Advertisement

ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন। পুরোনো ছবি
জুমবাংলা ডেস্ক : বহুল আলোচিত নুসরাত জাহান রাফির যৌন হয়রানি সংক্রান্ত জিজ্ঞাসাবাদের ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার মামলায় আত্মপক্ষ শুনানিতে এসে আদালতে কান্নায় ভেঙে পড়লেন সোনাগাজী থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোয়াজ্জেম হোসেন। এ সময় তিনি নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন।

আজ বৃহস্পতিবার ঢাকার সাইবার ক্রাইম ট্রাইব্যুনালের বিচারক মোহাম্মদ আসসামছ জগলুল হোসেনের কাছে নিজেকে নির্দোষ দাবি করে ন্যায়বিচার প্রার্থনা করেন। আত্মপক্ষ শুনানিতে প্রায় ১৫ মিনিট মৌখিক বক্তব্য দেওয়া সময় একপর্যায়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন ওসি মোয়াজ্জেম।

এর আগে মামলাটিতে আত্মপক্ষ শুনানি শুরু হয় দুপুর ২টা ৩০ মিনিটে। ওই সময় ওসি মোয়াজ্জেম কাঠগড়ায় গিয়ে দাঁড়ান। ট্রাইব্যুনালের বিশেষ সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) নজরুল ইসলাম শামীম শুনানির শুরুতে ওসি মোয়াজ্জেমের উদ্দেশে তার বিরুদ্ধে চার্জগঠন এবং বাদীসহ ১১ জনের সাক্ষ্যে অভিযোগ পড়ে শুনিয়ে জিজ্ঞাসা করেন, তিনি দোষী না নির্দোষ?

জবাবে ওসি মোয়াজ্জেম নিজেকে নির্দোষ বলে দাবি করে ন্যায়বিচার প্রার্থনা করেন। এরপর বিচারক জানতে চান, তার কিছু বলার আছে কি না এবং তিনি সাফাই সাক্ষ্য দেবেন কি না। জবাবে তিনি জানান, সাফাই সাক্ষ্য দেবেন ন। তবে লিখিত বক্তব্য পড়ে শোনাবেন। বিচারক অনুমতি প্রদান করলে বক্তব্যটি পড়তে শুরু করেন ওসি মেয়াজ্জেম।

ওসি মেয়াজ্জেম বলেন, ১৯৯১ সালে তৎকালীন তত্ত্বাবাধায়ক সরকারের সময়ে তার চাকরি হয়। কিন্তু বিএনপি সরকার আসার পর নিয়োগ স্থগিত করে দেয়, যা নিয়ে তিনি রিট করেন। পরে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ১৯৯৭ সালে চাকরি ফিরে পান। চাকরি জীবনে তিনি অনেক আসামি ধরেছেন। সুনামের সঙ্গে কাজ করায় ২০০ পুরস্কার পেয়েছেন। গত বছর দুবার চট্টগ্রাম বিভাগে তিনি বেস্ট অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন। এসব বলে ওসি মোয়াজ্জেম আসল ঘটনার বিবরণ দিতে শুরু করেন।

‘২০১৮ সালের ১ নভেম্বর আমি সোনাগাজি থানার ওসি হিসেবে যোগদান করি। আমার চাকরিকালীন সময়ে প্রিন্সিপাল সিরাজ সম্পর্কে বিভিন্ন অভিযোগ শুনেছি। কিন্তু থানায় কেউ অভিযোগ করতে আসেনি। গত ২৮ এপ্রিল মাদ্রাসায় গ্যাঞ্জামের কথা শুনে পুলিশ পাঠাই। ওই এলাকার লোক ধর্মান্ধ। কোনো হুজুরের বিরুদ্ধে কিছু বলার ওপায় নাই। আমার থানায় তখন কোনো নারী অফিসার ছিল না। তাই আমি মেয়র, আমার অফিসার ও মাদ্রাসার লোকসহ সবার সামনে নুসরাতকে জিজ্ঞাসা করি। সেখানে নুসরাতের দুই বান্ধবী ও মাদ্রাসার কর্মচারী নুরুল আমিনকে জিজ্ঞাসাবাদেরও ভিডিও করেছি।’

‘আমি নুসরাতকে বলেছি, তুমি আমার মেয়ের মতো। আমার প্রমাণের প্রয়োজন ছিল। তাই জিজ্ঞাসাবাদের ভিডিও করি। প্রমাণ পেয়ে মামলা নিয়ে প্রিন্সিপালকে আটক করি। পরদিন ২৮ মার্চ হাজার খানেক লোক প্রিন্সিপালের মুক্তির জন্য মানববন্ধন করে। সেদিন কয়েজন সাংবাদিক আমাকে প্রশ্ন করে নির্দোষ সিরাজদৌলাকে কেন গ্রেপ্তার করেছি। সেদিন তাদের আমি ভিডিওটি প্রমাণ হিসেবে দেখাই। সে সময় সবাই নুসরাতের বিপক্ষে। সেদিন শুধু আমিই নুসরাতের পক্ষে ছিলাম। জিজ্ঞাসাবাদের দিন আমি নুসরাতের মাকে আমার মোবাইল নম্বর দিয়ে বলেছি, কেউ ডিস্টার্ব করলে আমাকে ফোন দিতে। ওর মা সেদিন আমার হাত ধরে বলেছিল, তোমার মতো কেউ এমন করবে না।’

‘মাদ্রাসায় পরীক্ষার দিন দুজন পুলিশ মাদ্রাসার গেটে ডিউটিতে ছিল। খবর পাই মাদ্রাসার একজন ছাত্রী গায়ে আগুন দিয়েছে। আমি সোনাগাজী হাসপাতালে ছুটে গিয়ে নুসরাতকে দেখতে পাই। সেখান থেকে দ্রুত ফেনি হাসপাতালে নুসরাতকে পাঠাই। সেখান থেকে আমি অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করে ঢাকা বার্ণ ইউনিটে পাঠাই। শাহবাগ থানার ওসিকে ফোন করে বলে দেই, ঠিকমত চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে। আগুন লাগানোর দিনই আমি ঘটনাস্থলে যাই। গত ৮ এপ্রিল পর্যন্ত ৯ জন আসামিকে গ্রেপ্তার করি। ওইদিন সাংবাদিক সজল আমার সঙ্গে থানায় আসে। আমি মোবাইল টেবিলে রেখে নামাজ পড়তে গেলে সে ওই সুযোগে শেয়ারইটের মাধ্যমে ভিডিও নিজের মোবাইলে চুরি করে নিয়ে নেয়। গত ১০ এপ্রিল রাতে নুসরাত মারা যাওয়ার পর আমি মাটি দিতেও আসতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আমার ঊর্ধ্বতন অফিসাররা নিষেধ করায় আসিনি। ১২ এপ্রিল ভিডিওটি চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ায় চুরির বিষয়টি আমার নজরে আসে। আমি গত ১৪ এপ্রিল ভিডিও চুরি হওয়া নিয়ে থানায় জিডি করি। এরপর গত ১৫ এপ্রিল বাদী আমার বিরুদ্ধে এ মামলা করেন।’

মোয়াজ্জেম আরও বলেন, ‘আমি ভিডিওটি করেছি শুধু প্রমাণ রেখে সিরাজ উদ দৌলাকে আটকের জন্য।’

এরপর বিচারক জিজ্ঞাসা করেন, ‘আপনার সময়কালে কয়টা নারী ও শিশু মামলা তদন্তাধীন ছিল।’

জবাবে ওসি মোয়জ্জেম বলেন, ‘২-৩টা হতে পারে।’

তারপর বিচারক প্রশ্ন করেন, ‘মোট কয়টা মামলা তদন্তাধীন ছিল?’

জবাবে মোয়াজ্জেম বলেন, ‘বেশি মাদকের মামলা, বাকিগুলোর অধিকাংশ পলিটিক্যাল মামলা।’

এরপর মেয়াজ্জেম বলেন, ‘আমি শুধু ৯ জনকে গ্রেপ্তারই করিনি। গত ৬ এপ্রিল নুসরাতের ডাইং ডিক্লারেশন গ্রহণের ব্যবস্থা করি। কিন্তু বাদী আমার বিরুদ্ধে শুধু মামলাই করেছে। তিনি নুসরাতের হত্যাকারীদের বিচারের জন্য কোন ভূমিকা রাখেন নাই। উনি (বাদী ব্যারিস্টার সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন) আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক দলের একটি পোস্ট হোল্ড করেন। তাই প্রধানমন্ত্রীর নজরে আসার জন্য শুধু রাজনৈতিকভাবে ও অর্থনৈতিকভাবে লাভবানের উদ্দেশ্য এ মামলা করেছেন।’

এ সময় মোয়জ্জেম যোগ করেন, ‘আমি এ মামলার মাধ্যমে বড় সাজা পেয়েই গেছি। আমার ছেলে স্কুলে যেতে পারে না। আমার মেয়ে এবং মা সজ্জাসায়ী। আমার পরিবার ধ্বংশ হয়ে গেছে। আমি ১০টি খুন করলেও এমন সাজা বোধহয় আমার হতো না।’

এমন সময়ই দিসি কান্নায় ভেঙে পড়েন। কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেন, ‘আমি এতই ঘৃণিত হয়ে গেছি যে, রংপুরে আমাকে ক্লোজ করার পর আমার বিরুদ্ধে জুতা মিছিল হয়েছে।’

পরিকল্পিতভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যতে ভুল তথ্য ছড়ানোয় এমনটা হয়েছে দাবি করে মোয়াজ্জেম বলেন, ‘এ মামলার আইও আমাকে ডাকলে আমি তাকে তদন্তে সহযোগিতা করেছি। আমি বলতে পারতাম মোবাইল হারিয়ে গেছে। কিন্তু আমি তা করিনি। কিন্তু দুর্ভাগ্য আইও সঠিকভাবে তদন্ত করেন নাই।’

এরপর বিচারক প্রশ্ন করেন যে, কোনো মামলা দায়ের বা তদন্তের জন্য বাদী বা সাক্ষীর বক্তব্য ভিডিও রেকর্ড করার আইনগত আবশ্যকতা আছে কি না?

জবাবে মোয়াজ্জেম বলেন, ‘আইনগত আবশ্যকতা নেই, তবে প্রযুক্তির উন্নতি হওয়ায় এখন প্রত্যেক থানায়ই এমন কাজ করে। তা শুধু আদালত চাইলেই দেখানো হয়। পাবলিশ হয় না।’

সর্বশেষ মোয়াজ্জেম বলেন, ‘আমি ৫ ওয়াক্ত নামাজ পড়ি। আল্লাহর ওপর আমার অগাধ বিশ্বাস আছে। আপনার (বিচারক) আছেও আমি ন্যায়বিচার চাই।’

মোয়জ্জেমের বক্তব্য শেষ হলে আগামী ২০ নভেম্বর যুক্তিতর্কের দিন ধার্য করেন আদালত। মামলায় চলতি বছর ২৭ মে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) দাখিলকতৃ তদন্ত প্রতিবেদন গ্রহণ করে এ আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন।

গত ১৬ জুন ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন গ্রেপ্তার হন এবং ১৭ জুন তাকে একই ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হলে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন একই বিচারক। এরপর গত ২৪ জুন এক আবেদনে ট্রাইব্যুনাল তাকে কারাবিধি অনুযায়ী তাকে ডিভিশন প্রদানের আদেশ দেন। প্রথম শ্রেনীর কর্মকর্তা হিসেবে কারাবিধি অনুযায়ী প্রথম শ্রেনীর মর্যাদা ভোগ করছেন।

উল্লেখ্য, অধ্যক্ষ সিরাজ উদদ্দৌলার বিরুদ্ধে যৌন হয়রানীর মামলা তুলে নেওয়ার জন্য গত ৬ এপ্রিল রাফিকে মুখোশ পরা ৪-৫ জন চাপ প্রয়োগ করলে সে অস্বীকৃতি জানালে তার গায়ে আগুন দিয়ে পালিয়ে যায়। টানা পাঁচদিন মৃত্যুর সাথে লড়ে গত ১০ এপ্রিল রাত সাড়ে ৯ টায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ণ ইউনিটে সে মারা যায়। ওই ঘটনার হত্যা মামলায় গত ২৪ অক্টোবর আদালত ১৬ জনের মৃত্যুদণ্ডের রায় দিয়েছেন।

Zoom Bangla News
Zoom Bangla News
inews.zoombangla.com
Follow

Follow Zoom Bangla News On Google

Open the Google follow page and tap the checkmark option to receive more updates from Zoom Bangla News in your Google news feed.

Follow Zoom Bangla News On Google

Shamim Reza is an experienced journalist and sub-editor at Zoom Bangla News, with over 13 years of professional experience in the field of journalism. Known for his strong writing skills and editorial insight, he contributes to producing accurate, engaging, and well-structured news content. Born and brought up in Jashore, his background and experience shape his deep understanding of social and regional perspectives in news reporting.