দুই দেশের ইতিহাস, রাজনীতি, যুদ্ধ আর ফুটবলের আবেগ মিলিয়ে এমন কিছু ম্যাচ আছে, যেগুলো শুধু ৯০ মিনিটের লড়াই নয়, বরং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বহন করে আনা এক অমীমাংসিত প্রতিদ্বন্দ্বিতার নাম। ইংল্যান্ড বনাম আর্জেন্টিনা ঠিক তেমনই একটি অধ্যায়। ২১ বছর পর আবার মুখোমুখি হচ্ছে দুই দল। এবার মঞ্চ বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল। পুরস্কার একটাই, ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠার টিকিট।

আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে বুধবারের এই লড়াইকে ঘিরে উত্তেজনার পেছনে শুধু ফুটবল নেই। দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্কের দীর্ঘ ইতিহাস, বিশেষ করে ফকল্যান্ড যুদ্ধের স্মৃতি, এই দ্বৈরথকে সবসময়ই অন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। আর্জেন্টিনার কাছে ইংল্যান্ডকে হারানোর অর্থ কেবল একটি ম্যাচ জেতা নয়, বরং জাতীয় গর্বের আরেকটি প্রকাশ। যদিও কোচ লিওনেল স্কালোনি রাজনৈতিক প্রসঙ্গকে গুরুত্ব দিতে চান না, তবুও মাঠে আর্জেন্টাইন ফুটবলারদের আবেগ যে অন্য মাত্রায় থাকবে, তা বলাই যায়।
তবে বর্তমান ফর্মের বিচারে কোনো দলই নিখুঁত নয়। গ্রুপ পর্বে দাপট দেখিয়ে শীর্ষে উঠলেও এরপর থেকে বারবার হোঁচট খেয়েছে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। শেষ ষোলোতে মিশরের বিপক্ষে ২-০ গোলে পিছিয়ে পড়েও ঘুরে দাঁড়াতে হয়েছে। সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষেও অতিরিক্ত সময় পর্যন্ত লড়তে হয়েছে মেসিদের। প্রতিটি ধাপ যেন ছিল বেঁচে থাকার পরীক্ষা।
অন্যদিকে থমাস টুখেলের ইংল্যান্ড তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রিত ফুটবল খেলেছে। নরওয়ের বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ে জয় তুলে নিয়ে সেমিফাইনালে উঠেছে থ্রি লায়ন্স। তবে এই দলকে নিয়ে এখনও একটি প্রশ্ন থেকেই গেছে। তারা কি এখনও নিজেদের সেরাটা দেখাতে পারেনি? টুখেলের দল বারবার প্রমাণ করেছে, কঠিন মুহূর্তে লড়াই করতে তারা জানে। মনে হচ্ছে, এই দলের ভাণ্ডারে এখনও কিছু বাড়তি অস্ত্র লুকিয়ে আছে।
সব মিলিয়ে দুই দলই যেন নিজেদের সেরা পারফরম্যান্সটা জমিয়ে রেখেছে এই মহারণের জন্য। এই ম্যাচের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ অবশ্যই দুই মহাতারকা। একদিকে বিশ্বকাপে আট গোল করা লিওনেল মেসি, অন্যদিকে ছয় গোল নিয়ে ইংল্যান্ডের অধিনায়ক হ্যারি কেইন। কোয়ার্টার ফাইনালে কেউই গোল পাননি। কিন্তু মেসির পাশে বাড়তি শক্তি হয়ে দাঁড়িয়েছেন হুলিয়ান আলভারেজ, যার অতিরিক্ত সময়ের গোলেই সুইজারল্যান্ডের বাধা পেরিয়েছে আর্জেন্টিনা।
ইংল্যান্ডের হয়ে দুর্দান্ত ছন্দে আছেন জুড বেলিংহ্যাম। নরওয়ের বিপক্ষে জোড়া গোল করে তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন, বড় ম্যাচের মঞ্চে তিনিও ম্যাচের ভাগ্য গড়ে দিতে পারেন।
মিডফিল্ডের লড়াইটাও হতে যাচ্ছে দারুণ আকর্ষণীয়। ডেকলান রাইস অসুস্থতা কাটিয়ে ফিরেছেন। যদিও তার হ্যামস্ট্রিং নিয়ে সামান্য শঙ্কা রয়েছে, তবুও শুরু থেকেই মাঠে নামার সম্ভাবনাই বেশি। ইংল্যান্ডের ডিফেন্সে জন স্টোনস ও মার্ক গেহি জুটি অপরিবর্তিত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। ডান প্রান্তে বুকায়ো সাকা এবং বাঁদিকে অ্যান্থনি গর্ডন আবারও আক্রমণের বড় ভরসা হতে পারেন।
আর্জেন্টিনার শিবিরেও কৌশল নিয়ে চলছে আলোচনা। তিন ডিফেন্ডারের ফর্মেশনে ফেরার গুঞ্জন থাকলেও স্কালোনির স্বভাব অনুযায়ী বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম। বরং মাঝমাঠে সামান্য রদবদল করে ডান প্রান্তে জুলিয়ানো সিমেওনেকে ব্যবহার করা হতে পারে। সুইজারল্যান্ড ম্যাচের নায়ক হুলিয়ান আলভারেজও এবার শুরুর একাদশে সুযোগ পেতে পারেন।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে শারীরিক সক্ষমতা। দুই দলকেই টানা কঠিন ম্যাচ খেলতে হয়েছে। আর্জেন্টিনা দুইবার অতিরিক্ত সময় খেলেছে। ইংল্যান্ডকে আবার মেক্সিকোর উচ্চতা ও মায়ামির ভ্যাপসা গরমের সঙ্গে লড়াই করতে হয়েছে। তাই শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামের পরিবেশ দুই দলের জন্যই কিছুটা স্বস্তির হতে পারে।
আরও পড়ুন : ২০২৬ সালে যে ৮ দক্ষতা আপনাকে সফলতা এনে দেবে
সব পরিসংখ্যান, কৌশল আর পরিকল্পনার পরও এই ম্যাচের আসল সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে অনিশ্চয়তায়। একদিকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার জয়ের অভ্যাস, অন্যদিকে টুখেলের শৃঙ্খলাবদ্ধ ইংল্যান্ড। একদিকে মেসির জাদু, অন্যদিকে কেইন ও বেলিংহ্যামের নেতৃত্ব। ইতিহাস, আবেগ, প্রতিশোধ আর বিশ্বকাপের ফাইনালের স্বপ্ন, সবকিছু মিলিয়ে আটলান্টায় অপেক্ষা করছে আরেকটি স্মরণীয় রাত।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।



