ফোনটা বেজে উঠল, স্ক্রিনে ভেসে উঠেছে আপনার আপনজনের নাম, অথবা হতে পারে আপনার খুব কাছের কোনো বন্ধুর। ফোনটা ধরতেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো পরিচিত কণ্ঠের আর্তনাদ, আমি একটা মারাত্মক অ্যাক্সিডেন্ট করেছি, খুব বিপদে আছি! এক্ষুনি এই নম্বরে কিছু টাকা পাঠাও, না হলে ওরা আমাকে ছাড়বে না!
কান্না, ভয়, আকুতি সবকিছু এতটাই নিখুঁত যে, এক মুহূর্তের জন্য আপনার মনে কোনো সন্দেহই জাগবে না। আপনি আতঙ্কিত হয়ে পড়বেন এবং আপনার আপনজনের জীবন বাঁচাতে যা করার দরকার, তাই করবেন। কিন্তু টাকা পাঠানোর পরেই হয়তো জানতে পারবেন, আপনার আপনজন সম্পূর্ণ সুস্থ এবং নিরাপদে আছে। আর আপনি ততক্ষণে এক ভয়ংকর ডিজিটাল প্রতারণার শিকার হয়ে গেছেন, যার নাম ‘এআই ভয়েস ক্লোনিং স্ক্যাম’।
এটা কোনো সিনেমার গল্প নয়, বরং আমাদের দেশের জন্যও এটি একটি ক্রমবর্ধমান হুমকি। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (AI) ব্যবহার করে প্রতারকরা এখন এতটাই শক্তিশালী যে, তারা আপনার কণ্ঠস্বর হুবহু নকল করে আপনাকে এবং আপনার পরিবারকে সর্বস্বান্ত করে দিতে পারে।
প্রযুক্তিটা আসলে কীভাবে কাজ করে?
বিষয়টা যতটা জটিল মনে হচ্ছে, প্রতারকদের জন্য কাজটা ততটাই সহজ। পুরো প্রক্রিয়াটি মূলত তিনটি ধাপে সম্পন্ন হয়:
১. ভয়েস স্যাম্পল সংগ্রহ : প্রতারকদের প্রথম কাজ হলো আপনার কণ্ঠের একটি নমুনা জোগাড় করা। এর জন্য তাদের খুব বেশি কিছু দরকার হয় না, মাত্র ৫ থেকে ৩০ সেকেন্ডের একটি পরিষ্কার অডিও ক্লিপই যথেষ্ট। এই নমুনা তারা বিভিন্ন উৎস থেকে সংগ্রহ করতে পারে:
* সোশ্যাল মিডিয়া: আপনার ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক বা ইনস্টাগ্রামে পোস্ট করা যেকোনো ভিডিও, যেখানে আপনি কথা বলছেন।
* হোয়াটসঅ্যাপ ভয়েস নোট: পরিচিত বা অপরিচিত কাউকে পাঠানো ভয়েস মেসেজ।
* ফোন কল: আপনাকে যেকোনো অজুহাতে (যেমন: জরিপ, অফার বা ভুল নম্বর) ফোন করে আপনার সাথে কথা বলে সেই কথোপকথনটি রেকর্ড করে নেওয়া।
২. ভয়েস ক্লোনিং:
নমুনা হাতে পাওয়ার পর প্রতারকরা ‘ডিপ লার্নিং’ এবং বিভিন্ন AI-সফটওয়্যার ব্যবহার করে। এই সফটওয়্যারগুলো আপনার
কণ্ঠের সব সূক্ষ্ম বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে, যেমন:
* আপনার গলার স্বর (পিচ এবং টোন)
* কথা বলার গতি এবং ছন্দ
* আপনার আঞ্চলিক টান বা উচ্চারণ
* এমনকি আপনার শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়ার ভঙ্গি
এই সমস্ত ডেটা ব্যবহার করে AI একটি ডিজিটাল ভয়েস প্রোফাইল তৈরি করে, যা দিয়ে যেকোনো লেখা বা বাক্যকে আপনার কণ্ঠে রূপান্তরিত করা যায়।
৩. প্রতারণার বাস্তবায়ন: নকল ভয়েস স্যাম্পল তৈরি হয়ে গেলে প্রতারকরা তাদের আসল পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে। তারা আপনাকে বা আপনার প্রিয়জনকে ফোন করে এবং আগে থেকে তৈরি করা একটি স্ক্রিপ্ট অনুযায়ী কথা বলে।
বিষয়টিকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করার জন্য তারা ‘ফোন নম্বর স্পুফিং’ প্রযুক্তি ব্যবহার করে, যার মাধ্যমে আপনার ফোনের স্ক্রিনে আপনার পরিচিতজনের আসল নম্বরটিই ভেসে উঠে। ফলে, আপনার পক্ষে প্রতারণাটি ধরা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
১. পারিবারিক জরুরি অবস্থা ও অপহরণের নাটক: এটি সবচেয়ে প্রচলিত এবং কার্যকর কৌশল। সন্তান, স্বামী-স্ত্রী বা বাবা-মায়ের কণ্ঠ নকল করে দুর্ঘটনা, গ্রেফতার বা অপহরণের মতো চরম আবেগঘন পরিস্থিতি তৈরি করা হয়। মূল উদ্দেশ্য হলো, আপনাকে এতটাই আতঙ্কিত করে তোলা যেন আপনি কোনোভাবে চিন্তা করার বা যাচাই করার সুযোগই না পান।
২. কর্পোরেট প্রতারণা: কল্পনা করুন, আপনার কোম্পানির সিইও বা বসের কণ্ঠ নকল করে একজন হ্যাকার একাউন্টস বিভাগে ফোন করল। এরপর জরুরি ভিত্তিতে একটি নির্দিষ্ট অ্যাকাউন্টে মোটা অঙ্কের টাকা পাঠাতে নির্দেশ দিল। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সরাসরি নির্দেশ ভেবে যে কেউ সহজেই এই ফাঁদে পা দিতে পারেন, যার ফলে কোম্পানির বিপুল আর্থিক ক্ষতি হতে পারে।
৩. সামাজিক সম্মানহানি ও ব্ল্যাকমেইল: বিপদ কেবল আর্থিক ক্ষতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রতারকরা আপনার কণ্ঠস্বর ব্যবহার করে এমন কোনো আপত্তিকর বা বিতর্কিত অডিও ক্লিপ তৈরি করতে পারে, যা আপনার সামাজিক সম্মান, ব্যক্তিগত সম্পর্ক বা কর্মজীবনের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হতে পারে। এই ধরনের নকল অডিও দেখিয়ে আপনাকে ব্ল্যাকমেইল করে টাকা আদায় করার চেষ্টাও হতে পারে।
৪. ব্যক্তিগত তথ্য ও অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া: অনেক ব্যাংক এবং সেবা প্রদানকারী সংস্থা এখন গ্রাহক শনাক্তকরণের জন্য ভয়েস ভেরিফিকেশন সিস্টেম ব্যবহার করে। হ্যাকাররা আপনার ক্লোন করা কণ্ঠ ব্যবহার করে এই নিরাপত্তা স্তর ভেদ করে আপনার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা অন্যান্য ব্যক্তিগত তথ্যের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে।
আপনি যেভাবে একজন স্মার্ট ডিফেন্ডার হবেন: বাঁচার উপায়গুলো জেনে নিন
প্রযুক্তিকে থামানো হয়তো সম্ভব নয়, কিন্তু সচেতনতা এবং কিছু স্মার্ট কৌশল আপনাকে এই ভয়ংকর বিপদ থেকে রক্ষা করতে পারে।
* গোল্ডেন রুলস: সন্দেহ করুন, যাচাই করুন: পরিচিত কারো কাছ থেকে, বিশেষ করে অন্য কোনো নম্বর থেকে ফোন করে টাকা বা সাহায্য চাওয়া হলে, আবেগপ্রবণ হবেন না। সঙ্গে সঙ্গে ফোনটি কেটে দিন এবং তার ব্যক্তিগত বা আসল নম্বরে নিজে কল করে পুরো বিষয়টি নিশ্চিত হোন। এটাই নিজেকে বাঁচানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
* ‘ফ্যামিলি সেফ-ওয়ার্ড’ বা কোড তৈরি করুন: পরিবারের সব সদস্য মিলে এমন একটি গোপন কোড, শব্দ বা বাক্য ঠিক করুন, যা শুধু আপনারাই জানেন। যেকোনো জরুরি পরিস্থিতিতে একে অপরের পরিচয় নিশ্চিত করার জন্য এই কোডটি ব্যবহার করুন। যেমন, ফোন করে যদি কেউ বিপদের কথা বলে, তাকে জিজ্ঞেস করুন, “আমাদের সেফ-ওয়ার্ড কী?” প্রতারকের পক্ষে এর উত্তর দেওয়া সম্ভব না।
* ব্যক্তিগত প্রশ্ন করুন: ফোনের অপর প্রান্তের ব্যক্তি নিজেকে আপনার কাছের মানুষ দাবি করলে, তাকে এমন কোনো ব্যক্তিগত প্রশ্ন করুন যার উত্তর শুধু আপনারা দুজনই জানেন। যেমন: “মনে আছে, গত ঈদে আমরা কোথায় বেড়াতে গিয়েছিলাম?” বা “আমার ছোটবেলার ডাকনাম কী ছিল?”
* অডিওর অস্বাভাবিকতা খেয়াল করুন: AI দিয়ে তৈরি ভয়েস নিখুঁত হলেও অনেক সময় এতে কিছু ত্রুটি থাকতে পারে। যেমন:
* কথার মধ্যে অস্বাভাবিক বিরতি।
* আবেগহীন বা যান্ত্রিক টোন।
* কথার পেছনে কোনো ব্যাকগ্রাউন্ড নয়েজ না থাকা।
আপনার ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট সীমিত করুন: সোশ্যাল মিডিয়ায় আপনার কণ্ঠস্বর আছে এমন ভিডিও বা অডিও ক্লিপ শেয়ার করার আগে দুবার ভাবুন। আপনার প্রোফাইল প্রাইভেট করে রাখুন এবং অপরিচিত কাউকে ভয়েস নোট পাঠানো থেকে বিরত থাকুন।
* সচেতনতা ছড়িয়ে দিন: এই প্রতারণা সম্পর্কে আপনার পরিবারের সদস্য, বন্ধু-বান্ধব এবং সহকর্মীদের সাথে খোলামেলা আলোচনা করুন। বিশেষ করে পরিবারের বয়স্ক সদস্যদের ভালোভাবে বুঝিয়ে বলুন, কারণ তাঁরাই প্রতারকদের সহজ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হন।
একসময় আমরা বলতাম, “চোখে যা দেখি, তাই বিশ্বাস করি”। কিন্তু এখন এমন এক যুগে আমরা বাস করছি, যেখানে কানে যা শুনি, সেটাও বিশ্বাস করার আগে হাজারবার ভাবতে হবে। আপনার একটুখানি সতর্কতা এবং ঠান্ডা মাথায় পরিস্থিতি মোকাবেলা করার ক্ষমতাই পারে আপনাকে এবং আপনার প্রিয়জনকে এই ডিজিটাল ফাঁদ থেকে সুরক্ষিত রাখতে। কানকে বিশ্বাস করার আগে নিজের মস্তিষ্ককে কাজে লাগান। সতর্ক থাকুন, সুরক্ষিত থাকুন।
লেখক: হাসান মাহমুদ পলাশ, প্রযুক্তি বিশ্লেষক
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।