জুমবাংলা ডেস্ক : দেশে ভূমিজদের প্রথম স্নাতক তিনি। এখন পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর করছেন মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে। অঞ্জন ভূমিজের এত দূর আসার পেছনে মা রতমমণি সিংহ ভূমিজের ভূমিকা ছিল সবচেয়ে বেশি। পিন্টু রঞ্জন অর্ককে সেই গল্প শুনিয়েছেন তিনি।
মা চতুর্থ শ্রেণির বেশি পড়তে পারেননি। বিয়ের সময় একটি গরু ও একটি ছাগল দান হিসেবে পেয়েছিলেন। বাবা চা শ্রমিক। দিনে ৩০ টাকা মজুরি।
এই মজুরি দিয়ে সংসার চলত না। উপরন্তু বাবা মায়ের কথাও শুনতেন না। নিজের মতো করে চলতেন। সপ্তাহে যে মজুরি পেতেন, সেই টাকাও খরচ করে ফেলতেন।বাবাকে ভালো পথে আনার জন্য মা ব্যাংক থেকে ঋণ নিলেন, যাতে প্রতি সপ্তাহে কিস্তির টাকা পরিশোধ করতে হয়, বাবা আর মজুরির টাকা ভাঙতে না পারেন। পাশাপাশি নিজেও হাঁস, মুরগি, গরু, ছাগল পালন শুরু করেন। পরিবারকে ভালোভাবে চালানোর জন্য মা ছাগল বিক্রি করে ‘রেশন কার্ড’ (চা-বাগানে প্রচলিত আটার কার্ড) বন্ধক রেখেছিলেন, যাতে একটু হলেও অভাব মেটে। মা কৃষক পরিবারের মেয়ে। বাবার নামে অল্প জমি ছিল। মানুষের কাছ থেকে আরো কিছু জমি আধাভাগি রাখেন। কিন্তু চাষ করার গরু বা মহিষ ছিল না। মায়ের পরামর্শে বাবা বস্তি থেকে ধানের ওপর টাকা নেন। মহিষ কিনে চাষবাস শুরু করেন।তখন বাবা ও মেজো জ্যাঠা একই ভিটায় থাকতেন। অল্প একটু জায়গায় দুই পরিবার, সঙ্গে গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি—সব মিলিয়ে বেশ কষ্ট হতো। মা বুঝলেন, এই জায়গা ছাড়তে হবে, কিন্তু টাকা নেই। তাই কিছু হাঁস-মুরগি, ছাগল, একটি গরু বিক্রি করেন এবং কিছু টাকা ধানের ওপর নিয়ে নতুন জায়গা কেনেন। অন্যের জমি চাষাবাদ করে তেমন সুবিধা পেতেন না। তাই মা কিস্তির টাকা এবং একটি গরু বিক্রি করে ৩০ শতাংশ জমি বন্ধক রাখেন।
২০০৯ সালে আমি ক্লাস সিক্সে ভর্তি হলাম। স্কুলড্রেস, বেতন, খাতা, কলম ইত্যাদির জন্য টাকা লাগত। কিন্তু হাতে টাকা নেই। তখন থেকেই মা পুঞ্জির কাজে যাওয়া শুরু করেছিলেন। দিনে ৪০ টাকা করে পেতেন। মায়ের সোনার দুলের খুব শখ ছিল। এভাবে কষ্ট করে করে দুল কেনার জন্য ১০ হাজার টাকা জমিয়েছিলেন। ২০১৫ সালে কলেজে ভর্তিসহ নানা কাজে আমার বেশ কিছু টাকার দরকার পড়ে। মা দুল না কিনে আমাকে সেই টাকা দিয়েছিলেন!
একসময় যখন পুঞ্জির আয় দিয়েও পরিবার চলত না, তখন মা এলবিনটিলা চা-বাগানে অস্থায়ী কামলা হিসেবে কাজ নিলেন। এক বেলা মজুরি ৬০ টাকা, দুই বেলা কাজ করলে ১২০ টাকা পেতেন। বাগানে কাজ করতে করতে মায়ের শরীরে নানা সমস্যা দেখা দেয়। এ কারণে দুই বছর ধরে বাগানের কাজে যাচ্ছেন না। শরীর সুস্থ থাকলে এখনো মাঝে মাঝে পুঞ্জিতে কাজে চলে যান।
আমাদের তিন ভাই-বোনকে পড়াতে অনেক টাকা খরচ হয়। আমাদের টাকা দিতে গিয়ে মা কখনো ভালো কিছু খেতে পারেন না। এমনকি দুর্গাপূজায়ও মা কাপড় কেনেননি। মা ভালোমানের তেল, সাবান, শাড়ি থেকে শুরু করে কিছু ব্যবহার করেননি। কখনো শখ করে কিছু কেনেননি। তাঁর শখ মনেই রয়ে গেছে। চাকরিতে ঢুকলে প্রথমে মাকে সোনার দুল কিনে দেব।ধীরে ধীরে তাঁর অন্য শখগুলোও পূরণের চেষ্টা করব। সূত্র : কালের কণ্ঠ