ভেনেজুয়েলা বহুদিন ধরেই বিশ্বের বৃহত্তম প্রমাণিত তেল মজুতধারী দেশ হিসেবে পরিচিত। তবে দেশটির অর্থনৈতিক গুরুত্ব শুধু তেলেই সীমাবদ্ধ নয়। ভেনেজুয়েলার মাটির নিচে রয়েছে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ, গ্যাস, লোহা, কয়লা, নিকেল, বক্সাইট ও হীরাসহ নানা কৌশলগত খনিজসম্পদ, যা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে দেশটির অবস্থানকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে।

নিকোলাস মাদুরোকে আটকের ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ভেনেজুয়েলার তেল খাত পুনর্গঠনের পাশাপাশি দেশটির খনিজ খাতকে নতুন করে সক্রিয় করার পরিকল্পনার কথা প্রকাশ্যে এনেছে। হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, লক্ষ্য শুধু তেল উৎপাদন বাড়ানো নয়, দীর্ঘদিন অব্যবহৃত পড়ে থাকা খনিজ সম্পদকে বৈশ্বিক বাজারে যুক্ত করা।
মার্কিন বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লুটনিক এ বিষয়ে জানান, ভেনেজুয়েলায় ইস্পাতসহ গুরুত্বপূর্ণ খনিজ উপাদানের যে বিশাল ভাণ্ডার বছরের পর বছর অবহেলায় পড়ে রয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসন তা পুনরুদ্ধার ও আধুনিকায়নে কাজ করতে চায়। তার ভাষায়, এসব সম্পদ সঠিকভাবে কাজে লাগানো গেলে দেশটির অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।
তেল সম্পদের ক্ষেত্রে ভেনেজুয়েলার অবস্থান বিশ্বে শীর্ষে। ২০২৩ সাল পর্যন্ত দেশটিতে প্রায় ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেল তেলের মজুত শনাক্ত হয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় প্রায় পাঁচ গুণ বেশি। এই তেলের বড় অংশই ওরিনোকো উপত্যকায় অবস্থিত এবং তা ‘অতি-ভারী’ হওয়ায় উত্তোলন ও পরিশোধনের খরচ তুলনামূলকভাবে বেশি। তবু আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেও গত এক দশকে চীন ছিল ভেনেজুয়েলার প্রধান তেল ক্রেতা। ২০২৪ সালের শেষ দিকে দেশটির মোট তেল রপ্তানির প্রায় ৮১ দশমিক ৭ শতাংশ চীনে গেছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ ছিল প্রায় ১৫ দশমিক ৮ শতাংশ।
তেলের বাইরে প্রাকৃতিক গ্যাসেও ভেনেজুয়েলার অবস্থান শক্তিশালী। প্রমাণিত গ্যাস মজুতে দেশটি বিশ্বে নবম এবং দক্ষিণ আমেরিকার মোট গ্যাস মজুতের প্রায় ৭৩ শতাংশই ভেনেজুয়েলার অধীনে রয়েছে। এই গ্যাস সম্পদ ভবিষ্যতে আঞ্চলিক জ্বালানি নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
স্বর্ণের ক্ষেত্রেও ল্যাটিন আমেরিকায় ভেনেজুয়েলার অবস্থান শীর্ষে। দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভে বর্তমানে প্রায় ১৬১ টন স্বর্ণ রয়েছে। এর বাইরে ওরিনোকো মাইনিং আর্ক অঞ্চলে বিপুল পরিমাণ অব্যবহৃত স্বর্ণের ভাণ্ডার থাকার কথা বলা হয়। ২০১৮ সালের একটি খনিজ প্রতিবেদনে ভেনেজুয়েলায় অন্তত ৬৪৪ টন স্বর্ণ মজুত থাকার অনুমান করা হলেও সরকারি মহলের দাবি, প্রকৃত পরিমাণ আরও বেশি হতে পারে।
স্বর্ণ ও গ্যাসের পাশাপাশি ভেনেজুয়েলায় রয়েছে প্রায় ৩ বিলিয়ন টন কয়লা এবং আনুমানিক ১৪ দশমিক ৬৮ বিলিয়ন টন লোহার আকরিক। শিল্প খাতে গুরুত্বপূর্ণ নিকেল ও বক্সাইটের বড় মজুতও দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে রয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে ভারী শিল্প উন্নয়নের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
হীরা উৎপাদনেও ভেনেজুয়েলা একটি সমৃদ্ধ দেশ। বিভিন্ন খনিতে প্রায় ১ হাজার ২৯৫ মিলিয়ন ক্যারেট হীরার মজুত থাকার সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেছেন খনিজ বিশেষজ্ঞরা। তবে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, অবৈধ খনন এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে এসব সম্পদের বড় অংশ এখনো পুরোপুরি কাজে লাগানো যায়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, ভেনেজুয়েলার এই বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদই দেশটিকে আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর কৌশলগত আগ্রহের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ ও পরিকল্পনাগুলোকে তাই শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে নয়, বরং তেল ও খনিজসম্পদকে ঘিরে দীর্ঘমেয়াদি ভূরাজনৈতিক হিসাবের অংশ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


