প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, কেউই চিরকাল বেঁচে থাকে না। কিন্তু নতুন প্রজন্মের জন্য মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও অনুপ্রেরণা চিরজাগরুক রাখা জরুরি। তরুণদের জানতে হবে—এই দেশ কোথা থেকে এসেছে, কীভাবে স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে। যুদ্ধ শুধু অতীতের ঘটনা নয়; সামনে আরও নানা রকম লড়াই আসতে পারে। তাই মহান মুক্তিযুদ্ধ যেন প্রজন্মের পর প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার বাতিঘর হয়ে থাকে।

প্রধান উপদেষ্টা

Advertisement

রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল, বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট এবং বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সদস্যদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এসব কথা বলেন প্রধান উপদেষ্টা।

বৈঠকে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফারুক ই আজম উপস্থিত ছিলেন। জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন মেজর জেনারেল (অব.) আজিজুর রহমান, বীর উত্তম; ক্যাপ্টেন (অব.) নুরুল হুদা; মেজর (অব.) সৈয়দ মুনিবুর রহমান; মেজর (অব.) কাইয়ুম খান; সাদেক আহমেদ খান; হাবিবুল আলম, বীর প্রতীক এবং মেজর (অব.) ফজলুর রহমান, বীর প্রতীক।

এছাড়া বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের নির্বাহী কমিটির সদস্যদের মধ্যে ছিলেন মেজর জেনারেল (অব.) জামিল ডি আহসান, বীর প্রতীক; মেজর (অব.) সৈয়দ মিজানুর রহমান, পিএসসি; মেজর (অব.) এ কে এম হাফিজুর রহমান ও মনোয়ারুল ইসলাম। বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের আহ্বায়ক নঈম জাহাঙ্গীরসহ সদস্য সৈয়দ আবুল বাশার, সিরাজুল হক, মো. মনসুর আলী সরকার, অনিল বরণ রায়, নুরুল ইসলাম, আব্দুল্লাহ হিল সাফী, জাহাঙ্গীর কবির এবং প্রকৌশলী জাকারিয়া আহমেদ বৈঠকে অংশ নেন।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের চিহ্নিত করা এবং ভুয়াদের শনাক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। তিনি বলেন, বাংলাদেশের মানুষ মুক্তিযোদ্ধাদের অন্তর থেকে সম্মান করে। সেই শ্রদ্ধাকে পুঁজি করে অতীতে অনেকে ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করেছে। ভবিষ্যতে যেন এমন আর না ঘটে, সে জন্য কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। রাজনৈতিক স্বার্থে এসব প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করে একসময় খেলনার মতো করে ফেলা হয়েছিল। সেই অবস্থা থেকে বের করে আবার প্রতিষ্ঠান হিসেবে দাঁড় করানোই ছিল সরকারের লক্ষ্য।

বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পেরে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তিনি বলেন, ইতিহাস সংরক্ষণ করা এবং নতুন প্রজন্মকে সেই ইতিহাসের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া একটি পবিত্র দায়িত্ব। খুব শিগগিরই এমন সময় আসবে, যখন জীবিত মুক্তিযোদ্ধা খুঁজে পাওয়া যাবে না। কিন্তু তাঁদের স্মৃতি ও অবদান আমাদের ধরে রাখতে হবে। এজন্য এখন থেকেই সুপরিকল্পিত উদ্যোগ নেওয়া দরকার, যাতে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি জাতির চেতনাজুড়ে অবিনশ্বর হয়ে থাকে।

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক উপদেষ্টা ফারুক ই আজম বলেন, আগের সরকার মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলে সমাজে বিভাজন সৃষ্টি করেছে এবং প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের বঞ্চিত করেছে। এতে অনেক মুক্তিযোদ্ধা মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে সবাই মিলে এই জঞ্জাল পরিষ্কারের চেষ্টা করছে এবং মুক্তিযোদ্ধাদের হারানো সম্মান ফিরিয়ে আনতে কাজ করছে।

বৈঠকে বীর মুক্তিযোদ্ধারা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান হিসেবে প্রফেসর ইউনূসের দায়িত্ব পালনের প্রশংসা করেন। সংস্কার বাস্তবায়ন ও গণভোট আয়োজনের উদ্যোগের জন্য তাঁকে ধন্যবাদ জানান তারা। তাঁদের মতে, জুলাই সনদ বাস্তবায়িত হলে ফ্যাসিবাদ ফিরে আসার পথ বন্ধ হবে এবং সরকার জনগণের কাছে আরও জবাবদিহিমূলক হবে। স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় জুলাই সনদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলেও তারা মত দেন।

তারা আরও বলেন, গণভোটে ‘না’ জয়ী হলে তা দেশের জন্য দুর্ভাগ্যজনক হবে। ব্যক্তিগত পর্যায়ে গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে প্রচারণায় অংশ নেওয়ার কথাও জানান কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা।

জবাবে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, দেশ এখন নির্বাচনের একেবারে দ্বারপ্রান্তে। গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সংবিধান সংস্কারের যে সুযোগ তৈরি হয়েছে, তা কাজে লাগানো জরুরি। সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে ঐকমত্য কমিশনের মাধ্যমে কাজ এগিয়েছে। এখন সেই সংস্কার বাস্তবায়নের জন্য গণভোট আয়োজন করা হচ্ছে। তিনি বলেন, পরিবর্তন ও সংস্কার ছাড়া আমরা বারবার একই জায়গায় ঘুরপাক খাবো—বের হওয়ার পথ থাকবে না।

বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের আহ্বায়ক নঈম জাহাঙ্গীর বলেন, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ও দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় যে বলয় তৈরি করা হয়েছে, তার জন্য প্রধান উপদেষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য ছিল স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জন। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধকে ঘিরে অপ-রাজনীতির কারণে মুক্তিযোদ্ধাদের সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়েছে।

বৈঠকে মুক্তিযোদ্ধারা আক্ষেপ করে বলেন, গত ১৬ বছরে তাঁদের সম্মান এতটাই ক্ষুণ্ন হয়েছে যে অনেক সময় নিজেদের পরিচয় দিতে সংকোচ বোধ করতে হতো। মানুষ প্রশ্ন করত—“আসল না নকল?”

ক্যাপ্টেন (অব.) নুরুল হুদা বলেন, দীর্ঘ ৫৭ বছরে যে বাকস্বাধীনতা পাওয়া যায়নি, বর্তমান সরকার তা ফিরিয়ে দিয়েছে। এখন সবাই মুক্তভাবে কথা বলার সুযোগ পাচ্ছে। তিনি বলেন, মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা পরিবর্তনের যে সুপারিশ তারা করেছিলেন, তা বাস্তবায়নের জন্য প্রধান উপদেষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হলেও বর্তমান সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে ভুল বোঝাবুঝি দূর করার আন্তরিক চেষ্টা করছে।

তিনি আরও বলেন, যে বয়সে তাঁরা যুদ্ধ করেছিলেন, সেই বয়সের তরুণরাই জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দিয়েছে। তারা বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়েছে এবং পুরোনো ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করেছে। এ তরুণরাই মুক্তিযোদ্ধাদের উত্তরসূরি। একাত্তর ও চব্বিশকে মুখোমুখি দাঁড় করানোর অপচেষ্টা রুখে দিতে হবে।

বৈঠকে তিন সংগঠনের নেতারা তাঁদের চলমান কার্যক্রম ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরেন। তারা জানান, মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়াই তাদের প্রধান লক্ষ্য। মুক্তিযুদ্ধ ছিল শুধু সশস্ত্র সংগ্রাম নয়, এটি ছিল একটি জনযুদ্ধ। দেশজুড়ে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিসৌধ সংরক্ষণ ও নির্মাণের কাজ চলছে। ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের গেজেট বাতিল করা হয়েছে এবং কল্যাণ ট্রাস্টের সম্পদ যাচাই-বাছাই করে সেগুলোর সর্বোত্তম ব্যবহারের পরিকল্পনা করা হচ্ছে, যাতে ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের জন্য একটি সুস্পষ্ট কর্মপন্থা রেখে যাওয়া যায়।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, সবাইকে শক্ত অবস্থানে থাকতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে না পারে। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণে সংগঠনগুলোর সম্পদ যথাযথভাবে ব্যবহার করতে হবে, যাতে মানুষ শ্রদ্ধা ও স্মরণ করতে পারে। দেশের স্থায়ী কল্যাণে এসব সম্পদ কাজে লাগাতে হবে। তিনি বলেন, সরকারিভাবে কাজ চলবে, তবে নাগরিক হিসেবেও দায়িত্ব পালন অব্যাহত রাখতে হবে। কয়েকদিন পর তিনি আর সরকারে থাকবেন না উল্লেখ করে বলেন, এটি কখনোই তাঁর স্থায়ী জায়গা ছিল না। ঘটনাচক্রে তিনি যুক্ত হয়েছেন, তবে নাগরিক হিসেবে নিজের দায়িত্ব পালন করে যাবেন।

Zoom Bangla News
Zoom Bangla News
inews.zoombangla.com
Follow

Follow Zoom Bangla News On Google

Open the Google follow page and tap the checkmark option to receive more updates from Zoom Bangla News in your Google news feed.

Follow Zoom Bangla News On Google

Mynul Islam Nadim is a journalist at Zoom Bangla News, contributing to news writing and editorial support. He is involved in refining content to ensure accuracy, clarity, and consistency for digital platforms. His work reflects a commitment to responsible journalism and audience-focused reporting.