মাত্র এক দিন পরই অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। দেশজুড়ে ভোটের আমেজ, টিভি ও সামাজিক মাধ্যমে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রচারণা। এখন শুধু নির্বাচনের অপেক্ষায় আছে বাংলাদেশের মানুষ। এমন সময়ে যদি আপনি ভোটের উত্তেজনা ও রাজনৈতিক নাটককে আরও ভালোভাবে বুঝতে চান, সেগুলো দেখার জন্য সিনেমা হতে পারে এক চমৎকার মাধ্যম। বিশ্বব্যাপী নির্বাচনের জটিলতা ও উত্তেজনা নিয়ে নির্মিত কিছু চলচ্চিত্র পশ্চিমের নির্বাচন, ষড়যন্ত্র ও ব্যক্তিগত সংগ্রামের গল্পকে দারুণভাবে তুলে ধরে। চলুন দেখে নেয়া যাক নির্বাচন ও ভোটকে কেন্দ্র করে নির্মিত সেরা চলচ্চিত্রগুলো।

হলিউডে নির্বাচন ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে নিয়ে সিনেমা নির্মাণের প্রচলন দীর্ঘদিনের। কিছু উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে:
ইলেকশন (১৯৯৯): অ্যালেকজান্ডার পেইনের এই সিনেমা মূলত একটি হাই স্কুলের ছাত্র পরিষদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে হলেও এটি যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ধাঁচের নিখুঁত প্রতিচ্ছবি। এখানে এক পারফেকশনিস্ট ছাত্র ও তার প্রতিদ্বন্দ্বীর কৌশল ও চরিত্রের দ্বন্দ্ব তুলে ধরা হয়েছে।
নেপোলিয়ন ডিনামাইট (২০০৪): স্কুল-ভিত্তিক আরেকটি কমেডি। সিনেমাটি খুব স্বাভাবিকভাবে নির্বাচন নিয়ে কিছুটা কমিডি দেখিয়েছে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে হাস্যরস, অদ্ভুত চরিত্র ও ছোট ছোট দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে বয়স্ক রাজনীতির কৌশল ও কৌশলগত দ্বন্দ্বের প্রতিফলন ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
লং শট (২০১৯): আধুনিক রাজনৈতিক নাটকেলং শট উল্লেখযোগ্য। চার্লিজ থেরন একজন প্রেসিডেন্ট প্রার্থী, এবং সেট রোজেন তার সাহায্যকারী হিসেবে থাকছেন। চলচ্চিত্রটি রোমান্টিক কমেডি হলেও নির্বাচনের কৌশল ও লিঙ্গভিত্তিক পার্থক্য তুলে ধরে।
দ্য মাঞ্চুরিয়ান ক্যান্ডিডেট (১৯৬২): জন ফ্রাঙ্কেনহিমারের সাই-ফাই থ্রিলার। নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় ব্রেইনওয়াশিং ও ষড়যন্ত্রের গল্প। এই ক্লাসিক থ্রিলারে দেখানো হয়েছে একজন রিপাবলিকান ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রার্থীর নির্বাচনী প্রচারণা ও ষড়যন্ত্র। ক্ষমতার জন্য গোপন পলিটিকাল খেলা, বিশ্বাসঘাতকতা ও মনস্তাত্ত্বিক চাপের মাধ্যমে ফিল্মটি রাজনৈতিক নাটকের এক উত্তেজনাপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।
দ্য ক্যান্ডিডেট (১৯৭২): রবার্ট রেডফোর্ড এই সিনেমার প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। এই সিনেমায় দেখানো হয়েছে ক্যালিফোর্নিয়ার সিনেটর নির্বাচনের প্রার্থী কীভাবে ধীরে ধীরে নিজের আদর্শ ও নীতি পরিবর্তন করে। রাজনৈতিক বাস্তবতা ও নির্বাচনী কৌশলের মাঝে টানাপোড়েনের গল্পও এতে উঠে এসেছে।
ওয়াং দ্য ডগ (১৯৯৭): ক্লিন্টন যুগের হাস্যরসাত্মক রাজনীতি। সিনেমাটি দেখায় কীভাবে প্রেসিডেন্টের একটি ব্যক্তিগত কেলেঙ্কারি ঢাকতে মিডিয়া ও স্পিন ডক্টররা কৃত্রিম বিদেশি যুদ্ধ তৈরি করে। হাস্যরস, রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র ও জনমত নিয়ন্ত্রণের কৌশল ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, যা নির্বাচনী রাজনীতির মজাদার ও বাস্তবসম্মত প্রতিচ্ছবি তুলে ধরে।
প্রাইমারি কালারস (১৯৯৮): এই চলচ্চিত্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারণা ও রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের গল্প দেখানো হয়েছে। হালকা উপন্যাসিকভাবে বিল ক্লিন্টনের ১৯৯২ সালের নির্বাচনকে ভিত্তি করে তৈরি, সিনেমাটিতে প্রার্থী, তার সহকর্মী ও মিডিয়ার কৌশল, নির্বাচনী নাটক এবং ক্ষমতার জন্য রাজনৈতিক লোভ ও দ্বন্দ্ব ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
ব্রিটিশ ও অন্যান্য দেশের নির্বাচন নিয়ে উল্লেখযোগ্য নির্মাণ: ব্রিটিশ নির্বাচনের ওপর চলচ্চিত্র তৈরি খুব কম দেখা গেছে।
লেফট-রাইট অ্যান্ড সেন্টার (১৯৫৯): এই রোমান্টিক কমেডিতে ব্রিটিশ টোরি ও লেবার দলের নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখানো হয়েছে। ভোট ও রাজনৈতিক কৌশলকে হাস্যরসের মাধ্যমে উপস্থাপন করে, চলচ্চিত্রটি সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক সচেতনতা ও পার্টি রাজনীতির চিত্র ফুটিয়ে তোলে। এটি ব্রিটিশ নির্বাচনের দৃষ্টান্তহীন নাটক ও বিনোদনের মিশ্রণ।
কোলিশন (২০২১): এই চলচ্চিত্রে ২০১০ সালের ব্রিটিশ নির্বাচনের পর ডেভিড ক্যামেরন, নিক ক্লেগ ও গর্ডন ব্রাউনের মধ্যে ক্ষমতা ভাগাভাগি ও জোট গঠনের নেপথ্য কৌশল দেখানো হয়েছে। রাজনৈতিক আলোচনার নাটক, ক্ষমতার লোভ ও কৌশলগত সমঝোতার মাধ্যমে ভোট ও জোট রাজনীতির বাস্তব চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও আফ্রিকায় নির্বাচন নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্র:
নো (২০১২, চিলি): পাবলো লার্রেইনের এই সিনেমা ১৯৮৮ সালের চিলির রেফারেন্ডামকে কেন্দ্র করে। পিনোচেটের শাসনের বিরুদ্ধে ভোটের প্রচারণা ও গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার সংগ্রাম দেখানো হয়েছে। নির্বাচনী কৌশল, মিডিয়ার প্রভাব এবং সাধারণ মানুষের সাহসিকতার মাধ্যমে এটি রাজনৈতিক পরিবর্তনের উত্তেজনাপূর্ণ গল্প তুলে ধরে।
দ্য এজ অব ডেমোক্রেসি (২০১৯, ব্রাজিল): পেত্রা কোস্টার নির্মিত এই ডকুমেন্টারি ব্রাজিলের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও জেয়ার বোলসোনারোর ২০১৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রেক্ষাপট দেখায়। রাজনৈতিক লোভ, দুর্নীতি, জনগণের প্রত্যাশা ও গণতন্ত্রের চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে চলচ্চিত্রটি দেশটির জটিল রাজনীতির বাস্তব চিত্র তুলে ধরে।
ববি ওয়াইন: দ্য পিপলস প্রেসিডেন্ট (উগান্ডা): এই ডকুমেন্টারি চলচ্চিত্রে দেখানো হয়েছে কিভাবে ইউগান্ডার পপ তারকা ববি ওয়াইন রাজনৈতিক নেতৃত্বের দিকে এগিয়ে যান। সাধারণ মানুষ ও পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষ, ভোটের আগের উত্তেজনা, গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম তুলে ধরা হয়েছে।
অটোবায়োগ্রাফি (ইন্দোনেশিয়া): এই চলচ্চিত্রে একটি দুর্নীতিগ্রস্ত, সামরিক মনোভাবের মেয়রের প্রার্থী ও তার তরুণ সহকারীর বিষাক্ত সম্পর্কের গল্প দেখানো হয়েছে। নির্বাচনী কৌশল, ক্ষমতার লোভ ও নৈতিকতার সংঘাতের মাধ্যমে রাজনৈতিক ভীতিকর পরিবেশ তুলে ধরা হয়েছে। সিনেমাটি সরাসরি বাস্তব জীবনের রাজনৈতিক উত্তেজনা ও নান্দনিক দৃষ্টিভঙ্গি মিশিয়ে একটি গভীর এবং নাটকীয় অভিজ্ঞতা প্রদান করে।
আরও পড়ুন : ২০২৬ সালে যে ৮ দক্ষতা আপনাকে সফলতা এনে দেবে
একটি দেশের জন্য নির্বাচন খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আর নির্বাচনের উত্তেজনা শুধু টিভি স্ক্রিন বা নির্বাচনী প্রচারণা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয়। সিনেমা মাধ্যমে আমরা দেখতে পাই কীভাবে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, জনমত ও ব্যক্তিগত সংগ্রামের নাটক বাস্তব জীবনে প্রকাশ পায়। এই চলচ্চিত্রগুলো ভোটের আগের রাত ও নির্বাচনের দিনকে আরও উপলব্ধি করতে সাহায্য করবে। তাই ভোটের আগে ছুটির দিনে কিছু নির্বাচনী চলচ্চিত্র এতে হয়তো ভোটের দিন আপনি কেমন দেশ যাচ্ছেন সেটা আরও স্বচ্ছভাবে বুঝে ও যুক্তিসম্মতভাবে ভোট দিতে পারবেন।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান ও আইএমডিবি
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


