স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানসেজ গত বছর এপ্রিলে বেইজিং সফরে যান। গত চার বছর এটি ছিল তার চতুর্থ সফর। ওই সফরে তিনি চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং চীনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে সুপরিকল্পিত উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে অংশ নেন। পাশাপাশি ব্যবসা ও একাডেমিক ক্ষেত্রেও বিভিন্ন সম্পৃক্ততা ছিল।

আনুষ্ঠানিকভাবে এই সফরের মূল বিষয় ছিল বাণিজ্য সংযোগিতা, সবুজ জ্বালানি, প্রযুক্তি এবং বহুপাক্ষিক শাসনব্যবস্থা। সানচেজ বলেছেন বলেন, স্পেন “ডিকাপলিং” বা বিচ্ছিন্নতার প্রচলিত ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করে এবং এর বদলে পারস্পরিক সংযুক্ত সরবরাহ ব্যবস্থাকে সমর্থন করে। তিনি জলবায়ু পরিবর্তন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও পারমাণবিক নিরাপত্তাসহ বৈশ্বিক শাসনে চীনের আরও বড় ভূমিকা নেওয়ার আহ্বান জানান।
এটি সাধারণ বৈশ্বিক দায়িত্ব ভাগাভাগির কথা মনে হলেও, এর পেছনে কৌশলগত উদ্দেশ্য রয়েছে। স্পেন এমন একটি ভূমিকায় এগিয়ে আসছে, যা ইউরোপের অন্যরা হয় ছেড়ে দিয়েছে, নয়তো সঠিকভাবে সামলাতে পারেনি—বেইজিংয়ের সঙ্গে বিশ্বাসযোগ্য ও প্রভাবশালী মধ্যস্থতাকারী হিসেবে।
সানচেজের ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব বুঝতে হলে তাকে তুলনা করতে হয় ভিক্টোর অরবানের সঙ্গে। দুজনেই চীনের সঙ্গে সম্পৃক্ততায় আগ্রহী, তবে ব্রাসেলসে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছেন কেবল একজন।
অরবানের রক্ষণশীল, সার্বভৌমত্ববাদী ও সংঘাতমুখী অবস্থান তাকে দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপীয় ইউনিয়নের উদারপন্থী অভিজাতদের কাছে ব্যতিক্রম হিসেবে চিহ্নিত করেছে। বিপরীতে, সানচেজকে ব্রাসেলসের আদর্শ শিক্ষার্থী হিসেবে দেখা হয়। তিনি অভিবাসন, জলবায়ু নীতি ও নিয়ন্ত্রক সম্প্রসারণে ইউরোপিয়ান কমিশনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখেন এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রগতিশীল এজেন্ডার সঙ্গে নিজেকে পুরোপুরি মানানসই হিসেবে উপস্থাপন করেন। এ জন্যই ব্রাসেলসে স্পেনের কণ্ঠ বেশি গুরুত্ব পায়।
ইইউ বাজেটে চতুর্থ বৃহত্তম অবদানকারী এবং দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির দেশ হিসেবে স্পেন চীনের কাছে এমন সুযোগ এনে দেয়, যা অরবানের অধীনেও হাঙ্গেরি দিতে পারেনি—বাধাহীন প্রবেশাধিকার। ফলে এক ধরনের বিপরীত চিত্র তৈরি হয়েছে। চীনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার সবচেয়ে কার্যকর ইউরোপীয় সমর্থক একজন জনতাবাদী নন, বরং ব্রাসেলসের মূলধারার গভীরে থাকা এক নেতা।
ওয়াশিংটনের উদ্বেগ
যুক্তরাষ্ট্র সানচেজের চীননীতি লক্ষ্য করেছে এবং সন্তুষ্ট নয়। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেনেট সরাসরি সতর্ক করে বলেন, বেইজিংয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা “নিজের গলা কাটা”-র মতো হবে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধসহ সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক সংকটে স্পেনের যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের সঙ্গে পুরোপুরি একমত না হওয়াও এই উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
তবে ইউরোপে সানচেজের অবস্থান তুলনামূলকভাবে বেশি সমর্থন পেয়েছে। স্টেফানে সেজার্ন মনে করেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন চীনা বিনিয়োগ বাড়িয়ে উপকৃত হতে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্রের মতো বিচ্ছিন্নতাবাদী অবস্থান অনুসরণ করা উচিত নয়।
একইসঙ্গে বহুমেরু বিশ্ব, যৌথ দায়িত্ব ও সহযোগিতার ওপর সানচেজের জোর চীনের বর্ণনার সঙ্গেও মিলে যায়—যা প্রচলিত ট্রান্সআটলান্টিক কাঠামোর সঙ্গে কিছুটা অস্বস্তিকর সম্পর্ক তৈরি করে।
বাস্তবে চীন-স্পেন সম্পর্ক
বক্তব্যে কিছুটা বিমূর্ততা থাকলেও বাস্তবে চীন-স্পেন সম্পর্ক বেশ স্পষ্ট ও কার্যকর। চীন এখন ইইউ-এর বাইরে স্পেনের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক দ্রুত বাড়ছে। ২০২৪-২০২৫ সময়কালে চীনা বিনিয়োগ প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়ে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
বার্সেলোনাতে চীনা গাড়ি নির্মাতা সেরি ইউরোপীয় কার্যক্রম কেন্দ্র ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করছে। জারাগোজাতে সিএটিএল লিথিয়াম ব্যাটারির গিগাফ্যাক্টরি তৈরি করছে। নাভারাতে হিথিয়াম শক্তি সংরক্ষণ প্রকল্পে বিনিয়োগ করছে।
এছাড়া, স্পেন সংবেদনশীল প্রযুক্তি ক্ষেত্রেও এগিয়েছে। ওরিজিন কোয়ন্টামের সঙ্গে একটি কৌশলগত চুক্তির মাধ্যমে ইউরোপের বৃহত্তম কোয়ান্টাম কম্পিউটার তৈরির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, হাওয়াইকে বিচারিক টেলিফোন নজরদারি সংরক্ষণের দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত কিছু মিত্র দেশের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
চুক্তি, বিনিয়োগ ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক
এই সফরে ১৯টি দ্বিপাক্ষিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, যা বাণিজ্য, প্রযুক্তি, সবুজ জ্বালানি ও অবকাঠামোকে অন্তর্ভুক্ত করে। একইসঙ্গে একটি নতুন কৌশলগত কূটনৈতিক সংলাপ ব্যবস্থাও গড়ে তোলা হয়েছে, যা নিয়মিত উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ নিশ্চিত করবে।
সানচেজ আরও বিনিয়োগ আকর্ষণের চেষ্টা করেন, যেমন উইন্ড টারবাইন নির্মাতা মিং ইয়াং-এর সঙ্গে যোগাযোগ। এছাড়া শিক্ষা, গবেষণা ও সাংস্কৃতিক সহযোগিতাও জোরদার করা হয়েছে। প্রতীকীভাবে চাইনিজ অ্যাকাডেমিক বিজ্ঞান বিশ্ববিদ্যালয় তাকে সম্মানসূচক অধ্যাপক উপাধি প্রদান করে।
বাস্তববাদ ও কৌশলী উপস্থাপনা
সানচেজের চীননীতি মূলত বাস্তববাদ ও কৌশলী উপস্থাপনার মিশ্রণ। একদিকে রয়েছে বিনিয়োগ, শিল্প উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক লাভ; অন্যদিকে বৈশ্বিক ন্যায়, জলবায়ু নেতৃত্ব ও বহুপাক্ষিকতার মতো আদর্শিক বক্তব্য।
ব্রাসেলসে তিনি একজন নির্ভরযোগ্য প্রগতিশীল নেতা, আর বেইজিংয়ে একজন বাস্তববাদী সমঝোতাকারী। এই দ্বৈত অবস্থানই তার নীতিকে সংজ্ঞায়িত করে।
হামের টিকা কার্যক্রম বন্ধ থাকায় সংক্রমণ বেড়েছে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী
স্পেনের এই কৌশল স্পষ্টভাবে পরিকল্পিত। পেদরো সানসেজ সুযোগ শনাক্ত করে দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছেন, ফলে মাদ্রিদ এখন বেইজিং ও ব্রাসেলসের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুতে পরিণত হয়েছে।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


