দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী চামড়াশিল্প এখন খাদের কিনারে। কুরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে যে বিশাল অর্থনৈতিক কর্মযজ্ঞ আবর্তিত হতো, তা এখন পঙ্গুত্বের পর্যায়ে। তীব্র মূলধন সংকটের সঙ্গে মধ্যস্বত্বভোগী সিন্ডিকেটের দৌরাত্মসহ নানা কারণে দেশের অন্যতম প্রধান এই জাতীয় সম্পদ রক্ষায় ঈদের দুই দিন আগেও নেই কোনো হাঁকডাক।

কুরবানির চামড়া নিয়ে ধারাবাহিক বিপর্যয়ের কারণে ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় সবচেয়ে বড় ক্ষতির শিকার হচ্ছে দেশের প্রান্তিক, অসহায় এতিম শিশু এবং কওমি মাদ্রাসা ও লিল্লাহ বোর্ডিংগুলো। দেশের লাখ লাখ এতিম শিক্ষার্থীর খাদ্য, বস্ত্র ও শিক্ষার সংস্থান হুমকির মুখে পড়েছে।
কেউ কেউ বলছেন, এটা আকস্মিক কোনো ইস্যু নয়, কওমি মাদ্রাসাকেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থাকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করার এক গভীর দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের অংশ।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং চামড়াশিল্প সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কুরবানির কাঁচা চামড়ার বাজারে চরম ধস নামার আশঙ্কার পেছনে মূলত পাঁচটি বড় কারণকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এগুলো হচ্ছে-তীব্র তারল্য ও ব্যাংক ঋণ সংকট, সাভার চামড়া শিল্পনগরীর (বিসিক) ব্যর্থতা, লবণ ও কেমিক্যালের দাম বেড়ে যাওয়া, মধ্যস্বত্বভোগী সিন্ডিকেটের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ এবং মৌসুমি ব্যবসায়ীদের অজ্ঞতা। পর্যাপ্ত ঋণ না পাওয়ায় নগদ টাকার তীব্র সংকটে ভুগছেন চামড়া ব্যবসায়ীরা।
কাঁচা চামড়া কেনায় কয়েক বছর ধরেই ব্যাংক ঋণ বিতরণের পরিমাণ কমছে। এ খাতের বেশির ভাগ ব্যবসায়ী খেলাপি হয়ে পড়ায় ব্যাংকগুলোর ঋণ দিতে অনীহা রয়েছে।
ব্যাংক ঋণের গোলকধাঁধায় ট্যানারি মালিকরা: প্রতিবছরই কুরবানির আগে চামড়া কেনার জন্য বিশেষ ঋণ সুবিধা দেওয়ার ঘোষণা দেয়। সিংহভাগ ট্যানারি মালিক এই ঋণ পান না।
বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) সিনিয়র সহসভাপতি মো. শাখাওয়াত উল্লাহ যুগান্তরকে বলেন, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো খেলাপি ঋণের অজুহাত দেখিয়ে টাকা দেয় না। সাভারে স্থানান্তরের পর থেকে অধিকাংশ ট্যানারি এমনিতেই লোকসানে চলছে। আড়তদাররা টাকা না পেলে মৌসুমি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চামড়া কেনে না। ফলে কুরবানির চামড়ার বাজার অস্থির হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
উলেখ্য, এ বছর চামড়া সংরক্ষণে ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২২৮ কোটি টাকা, তবে শেষ পর্যন্ত বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ ১০০ কোটির নিচে নেমে আসবে বলে খাতসংশ্লিষ্টরা দাবি করছেন।
মাদ্রাসা শিক্ষা পিছিয়ে দেওয়ার আন্তর্জাতিক চক্রান্ত: চামড়াশিল্পের এই ধ্বংসাত্মক দশাকে কেবল অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে নারাজ দেশের শীর্ষস্থানীয় আলেম ও সমাজবিজ্ঞানীরা। এর মূল উদ্দেশ্য দেশের ধর্মীয় শিক্ষাব্যবস্থাকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে দেওয়া।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা দক্ষিণখানের দারুল আবরার মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল হাফেজ মাওলানা আবদুল হান্নান যুগান্তরকে বলেন, চামড়াজাত পণ্যের দাম প্রতিবছর বাড়লেও বিপরীতে কুরবানির চামড়ার দাম আবার কমছে। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, এটা কী করে হয়? পৃথিবীর কোনো দেশে এটা হয় কিনা আমার জানা নেই। অবশ্যই এর পেছনে রয়েছে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র ও কারসাজি। ইসলামি শরিয়াহ অনুযায়ী, কুরবানির চামড়া বা তার বিক্রয়লব্ধ অর্থ নিজে ভোগ করা যায় না, এটি সমাজ ও রাষ্ট্রের সবচেয়ে দরিদ্র, এতিম, মিসকিন এবং লিল্লাহ বোর্ডিংয়ের শিক্ষার্থীদের হক। অথচ এতিমদের এই হক মাটি করে দেওয়া হলো!
অনেকে বলছে, দেশে চামড়ার দাম তলানিতে নামার পেছনে ভারতের একটি বড় হাত রয়েছে। বাংলাদেশে কাঁচা চামড়ার দাম কম থাকলে তা অবৈধ পথে সীমান্ত পার হয়ে ভারতে পাচার হওয়ার আশঙ্কা বাড়ে।
এছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের চামড়া খাত যাতে ভারতের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে না পারে, সেজন্যও বাংলাদেশের এই সম্ভাবনাময় খাতকে ক্রমান্বয়ে অকার্যকর করে রাখার একটি আন্তর্জাতিক লবিং সক্রিয় রয়েছে।
খিলগাঁও গোড়ান বাজারে জামেয়া ইসলামিয়া ফজলুর রহমান ভূঁইয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানার ইনচার্জ মাওলানা মোহাম্মদ নিজামউদ্দিন আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, মাদ্রাসার ছেলেগুলো এখন আর চামড়া কালেকশন করতে যেতে চায় না। অনেক এতিমখানায় চামড়া সংগ্রহ করা হয় না। মাদ্রাসা শিক্ষা পিছিয়ে দেওয়ার একটি সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র।
সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত এতিম, অসহায় ও কওমি মাদ্রাসা: দেশের কওমি মাদ্রাসা, দারুল উলুম মাদ্রাসা এবং এতিমখানাগুলো তাদের বার্ষিক বাজেটের একটি বিশাল অংশ (৩০ থেকে ৫০ শতাংশ) আসে কুরবানির চামড়া বিক্রি থেকে।
মাদ্রাসা পরিচালনাকারী ও ওলামাদের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য জানা গেছে। চামড়ার টাকা দিয়ে সারা বছর হাজার হাজার এতিম ও দুস্থ শিশুর তিন বেলার খাবার এবং চিকিৎসার খরচ চালানো হয়। এই খাত বন্ধ হওয়ায় অনেক মাদ্রাসার শিক্ষা কার্যক্রম স্থবির হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
গরুর মাংস কার জন্য কতটুকু খাওয়া নিরাপদ? কীভাবে খেলে ঝুঁকি কম
সরকারের কড়া হুঁশিয়ারি: চামড়া খাতের সম্ভাব্য বিপর্যয় ঠেকাতে সরকারের পক্ষ থেকে এবারও নানামুখী তৎপরতা ও কঠোর অবস্থানের কথা জানানো হয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় দেশের সব ডিসি, ইউএনও এবং পুলিশ প্রশাসনকে কঠোর নির্দেশনা দিয়েছে, যাতে কেউ চামড়া নিয়ে কারসাজি করতে না পারে। চামড়া পাচার রোধে বিজিবির নজরদারি জোরদার করার কথা বলা হয়েছে।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।



