ঘুঘুরা খুব নিরীহ পাখি। মেয়ে-পুরুষ আলাদা করা সহজ নয়। প্রশান্ত মহাসাগরের কিছু দ্বীপ ছাড়া বিশ্বের সবদেশে ঘুঘু দেখা যায়। সবচেয়ে ছোট যে ঘুঘু, তার নাম মাটি-ঘুঘু। শরীরের মাপ প্রায় ১৮ সেন্টিমিটার। হরিয়াল হচ্ছে ঘুঘুদের মধ্যে সবচেয়ে বড়। এছাড়া মর্নিং ডোভ, কোয়েল ঘুঘু, সবুজ ঘুঘু, নামাকুয়া ঘুঘু ইত্যাদি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে আছে।
ছোট হরিয়াল: মাপ ২৮ সেন্টিমিটার। চকলেট-মেরুন পিঠ। মাথা ছাইরঙা। বুক কমলা। হলদেটে সবুজ গলা। ছোট হরিয়াল অনেকটা বড় হরিয়ালের মতোই দেখতে, রঙের ঔজ্জ্বল্য কম। সবুজ আর হলুদের মিশেল শরীরে। তবে সব রঙই ম্লান। গলা চকচকে হলদেটে-সবুজ, পেট উজ্জ্বল সবুজাভ। পা আলতা-লাল। বড় হরিয়ালের মতোই ফলখেকো। দলবদ্ধ। দলপতি থাকে। সাবধানে থাকে ও ডাকে।
কণ্ঠস্বর বড় হরিয়ালের চেয়ে জোরালো, অনেকটা তীক্ষ্ণ শিসধ্বনির মতো। এছাড়াও রয়েছে ছোট বাদামি ঘুঘু। ঘাড়-মাথা হাস্যকর ভঙ্গিতে অসম্ভব দ্রুত ওপর-নিচে করে। একই ডাক দ্রুততালে বারবার গলায় তোলে ‘কুক্ কুরু, কুক্ কুরু, কুরু টু কুক’। এদের মাপ ২৬ সেন্টিমিটার। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ঘুঘুটির বাস সিলেট-চট্টগ্রামের টিলা-পাহাড়ময় বনে। নাম ধুমকল। ইংরেজি নাম Green Imperial pigeon, বৈজ্ঞানিক নাম Ducula aenea। শরীরের মাপ ৪৩-৪৭ সেন্টিমিটার।
বড় হরিয়াল ঘুঘু: ৩৩ সেন্টিমিটার। বুক-পেট হলুদ, চকচকে। পা-ও তাই। মাথা জলপাই সবুজ, ডানার কিনারাও তাই। সুন্দর পাখি। চতুর। বিপদের গন্ধ পেলে গাছের ডাল-পাতার ভেতরে এমনভাবে চুপ করে মিশে থাকে যে, খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। এরা মূলত ফলখেকো। ডুমুর, বট, উড়ে আম, কলা, কুলবরই, অশ্বথ, পাকুড় অত্যন্ত প্রিয়। এরা দলপতির অধীনে থাকে। বিপদসঙ্কেত পাওয়ার পর কেউ যদি চুপ করে না থেকে নড়াচড়া করে, তাহলে বিপদ কেটে যাওয়ার পর সবাই মিলে ওই পাখিটিকে আক্রমণ করে, শাস্তি দেয়।
লালচে ছিটঘুঘু: হঠাৎ করে তিলা বা ছিটঘুঘু বলেই মনে হয়। ৩২ সেন্টিমিটার লম্বা। ঘাড়ে ছাই-কালো ছিট ছিট লম্বা টান আছে কয়েকটা। ডানা রঙচঙা, লালচে-বাদামি, তার ওপরে কালচে ছিট ও ছোপের কারুকাজ। বুক-পেট ও মাথা ধূসর-সাদাটে, ঘাড়-মাথাও তাই। কণ্ঠস্বর গুরুগম্ভীর। ‘ঘুগ্রো ঘুগ, ঘু…ঘু, ঘুর ঘুর, ঘররো…’
সবুজ ঘুঘু: মাপ ২৬ সেন্টিমিটার। বাগেরহাট-খুলনায় এদেরও বলা হয় বাঁশঘুঘু। বাঁশঝাড় এদের খুব পছন্দ। বাঁশের কঞ্চিতে বাসা বাঁধতে ভালোবাসে। এদের ডানার বাতাস নিয়েও একই বিশ্বাস আছে। এদের শরীরে ধাতব সবুজের ভাগ বেশি, তাতে হালকা নীলচের মিশেল। চোখের ওপরিভাগ সাদাটে। কপালও তাই। মাথার চাঁদি ছাইরঙা। বুক-গলা সুরমা-লাল। তাতে চকচকে বাদামির আভা মিলে সুন্দর পাখি। কণ্ঠস্বর করুণ। লাজুক পাখি। বন-বাগানে হেঁটে মূলত মাটিতে পড়া ফলের বীজ খায়। হজমের জন্য এরা ঢিল ও শক্ত মাটি, ইট বা পাথরের কুঁচিও গেলে। সব ধরনের ঘুঘুই কম-বেশি এই কাজটি করে।
কণ্ঠিঘুঘু: বাগেরহাট-খুলনায় বলে বাঁশঘুঘু বা মটরঘুঘু। এরা লাজুক। বন-বাগান, ঝোপঝাড় বেশি পছন্দ। ওড়েও মাটির অল্প ওপর দিয়ে। দ্রুত উড়তে পারে। এত নিচ দিয়ে ওড়ে যে অনেক সময় বেজি বা বনবিড়াল আচমকা থাবা মেরে এদেরকে কুপোকাত করে। এরা একটা নির্দিষ্ট পথ ধরে ওড়ে। বেজি বনবিড়াল তা জানে। বাগেরহাট-খুলনা এলাকায় কুসংস্কার আছে যে, এদের ডানার বাতাস লাগলে কালাজ্বর হয়।
ব্যাপারটি একেবারেই মিথ্যা। খোলা মাঠের গাছেও বাসা করে কখনো কখনো। এরা লম্বায় ২২-২৩ সেন্টিমিটার। পোড়া ইটের মতো রং হয় পিঠ, ডানা ও লেজের ওপরিভাগের। ডানার আগা সরু ধরনের এবং গাছের ডালে বসলে তা কাঁকড়ার চিমটির মতো হয়ে মিশে থাকে। পিঠের নিচের দিকটা ওই চিমটির মতো জায়গার ফাঁক দিয়ে দেখা যায়। মাথা ধূসর ছাই। মাথার চাঁদি-লালচে ধূসর। গলা ধূসর-সাদাটে। ঘাড় ধূসর। লেজের তলা সাদাটে।
মেয়েটির ঘাড়ে চওড়া কালো বলয় আছে। পিঠের নিচের দিকটা চকচকে শ্লেটরঙা, তাতে ধূসর-ছাইয়ের মিশেল। মেয়েটির ঘাড়ে যেমন বলয় আছে, তেমনি তার রঙে লালচের চেয়ে বাদামির ভাগটা বেশি। কণ্ঠস্বর ‘গুরুর গুরু, জুরু জুরু…জিগ… জিগ’, সহজে ডাকে না। কটর কটর, মটর মটর, শব্দও করতে পারে দ্রুত তালে। তাই বাগেরহাট-খুলনায় এদের মটর ঘুঘু বলা হয়। ডাক শুনে মনে হয়, যাঁতাকলে ডাল পেষা হচ্ছে। অন্য একটি ঘুঘুকেও মটরঘুঘু বলে।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।