখতে পেরেনটাইসহ বিভিন্ন জাতের বন্যপ্রাণীর দেখাও মেলে জায়গাটিতে।

পর্যটকদের জন্য সে রকম কোনো সুবিধা নেই এখানে। সিম্পসন মরুভূমিতে প্রবেশ করতে চাইলে মরুভূমিতে টিকে থাকার তরিকা জানাটা জরুরি। আউটব্যাক স্পিরিট অ্যাডভেঞ্চারস মার্সিডিজ বেঞ্জ জি ওয়াগনে ১৪ দিনের একটি ট্যুরের ব্যবস্থা করে। প্রচণ্ড তাপের কারণে গ্রীষ্মকালে পার্কটি দর্শনার্থীদের জন্য বন্ধ থাকে।

পশ্চিম নামিবিয়ার নামিব-নওকলাফত ন্যাশনাল পার্কে বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর বিচরণ চোখে পড়ে। ছবি: ন্যাশনাল-পার্কস ডট ওরগ

এশিয়া
আকারে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মহাদেশ হলেও পৃথিবীর সবচেয়ে বড় জাতীয় উদ্যানের দৌড়ে এশিয়া কিছুটা পিছিয়ে। ২০২১ সালে প্রতিষ্ঠিত চীনের সানিয়াগুয়ান ন্যাশনাল পার্কটি এই মুহূর্তে আকারে মহাদেশের সবচেয়ে বড় জাতীয় উদ্যান। এর আয়তন ১ লাখ ২৩ হাজার ১০০ বর্গকিলোমিটার। তিব্বতের মালভূমির একটি বড় অংশ পড়েছে এর সীমানায়। এখানকার দুর্গম ও দুরারোহ পার্বত্য এলাকায় অনেক বিপন্ন প্রাণীরই বসবাস। এদের মধ্যে আছে তুষার চিতা, হিমালয়ান নেকড়ে, বুনো চামরী গাই, কস্তুরি মৃগ প্রভৃতি। এর সীমানায় সাংস্কৃতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন জায়গাও আছে।

এলিভেটেড ট্রিপস নামে একটি ট্যুর অপারেটিং সংস্থা চিংহাই প্রদেশের ভেতর দিয়ে ভ্রমণের ব্যবস্থা করে। এরই অন্তর্ভুক্ত সানিয়াগুয়ান ন্যাশনাল পার্কে ভ্রমণ।

ইউরোপ
যেহেতু মহাদেশটি আকারে অন্যান্য মহাদেশের চেয়ে ছোট, এখানকার বড় জাতীয় উদ্যানগুলোও পৃথিবীর বড় ন্যাশনাল পার্কগুলোর বিবেচনায় পুঁচকে। তার মানে এই নয় যে এরা আসলেই ছোট।

এখনকার পার্কগুলোর মধ্যে আয়তনে সবচেয়ে বড় আইসল্যান্ডের ভাতনালুকো ন্যাশনাল পার্ক (১৪ হাজার ১৪১ বর্গ কিলোমিটার)। আগ্নেয়গিরি, উষ্ণ প্রস্রবণ, সামুদ্রিক খাঁড়ি কিংবা হিমবাহ যাঁরা পছন্দ করেন তাঁদের প্রায় গন্তব্য এটি। চাইলে নিজে থেকেই এখানে ঘুরে আসতে পারবেন। ক্যাম্পিং, হাইকিং কিংবা পাখি দেখা—যে উদ্দেশ্যেই যান না কেন সমস্যা নেই।

আফ্রিকা
পশ্চিম নামিবিয়ার নামিব-নওকলাফত ন্যাশনাল পার্কের বড় আকর্ষণ এখানকার বিশাল সব বালিয়াড়ি। জাতীয় উদ্যান এলাকার আয়তন ৪৯ হাজার ৭৬৮ বর্গকিলোমিটার। এখানকার বালিয়াড়িগুলোর কোনো কোনোটি ২০০ মিটারের (৬৫৬ ফুট) বেশি উঁচু।

আপনার নিজের গাড়ির সাহায্যে সহজেই ঘুরে আসা যায় উদ্যানটি থেকে। পার্কের প্রধান রাস্তা ধরে গেলে সসেস ভ্লেই এবং ডেড ভ্লেইয়ের দেখা পাবেন। হট এয়ার বেলুনে চেপে বসলে মরুভূমির অসাধারণ ভূপ্রকৃতি পাখির চোখে দেখার সুযোগ মিলবে।

বালিয়াড়ি ছাড়াও মরুভূমির গিরিখাত, উপকূলে পুরোনো দিনের বিধ্বস্ত জাহাজের দেখা পাবেন। তেমনি পৃথিবীর সবচেয়ে শুষ্ক স্থানগুলোর একটিতে অভিযোজিত হওয়া বিভিন্ন উদ্ভিদ ও প্রাণী দেখার সুযোগ মিলবে।

জাতীয় উদ্যান না হলেও আফ্রিকার সবচেয়ে বড় সংরক্ষিত এলাকা হলো কাভাংগো-জাম্বেসি ট্রান্সফ্রন্টিয়ার কনজারভেশন এরিয়া। জাম্বিয়া, জিম্বাবুয়ে, মোজাম্বিক, অ্যাঙ্গোলা ও নামিবিয়ার ৫ লাখ ২০ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়ে ২০১২ সালে গড়ে ওঠে সংরক্ষিত এলাকাটি।

অ্যান্টার্কটিকা
গ্রহের নিচের প্রান্তটিতে এখনো কোনো জাতীয় উদ্যান নেই। তবে অ্যান্টার্কটিকার একমাত্র প্রাতিষ্ঠানিক সংরক্ষিত এলাকা হলো রস সি মেরিন প্রটেকটেড এরিয়া। ২০১৬ সালে প্রতিষ্ঠিত সংরক্ষিত এলাকাটির আয়তন ১৫ লাখ ৫০ হাজার বর্গকিলোমিটার। পেঙ্গুইন, তিমি, সিলসহ বিভিন্ন ধরনের সামুদ্রিক পাখি ও মেরু এলাকার নানান প্রাণীর বাস এখানে।

তবে ভবিষ্যতে কোনো এক সময়ে সমগ্র মহাদেশ অ্যান্টার্কটিকা ওয়ার্ল্ড পার্কে পরিণত হতে পারে। সে ক্ষেত্রে ১ কোটি ৪২ লাখ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের পার্কটি হবে বিশ্বের অন্য যেকোনো রিজার্ভের চেয়ে প্রায় ১০ গুণ বড়।

Zoom Bangla News
Zoom Bangla News
inews.zoombangla.com
Follow

Follow Zoom Bangla News On Google

Open the Google follow page and tap the checkmark option to receive more updates from Zoom Bangla News in your Google news feed.

Follow Zoom Bangla News On Google

Saiful Islam is a journalist at Zoom Bangla News with seven years of experience in news writing and editorial work. He contributes to producing accurate, well-structured, and reader-focused content across digital platforms. His work reflects a strong commitment to editorial standards and responsible journalism.