যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানিতে ১০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। এমন প্রস্তাবের পেছনে পণ্য উৎপাদনে ‘ফোর্সড লেবার’ বা জোরপূর্বক শ্রম ব্যবহারকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

রপ্তানি খাত

Advertisement

তবে রপ্তানিকারকরা এ সিদ্ধান্তকে ‘অপ্রত্যাশিত ও অগ্রহণযোগ্য’ বলে অভিহিত করছেন। একই সঙ্গে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলছেন, ট্রাম্প প্রশাসনের এ ধরনের প্রস্তাব দেশের প্রধান রপ্তানি খাতের ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তাদের দাবি—বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী শিল্পে কোনো ফোর্সড লেবার নেই।

জোরপূর্বক শ্রম (ফোর্সড লেবার) ইস্যুতে মঙ্গলবার (২ জুন) বাংলাদেশসহ অন্তত ৬০টি দেশের পণ্যের ওপর অতিরিক্ত ১০ থেকে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের প্রস্তাব দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের এ প্রস্তাব অনুযায়ী, বাংলাদেশের পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক বসানো হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি দপ্তর (ইউএসটিআর) এ–সংক্রান্ত প্রস্তাব প্রকাশ করেছে।

যা বলছে ইউএসটিআর
ইউএসটিআরের ভাষ্য, তালিকাভুক্ত ৬০টি দেশই জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের আমদানি রোধে বা এর ওপর নিষেধাজ্ঞা কার্যকরে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যের জন্য অযৌক্তিক বাধা তৈরি হচ্ছে এবং মার্কিন শ্রমিকদের জন্য অসম প্রতিযোগিতার পরিবেশ সৃষ্টি হচ্ছে। এ কারণেই নতুন শুল্ক আরোপের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

অতিরিক্ত শুল্কারোপ বিষয়ে ইউএসটিআর বলছে, যেসব দেশ জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের বাণিজ্যে পূর্ণ বা আংশিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে, তাদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে। অন্যদিকে, যেসব দেশ এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন করেনি, তাদের জন্য শুল্কের হার হবে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ।

বাংলাদেশে ফোর্সড লেবারের কোনো গ্রহণযোগ্য ভিত্তি নেই। এ ধরনের ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলে আমাদের ওপর বাড়তি শুল্ক চাপিয়ে দেওয়া ন্যায্য নয়। আমরা এর তীব্র প্রতিবাদ জানাই।—মোহাম্মদ হাতেম

তবে নতুন এ পদক্ষেপ কার্যকর হলে চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও জাপানসহ যুক্তরাষ্ট্রের অধিকাংশ বাণিজ্য অংশীদারই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যদিও সব দেশকে একই হারে শুল্ক দিতে হবে না।

ভিত্তিহীন অভিযোগে অন্যায্য পদক্ষেপ
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন করে প্রস্তাবিত ১০ শতাংশ শুল্ক প্রসঙ্গে বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জাগো নিউজকে বলেন, ‘ট্রাম্প প্রশাসনের সময় আবারও যে ট্যারিফ বা শুল্ক আরোপের বিষয়টি সামনে আনা হচ্ছে এবং যেটি এখন ইউএসডিআরের পক্ষ থেকে ১০ শতাংশ হিসেবে দেখানো হচ্ছে—তা আসলে কীভাবে দাঁড়াবে, সেটিই এখন প্রশ্ন।’

তার মূল্যায়ন, ‘ফোর্সড লেবার বা বাধ্যতামূলক শ্রমের যে অভিযোগ তুলে অতিরিক্ত এই শুল্ক আরোপের চেষ্টা করা হচ্ছে, আমরা তা কোনোভাবেই গ্রহণ করতে পারি না। বাংলাদেশে ফোর্সড লেবারের কোনো গ্রহণযোগ্য ভিত্তি নেই। এ ধরনের ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলে আমাদের ওপর বাড়তি শুল্ক চাপিয়ে দেওয়া ন্যায্য নয়। আমরা এর তীব্র প্রতিবাদ জানাই।’

মোহাম্মদ হাতেম যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘আমরা বিনীতভাবে অনুরোধ করবো, যুক্তরাষ্ট্র বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করুক এবং বাস্তব পরিস্থিতি যাচাই করুক।’

মার্কিন প্রশাসনের এ ধরনের পদক্ষেপ নিয়ে সরকার সঙ্গে কোনো যোগাযোগ হয়েছে কি না, সে সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘সরকারের সঙ্গে (যুক্তরাষ্ট্রের) এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। তবে এ ধরনের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকারের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ ও আলোচনা থাকা জরুরি।’

‘আমরা জোরপূর্বক শ্রম (ফোর্সড লেবার) ইস্যুতে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করবো এবং কঠোর অবস্থান নেবো’—যোগ করেন এ ব্যবসায়ী নেতা।

রপ্তানিতে প্রভাব ও করণীয়

‘যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্কনীতি—যেখানে ‘ফোর্সড লেবার’ ইস্যুতে বাংলাদেশসহ ৬০টি দেশের ওপর অতিরিক্ত ১০ থেকে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে—এটি বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের ওপর নতুন চাপ তৈরির পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারে। এর ফলে বিদ্যমান শুল্ক কাঠামোর সঙ্গে যোগ হয়ে কার্যকর মোট শুল্ক হার আরও বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে’—এমন মন্তব্য করেছেন বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মাসরুর রিয়াজ।

এটি শুধু বাণিজ্যিক ইস্যু নয়, বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ও বাণিজ্য আলোচনার বিষয়ও বটে। বাংলাদেশের জন্য এখন প্রয়োজন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সক্রিয় কূটনৈতিক সম্পৃক্ততা এবং বাণিজ্য আলোচনায় শক্ত অবস্থান নেওয়া।—মাসরুর রিয়াজ

তিনি বলছেন, (ট্রাম্প প্রশাসনের) এ সিদ্ধান্তের প্রকৃত প্রভাব নির্ভর করবে কোন কোন প্রতিযোগী দেশ একই ধরনের শুল্কের আওতায় পড়ছে তার ওপর। যদি বাংলাদেশের প্রধান প্রতিযোগী দেশগুলো—যেমন ভিয়েতনাম বা ভারত—সমান বা কাছাকাছি হারে শুল্কের মুখোমুখি হয়, তাহলে তুলনামূলক প্রতিযোগিতার বড় ধরনের ক্ষতি না-ও হতে পারে। কিন্তু যদি তাদের ওপর তুলনামূলক কম শুল্ক আরোপ করা হয়, তাহলে বাংলাদেশের জন্য বাজার হারানোর ঝুঁকি তৈরি হবে।

‘এটি শুধু বাণিজ্যিক ইস্যু নয়, বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ও বাণিজ্য আলোচনার বিষয়ও বটে। বাংলাদেশের জন্য এখন প্রয়োজন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সক্রিয় কূটনৈতিক সম্পৃক্ততা এবং বাণিজ্য আলোচনায় শক্ত অবস্থান নেওয়া। যেন বিদ্যমান বিনিয়োগ ও বাণিজ্য চুক্তিগুলোর প্রভাব কাজে লাগিয়ে শুল্ক সুবিধা বা ছাড় নিশ্চিত করা যায়।’

মাসরুর রিয়াজ মনে করছেন, সার্বিকভাবে বিষয়টি বাংলাদেশকে নতুন করে প্রতিযোগিতামূলক চাপ এবং নীতি ও কৌশলগত সিদ্ধান্তের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।

কোন দেশের ওপর কত শুল্ক
ইউএসটিআরের প্রস্তাব অনুযায়ী, বাংলাদেশ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কানাডা, মেক্সিকো, তাইওয়ান, যুক্তরাজ্য, পাকিস্তান, মালয়েশিয়া, কম্বোডিয়া, আর্জেন্টিনা, ইকুয়েডর, এল সালভাদর ও গুয়াতেমালাসহ ১৫টির মতো দেশের পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে।

অন্যদিকে, ভারত, চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ব্রাজিল ও সুইজারল্যান্ডসহ আরও অন্তত ৪৫টি দেশের পণ্যের ওপর ১২ দশমিক ৫ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

এ প্রস্তাব কার্যকর হলে স্বাভাবিকভাবেই ভারতের রপ্তানি পণ্যের ওপর বাংলাদেশের তুলনায় বেশি শুল্ক আরোপ হবে।

আরও পড়ুন : ২০২৬ সালে যে ৮ দক্ষতা আপনাকে সফলতা এনে দেবে

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যচুক্তি স্বাক্ষরিত হয় চলতি বছরের ৯ ফেব্রুয়ারি। সেই চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যে যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্কের হার নির্ধারণ করা হয় ১৯ শতাংশ। এখন নতুন করে ১০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক যোগ হলে মোট শুল্কহার দাঁড়াবে ২৯ শতাংশে। এতে দেশের রপ্তানিমুখী শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতার দিক থেকে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

Zoom Bangla News
Zoom Bangla News
inews.zoombangla.com
Follow

Follow Zoom Bangla News On Google

Open the Google follow page and tap the checkmark option to receive more updates from Zoom Bangla News in your Google news feed.

Follow Zoom Bangla News On Google

Shamim Reza is an experienced journalist and sub-editor at Zoom Bangla News, with over 13 years of professional experience in the field of journalism. Known for his strong writing skills and editorial insight, he contributes to producing accurate, engaging, and well-structured news content. Born and brought up in Jashore, his background and experience shape his deep understanding of social and regional perspectives in news reporting.