‘কারো পৌষ মাস, কারো সর্বনাশ’—এমন একটা কথা প্রচলিত আছে। ফুটবলের মহাযজ্ঞ বিশ্বকাপেও এর ব্যতিক্রম হয় না।

Messi

Advertisement

চোটের করাল গ্রাসে কারও স্বপ্নের সমাধি ঘটে টুর্নামেন্ট শুরুর ঠিক আগমুহূর্তে, আবার সেই শূন্যতা পূরণ করতেই কারো ভাগ্যের চাকা ঘুরে যায়।

বিশ্বকাপের চূড়ান্ত দলে নাম না থাকা কিছু খেলোয়াড়ের জন্য সতীর্থের দুর্ভাগ্যই যেন আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। অনেকে তো নাটকীয়ভাবে দলে ঢুকে উঁচিয়ে ধরেছেন পরম আরাধ্য সেই সোনালি ট্রফি।

সম্প্রতি ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা এমন কিছু ‘ভাগ্যবান’ ফুটবলারের গল্প সামনে এনেছে, যারা শেষ মুহূর্তে দলে এসে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন।

ইনজুরির থাবায় ট্রেন্ট আলেকজান্ডার-আর্নল্ড, এদুয়ার্দো কামাভিঙ্গা, ফিল ফোডেন, ডিন হুইসেন কিংবা কোল পামারদের মতো তারকাদের মনে বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন হয়তো ফিকে হয়ে গেছে। কিন্তু ফুটবল ইতিহাস বলে, এখনো বাস্তবে সে সম্ভাবনা পুরোপুরি শেষ হয়নি। একজনের স্বপ্নভঙ্গ মানেই অন্য কারও জন্য নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে যাওয়া। অতীতে এমন অদলবদলের গল্প বহুবার রূপ নিয়েছে রূপকথায়।

১৯৯৪: আলদাইর-রোনালদাওর ‘আমেরিকান ড্রিম’

যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপের আগে ব্রাজিলের রক্ষণের সেরা দুই ভরসা আলদাইর ও মার্সিও সান্তোস ছিলেন কোচ কার্লোস আলবার্তো পেরেইরার পছন্দের তালিকার বেশ পেছনে।

রাশিয়ার বিপক্ষে প্রথম ম্যাচের মাত্র ছয় সপ্তাহ আগে ঘোষিত দলে আলদাইরের নামই ছিল না। কোচ ভরসা রেখেছিলেন কার্লোস মোজেরের ওপর। কিন্তু বিধি বাম! রহস্যময় ও বিতর্কিত এক সিদ্ধান্তে ব্রাজিল দলের চিকিৎসকরা মোজেরকে আনফিট ঘোষণা করলে কপাল খোলে আলদাইরের।

নাটকের এখানেই শেষ নয়।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মাত্র তিন দিন আগে ঊরুর চোটে ছিটকে যান অবধারিতভাবে শুরুর একাদশে থাকা রিকার্দো গোমেস। অফ-সিজন চলায় তখন অনেক ফুটবলারই ছিলেন খেলার বাইরে। বাধ্য হয়ে ব্রাজিল কোচ জাপান থেকে উড়িয়ে আনেন ২৮ বছর বয়সী ডিফেন্ডার রোনালদাওকে।
টুর্নামেন্টের প্রথম ম্যাচেই রাশিয়ার বিপক্ষে চোট পেয়ে মাঠ ছাড়েন রিকার্দো রোচা। মাঠে নামেন আলদাইর। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। টুর্নামেন্টের প্রতিটি মিনিট মাঠে থেকে ব্রাজিলের চতুর্থ বিশ্বকাপ জয়ে প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি।

সেই রোমাঞ্চকর দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করে আলদাইর বলেন, ‘আমি তো সব আশাই ছেড়ে দিয়েছিলাম। মোজেরের জায়গায় আমি ডাক পেয়েছি—এক সাংবাদিক ফোন করে এটা জানানোর পর আমি বিশ্বাসই করিনি, ফোন কেটে দিয়েছিলাম! এরপর সুযোগ পাওয়া, খেলা এবং বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়া… সত্যি বলতে, এটা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। শুরুর মূল দলে থাকার চেয়েও এটা অনেক বেশি মধুর ছিল।’

অন্যদিকে, পুরো টুর্নামেন্টে এক মিনিটও মাঠে না নেমে মেডেল গলায় ঝুলিয়েছিলেন রোনালদাও। পরে রসিকতা করে বলেছিলেন, ‘যাক, অবশেষে ১৭ বছর বয়সী রুম-মেট রোনালদোর (ফেনোমেনন) নাক ডাকার শব্দ থেকে মুক্তি পাওয়া গেল!’

২০০২: চার্চে থাকা রিকার্দিনিয়োর ‘মিরাকল’

২০০২ বিশ্বকাপ শুরুর ঠিক আগের দিন। অনুশীলনে রিভালদোর শট ঠেকাতে গিয়ে কাঁধের হাড় নড়ে যায় ব্রাজিল অধিনায়ক এমারসনের। দল যখন চরম সংকটে, তখন ১৯ হাজার কিলোমিটার দূরে ব্রাজিলের কুরিচিবায় মনের সুখে ছুটি কাটাচ্ছিলেন রিকার্দিনিয়ো।

কোচ লুইস ফেলিপে স্কলারির দলে কখনোই সুযোগ না পাওয়া রিকার্দিনিয়ো ভেবেছিলেন তার ডাক পাওয়ার সম্ভাবনা শূন্য। তাই ফোন বন্ধ করে চলে যান চার্চে প্রার্থনা করতে। কিন্তু তার স্ত্রী জুলিয়ানা ‘মিরাকলে’ বিশ্বাস করতেন বলেই ফোনটি অন রাখেন। সিবিএফ প্রধান আমেরিকো ফারিয়া ফোন করলে জুলিয়ানা জানান, চার্চ থেকে ফিরেই রিকার্দিনিয়ো রওনা হবেন।

পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ থাকায় দ্রুত জাপানে ব্রাজিলিয়ান দূতাবাসের বিশেষ অনুমতিতে তা নবায়ন করা হয়। সাও পাওলো থেকে যুক্তরাষ্ট্র হয়ে কোরিয়ায় পৌঁছান তিনি। বিশ্বকাপের তিনটি ম্যাচে বদলি হিসেবে মাঠেও নামেন রিকার্দিনিয়ো। আর এমারসনের অনুপস্থিতিতে অধিনায়কের আর্মব্যান্ড পরে ব্রাজিলের পঞ্চম বিশ্বকাপ উঁচিয়ে ধরেন কাফু।

২০১৪: রিউসের ট্র্যাজেডি, মুস্তাফির ম্যাজিক

জার্মান ডিফেন্ডার স্কোদান মুস্তাফির জন্য ২০১৪ সালের জুন মাসটা ছিল এক চরম রোলারকোস্টার রাইড। জাতীয় দলের হয়ে কোনো ম্যাচ না খেলেই ইওয়াখিম লভের ২৭ সদস্যের প্রাথমিক দলে ডাক পান সাম্পদোরিয়ার এই ডিফেন্ডার। কিন্তু ২ জুন ঘোষিত চূড়ান্ত ২৩ সদস্যের দল থেকে বাদ পড়েন তিনি।

এর ঠিক পাঁচ দিন পর জার্মানির প্রাণভোমরা মার্কো রিউস মারাত্মক চোটে পড়ে বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে যান। দলে স্ট্রাইকারের অভাব থাকা সত্ত্বেও সবাইকে চমকে দিয়ে ডিফেন্ডার মুস্তাফিকে দলে টানেন লভ। ব্রাজিলের মাটিতে জার্মানির বিশ্বজয়ের অভিযানে ৩টি ম্যাচ খেলেন মুস্তাফি।

মারাকানায় ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে যখন জার্মানি উদযাপনে মত্ত, তখন মুস্তাফির গায়ে ছিল সতীর্থের প্রতি ভালোবাসার এক অনন্য নিদর্শন—পিঠে ‘রিউস ২১’ লেখা একটি জার্সি জড়িয়ে ট্রফি উদযাপন করেছিলেন তিনি।

২০২২: লটারিতে বিশ্বকাপ জয় আলমাদা-করেয়ার

কাতার বিশ্বকাপের মাত্র দিনকয়েক আগে লিওনেল স্কালোনি যখন ২৬ সদস্যের চূড়ান্ত দল ঘোষণা করেন, তাতে জায়গা হয়নি ফাকুন্দো মেদিনা ও আনহেল করেয়ার। কিন্তু নাটকীয়তা তখনো বাকি ছিল।

১৭ নভেম্বর পেশির চোটে ছিটকে যান নিকো গঞ্জালেস। তার জায়গায় ডাক পান অ্যাতলেতিকো মাদ্রিদ উইঙ্গার করেয়া। এর ঠিক পরের দিনই চোট পান হোয়াকিন করেয়া। এবার স্কালোনি এমন একজনকে ডাকলেন, যিনি প্রাথমিক দলেও ছিলেন না—আটলান্টা ইউনাইটেডের প্লেমেকার থিয়াগো আলমাদা!

সেই অবিশ্বাস্য মুহূর্তের কথা মনে করে আলমাদা বলেন, ‘খবরটা শুনে আমি কেঁদে ফেলেছিলাম। পরিবারকে জানানোর পর ওরাও কাঁদছিল। বাবা দিবসের উপহার হিসেবে বাবাকে বিশ্বকাপের টিকিট দিয়েছিলাম, আর ভাগ্যের লিখনে আমি নিজেই সেখানে খেলোয়াড় হিসেবে যাচ্ছিলাম! কাঁদার জন্য বেশি সময়ও ছিল না, কারণ ওই রাতেই আমাকে কাতারগামী বিমানে চড়তে হয়েছিল।’

করেয়া ও আলমাদা দুজনেই কাতার বিশ্বকাপে একটি করে ম্যাচে বদলি হিসেবে মাঠে নামার সুযোগ পান। আর বাকিটা তো ইতিহাস! লুসাইল স্টেডিয়ামে ডি মারিয়া-মার্তিনেজের বীরত্ব আর লিওনেল মেসির অমরত্বে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয় আর্জেন্টিনা।

আরও পড়ুন : ২০২৬ সালে যে ৮ দক্ষতা আপনাকে সফলতা এনে দেবে

ইনজুরি হয়তো নিষ্ঠুর, কিন্তু ফুটবল বিধাতা কখনো কখনো এই নিষ্ঠুরতার আড়ালেই লিখে রাখেন মহাকাব্যিক কিছু রূপকথা!

Zoom Bangla News
Zoom Bangla News
inews.zoombangla.com
Follow

Follow Zoom Bangla News On Google

Open the Google follow page and tap the checkmark option to receive more updates from Zoom Bangla News in your Google news feed.

Follow Zoom Bangla News On Google

Shamim Reza is an experienced journalist and sub-editor at Zoom Bangla News, with over 13 years of professional experience in the field of journalism. Known for his strong writing skills and editorial insight, he contributes to producing accurate, engaging, and well-structured news content. Born and brought up in Jashore, his background and experience shape his deep understanding of social and regional perspectives in news reporting.