গত নভেম্বরে কেপ ভার্দে ও কুরাসাওয়ের মতো ক্ষুদ্র দেশ বিশ্বকাপে জায়গা করে নিয়েছে। রাজনৈতিক সংঘাতে হাইতি নিজ দেশে কোনো ম্যাচ না খেলেও বিশ্বমঞ্চে জায়গা করে নিয়েছে। এদের আগমনে বিশ্বকাপ ঘিরে এক মিলনমেলার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। কিন্তু বিশ্বকাপের দুই মাস বাকি থাকতে সে সম্ভাবনায় আঁধার নেমে আসতে শুরু করেছে। আগামী ১১ জুন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোতে শুরু হতে যাওয়া বিশ্বকাপ বেশ কিছু সমস্যার মুখে পড়তে যাচ্ছে। এসব দূর করতে না পারলে এই টুর্নামেন্টের সফলতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেবে।

ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা: গত বছরের শেষ দিকে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো বেশ উৎফুল্লভাবেই বলেছিলেন, ‘পুরো পৃথিবীকে আমেরিকায় স্বাগতম।’ কিন্তু ইনফান্তিনোর এ কথা হুমকির মুখে পড়ে গেছে। বিশ্বকাপে ১০৪ ম্যাচের মধ্যে ৭৮টি হবে যুক্তরাষ্ট্রে। অথচ সেই দেশে বিশ্বের অনেক দেশের দর্শকের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতিতে উদ্বুদ্ধ হয়ে অবৈধ অভিবাসী ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আরোপ করেছেন এ নিষেধাজ্ঞা। এই নীতির কারণে সেনেগাল, আইভরি কোস্ট, আলজেরিয়া, তিউনিসিয়া ও কেপ ভার্দের মতো অংশগ্রহণকারী দেশের দর্শকদের যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা পাওয়া ভীষণ কঠিন হয়ে গেছে। ১৫ হাজার ইউএস ডলার জমা রেখে তাদের ভিসা আবেদন করতে হবে। ইরান ও হাইতির দর্শকরা তো যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকতেই পারবেন না। এ ছাড়া অবৈধ অভিবাসীদের রুখতে একটি বিশেষ বাহিনী গঠন করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। আইসিই (ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট) নামক ওই বাহিনীর কাস্টডিতে এ বছর জানুয়ারিতে ছয়জন মারা গেছেন। অভিযানের সময় তাদের গুলিতে দুজন নিহত হয়েছে, যা নিয়ে পুরো আমেরিকায় প্রতিবাদ হয়েছে। তাতে অবশ্য তাদের দাপট একটুও কমেনি। আসন্ন বিশ্বকাপ উপভোগ করতে আসা দর্শকরাও এই বাহিনীর কবলে পড়ে নাজেহাল হতে পারেন।
টিকিটের উচ্চমূল্য: মাত্র দুই মাস বাকি বিশ্বকাপের। অথচ এখনও বিশ্বকাপ টিকিটের উচ্চমূল্য নিয়ে ফিফার ওপর চরম ক্ষুব্ধ ফুটবলপ্রেমীরা। বিষয়টি নিয়ে ফুটবল সাপোটার্স অ্যাসোসিয়েশন (এফএসএ) ও ইউরোপীয় ভোক্তা সংগঠন ইউরোকনজিউমার্স যৌথভাবে ইউরোপীয় কমিশনের কাছে ফিফার বিরুদ্ধে নালিশ দিয়েছে। তাদের দাবি, বিশ্বকাপ টিকিট নিয়ে ফিফা একচেটিয়া আধিপত্যের অপব্যহার করেছে। একজন দর্শক যদি প্রতি রাউন্ডে একটি করে ম্যাচ দেখতে চান, তাহলে আটটি ম্যাচের জন্য সর্বনিম্ন ক্যাটেগরির টিকিটের পেছনে তাঁকে দিতে হবে ৫ হাজার ২২৫ পাউন্ড। অথচ ২০২২ বিশ্বকাপে সাতটি টিকিটের পেছনে খরচ ছিল ১ হাজার ৪৬৬ পাউন্ড। এই সমালোচনার মুখে পড়ে ফিফা ৬০ ডলার মূল্যে কিছু সস্তা টিকেট বাজারে ছেড়েছে। তবে এই টিকিটের সংখ্যা এতই কম যে সাধারণ দর্শকের কাছে তা পৌঁছানো প্রায় অসম্ভব। টিকেটের মূল্য নিয়ে এই বিতর্কের মাঝেই আরও দামি টিকেট বাজারে ছেড়েছে ফিফা। এতদিন সামনের সারির ১০০ আসনের সর্বোচ্চ দাম ছিল ২ হাজার ৭৩৫ ডলার। এবার এই বিভাগের সর্বোচ্চ মূল্যের টিকিটের দাম করা হলো ৪ হাজার ১০৫ ডলার। আগে ফাইনালের টিকিটের সর্বোচ্চ দাম ছিল ৮ হাজার ৬৮০ ডলার। এবার ফাইনালের টিকিটের সর্বোচ্চ দাম ১০ হাজার ৯৯০ ডলার। অন্যান্য ক্যাটেগরির টিকিটের দামও বাড়ানো হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের কন্ডিশন: গত বছর ক্লাব বিশ্বকাপ আসরের মধ্য দিয়ে বছরের এই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের আবহাওয়া ও সেখানকার স্টেডিয়ামের অবস্থা হাতেকলমে সবার সামনে ফুটে উঠেছে। জুন-জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আবহাওয়া অত্যন্ত শুষ্ক থাকে। গ্রীষ্মের এই খরতাপে অংশগ্রহণকারী ৪৮ দেশের অধিকাংশেরই স্বাভাবিক খেলাটা প্রদর্শন সম্ভব নয়। এই গরমের জন্য ক্লাব বিশ্বকাপে ‘কুলিং ব্রেক’ দেওয়া হয়েছিল। চেলসির তৎকালীন কোচ এনজো মারেস্কা বলেছিলেন, এই গরমে ম্যাচ খেলা তো দূরের বিষয়, একটি অনুশীলন সেশন করাও অসম্ভব। চেলসির আর্জেন্টাইন মিডফিল্ডার এনজো ফার্নান্দেজ স্বীকার করেছিলেন, ম্যাচের সময় গরমে তাঁর মাথা ঝিমঝিম করেছিল। শুধু তাই নয়, ওই সময় স্টেডিয়ামগুলোর অবস্থাও বেশ খারাপ থাকে। ক্লাব বিশ্বকাপের সময় মাঠের রুক্ষ অবস্থা দেখে অনেক খেলোয়াড় ও কোচ হতাশা প্রকাশ করেছিলেন। রিয়াল মাদ্রিদের ইংলিশ মিডফিল্ডার জুড বেলিংহাম তো প্রকাশ্যে বলেছিলেন মাঠের অবস্থা একেবারেই ভালো নয়। পিএসজি কোচ লুইস এনরিকে সিয়াটল স্টেডিয়ামের মাঠ দেখে হতাশায় বলেছিলেন, ‘আমি কল্পনাও করতে পারছি না যে কোন এনবিএ ম্যাচের কোর্ট গর্তে ভরা থাকবে!’ সিয়াটল স্যান্ডার্সের বিপক্ষে ২-০ গোলে জেতার পর তিনি আরও বলেছিলেন, ‘এখানে বল ইঁদুরের মতো যেমন ইচ্ছে লাফাচ্ছে।’
যুদ্ধের প্রভাব: গত ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ‘ফিফা শান্তি পুরস্কারে’ ভূষিত করেছিলেন ইনফান্তিনো। সেই ট্রাম্প ইসরায়েলকে সঙ্গে নিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বাধিয়ে পুরো বিশ্বের রাজনীতি ও অর্থনীতিকে অস্থির করে তুলেছেন। ইরানের ওপর আক্রমণের কারণে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, যে কারণে বিশ্বব্যাপী জ্বালানির দাম বেড়ে গেছে। উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি উৎপাদন ব্যবস্থাও ভীষণ ক্ষতির মুখে পড়েছে। তাই পুরো বিশ্বের যোগাযোগ ব্যবস্থা জটিল পরিস্থিতিতে পড়ে গেছে। পাকিস্তানের ইসলামাবাদে অবশ্য যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা শুরুর কথা রয়েছে। তবে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও এর প্রভাব কাটিয়ে উঠতে পুরো পৃথিবীর বেশ কিছু দিন লাগবে। তাই বিশ্বকাপ দেখতে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়া দর্শকদের খরচের পরিমাণ অনেক বেড়ে যাবে।
আরও পড়ুন : ২০২৬ সালে যে ৮ দক্ষতা আপনাকে সফলতা এনে দেবে
মাদক-সংক্রান্ত সহিংসতা: মেক্সিকোতে নিরাপত্তা একটা বিশাল সমস্যা। গত মাসে জালিসকোতে মাদক সম্রাট নেমেসিও ওসেগুয়েরার বাহিনীর বিরুদ্ধে দেশটির সেনাবাহিনী অভিযান চালায়। সেনাদের সঙ্গে যুদ্ধে ওসেগুয়েরাসহ তাঁর বাহিনীর অনেকে মারা যান। নিরাপত্তা বাহিনীর ২৫ সদস্যও মারা গেছেন। মেক্সিকোতে বিশ্বকাপের ১৩টি ম্যাচ হবে। এর মধ্যে চারটি হবে জালিসকো প্রদেশের রাজধানী গুয়াদালাজারাতে।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


