পবিত্র ঈদুল আজহা সামনে রেখে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে হাজার হাজার গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা ঢাকায় আসছে। হাটে কোরবানির পশুর সরবরাহ বাড়লেও বেচাকেনা এখনও পুরোপুরি জমে ওঠেনি। বড় আকৃতির গরু ঘিরে দর্শনার্থীর কৌতূহল ও ভিড় থাকলেও অধিকাংশ ক্রেতার আগ্রহ এখন ছোট ও মাঝারি গরুতে। গতকাল রোববার রাজধানীর গাবতলী, দিয়াবাড়ী, পোস্তগোলা, শ্মশানঘাট ও ধোলাইখাল পশুর হাট ঘুরে এ চিত্র দেখা গেছে।

ছোট গরুর চাহিদা বেশি

Advertisement

অনেকেই পরিবারের সদস্যদের নিয়ে হাটে এসে গরু দেখছেন, ছবি তুলছেন, দাম জিজ্ঞেস করছেন। কিন্তু কিনছেন কম। খামারি ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, আজ সোমবার থেকে বেচাকেনা শুরু হবে।

দুপুরে গাবতলী হাটে ঢুকতেই চোখে পড়ে বিশাল আকৃতির গরুর সারি। কোথাও ফ্রিজিয়ান, কোথাও ব্রাহমা, কোথাও দেশি জাতের বিশাল ষাঁড়। গরুর গলায় রঙিন ফিতা, শিঙে রং, শরীরে পরিচর্যার ছাপ। বড় গরুগুলো ঘিরে ভিড় সবচেয়ে বেশি। অনেকে মোবাইল ফোনে ছবি তুলছেন, ভিডিও করছেন। কিন্তু বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বড় গরুর ক্রেতা খুব কম।

কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের ধর্মধোয়া গ্রাম থেকে চারটি বড় গরু নিয়ে এসেছেন মনিরুল ইসলাম। দিয়াবাড়ী হাটে বাঁধা তাঁর গরুগুলোর প্রতিটির ওজন ১০ থেকে ১২ মণ। সবচেয়ে বড় গরুটির দাম হাঁকছেন আট লাখ টাকা। কিন্তু গতকাল পর্যন্ত সর্বোচ্চ দাম উঠেছে আড়াই লাখ টাকা। মনিরুল বলেন, এখনও আসল বেচাকেনা শুরু হয়নি। মানুষ এসে দেখে যাচ্ছে। সোমবার থেকে হয়তো হাট জমবে। তখন দামও উঠবে। তিনি বলেন, এবার পশু পালন করতে খরচ অনেক বেড়েছে। এক মণ গমের ভুসির দাম এখন দেড় হাজার টাকার বেশি। গত বছর ছিল ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা। ট্রাক ভাড়াও বেড়েছে। গতবার গরু আনতে ২২ হাজার টাকা লেগেছিল; এবার ৩০ হাজার টাকা লেগেছে।

তবে ক্রেতাদের বক্তব্য ভিন্ন। টঙ্গীর চেরাগ আলী এলাকা থেকে গরু কিনতে আসা আলভী ইসলাম বলেন, গত বছর যে গরু ১ লাখ ২০ হাজার টাকায় কিনেছিলেন, এবার দেড় লাখ টাকাতেও বিক্রেতারা ছাড়তে চাচ্ছেন না। দাম অনেক বেশি মনে হচ্ছে।

ছোট-মাঝারি গরুর চাহিদা বেশি

গাবতলী হাট ঘুরে দেখা গেছে, ২০০ থেকে ৩০০ কেজি ওজনের গরুর চাহিদা সবচেয়ে বেশি। খামারি ও ব্যাপারীরা বলছেন, বিক্রি হচ্ছে মূলত মাঝারি গরু। লক্ষ্মীপুর থেকে ২৫টি গরু নিয়ে আসা ব্যবসায়ী শরিফুল ইসলাম বলেন, সাড়ে তিন লাখ থেকে পাঁচ লাখ টাকার গরুগুলো নিয়েই বেশি দরদাম হচ্ছে।

শনিবার রাতে সিরাজগঞ্জ থেকে ২২টি গরু নিয়ে আসা জালাল ব্যাপারী বলেন, এখনও মানুষ অপেক্ষায় আছে। শেষ মুহূর্তেই বেশি বিক্রি হবে।

কুষ্টিয়ার মিরপুর থেকে ৯টি গরু নিয়ে আসা মো. ইকবাল আলী বলেন, কয়েক দিন ধরে হাটে আছি। এখন পর্যন্ত একটা গরুও বিক্রি হয়নি। মানুষ দাম জিজ্ঞেস করছে, দরদাম করছে; কিন্তু কিনছে না।

অন্যদিকে ছোট গরুর বিক্রি কিছুটা শুরু হয়েছে। মানিকগঞ্জের রুবেল মিয়া জানান, তাঁর চারটি ছোট গরুর মধ্যে দুটি বিক্রি হয়েছে। রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া থেকে আসা ইনতাব আলী বলেন, অনেকে ভাবে, শেষ সময়ে ছোট গরুর দাম বাড়ে। তাই আগেভাগেই কিনে নিচ্ছে।

রাজধানীর লালবাগের বাসিন্দা জাফর রানা গতকাল দুপুরে দুই ছেলে ও ভাইকে নিয়ে গাবতলী হাটে আসেন। এক ঘণ্টার মধ্যেই ৮৪ হাজার টাকায় একটি ছোট ষাঁড় কিনে ফেলেন। তিনি বলেন, দাম আরও বাড়তে পারে মনে হয়েছে। তাই এখনই কিনে নিলাম। আবার আনিসুল হক নামের এক ক্রেতা প্রায় চার মণ ওজনের একটি গরু কিনেছেন এক লাখ ৫৮ হাজার টাকায়। তিনি বলেন, সকাল থেকে ঘুরে দেখলাম। বিক্রেতারা অনেক বেশি দাম চাচ্ছে। অনেক দরকষাকষির পর কিনেছি।

৫০ লাখ টাকার গরুও আছে

এবার রাজধানীর পশুর হাটে বড় আকৃতির গরুর সংখ্যাও কম নয়। গাবতলী হাটে সবচেয়ে বেশি ভিড় দেখা গেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা থেকে আনা দুটি বিশাল ষাঁড় ঘিরে। একটির নাম ‘কালো জামাই’, অন্যটির নাম ‘সাদা জামাই’। কালো জামাইয়ের ওজন প্রায় এক হাজার ৫০০ কেজি। দাম হাঁকা হচ্ছে ৫৫ লাখ টাকা। আর সাদা জামাইয়ের ওজন প্রায় এক হাজার ৩০০ কেজি। দাম চাওয়া হচ্ছে ৪৫ লাখ টাকা। খামারি ইয়াকুব আলী বলেন, পাঁচ বছর ধরে বিশেষ যত্নে লালনপালন করেছি। খাবারের পেছনে মাসে ৩৬ হাজার টাকার মতো খরচ হয়েছে।

বাগেরহাট থেকে আনা ‘সম্রাট বাবু’ নামের একটি ব্রাহমা জাতের ষাঁড়ের দাম চাওয়া হচ্ছে ২৮ লাখ টাকা। খামারি হাবিবুল্লাহ খান বলেন, পাঁচ বছর ধরে ষাঁড়টি লালন-পালন করেছি। প্রতিদিন দেড় হাজার টাকার মতো খরচ হয়েছে।

চুয়াডাঙ্গা থেকে আনা ‘লাল বাদশাহ’ নামের আরেকটি ব্রাহমা জাতের গরুর দাম হাঁকা হচ্ছে ৫০ লাখ টাকা। ব্যাপারী জিয়াউর রহমান জানান, চার লাখ টাকার নিচে তাঁর কাছে কোনো গরু নেই।

কুষ্টিয়া থেকে আনা ‘নবাব’ নামের একটি গরুর দাম চাওয়া হচ্ছে ১৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা। গরুটির মালিক সাইদুল ইসলাম বলেন, লোকজন এসে শুধু দাম জিজ্ঞেস করছে।

মহিষ, দুম্বা ও ছাগলেও বৈচিত্র্য

গরুর পাশাপাশি মহিষ, দুম্বা ও ছাগলের বাজারেও রয়েছে বৈচিত্র্য। কেরানীগঞ্জ থেকে আনা ‘টাইগার’ নামের একটি মহিষ এখন গাবতলী হাটের অন্যতম আকর্ষণ। প্রায় এক হাজার কেজি ওজনের মহিষটির দাম চাওয়া হচ্ছে ২৫ লাখ টাকা।

খামারি মজিবর রহমান বলেন, যে টাইগার কিনবেন, তাঁকে একটি ছোট গরু উপহার দেওয়া হবে। রংপুর থেকে পাঁচটি দুম্বা নিয়ে এসেছে বিসমিল্লাহ এগ্রো। এর মধ্যে দুটি দুম্বার দাম পাঁচ লাখ টাকা করে। অন্য তিনটির দাম সাড়ে চার লাখ টাকা করে। বিসমিল্লাহ এগ্রোর কর্মচারী নুর ইসলাম বলেন, একজন দুই লাখ ৮০ হাজার টাকা দাম বলেছেন। কিন্তু এত কম দামে বিক্রি করা সম্ভব নয়।

ছাগলের বাজারেও দাম তুলনামূলক বেশি। যমুনাপারি জাতের একটি ছাগলের দাম হাঁকা হচ্ছে এক লাখ টাকা। হরিয়ানা জাতের আরেকটি ছাগলের দাম ৭৫ হাজার টাকা। তবে ছোট আকৃতির ছাগল ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ছাগল ব্যবসায়ী হারুন শেখ বলেন, এখন পর্যন্ত ২৫টি ছাগল বিক্রি করেছি। ছোট ছাগলের চাহিদা বেশি।

গরমে বাড়ছে উদ্বেগ

এদিকে, রাজধানীতে কয়েক দিন ধরে চলা তীব্র গরমে পশু নিয়ে বাড়তি উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। হাটে বড় গরুগুলোকে হাঁপাতে দেখা গেছে। অনেক জায়গায় ফ্যান ও শামিয়ানা ব্যবহার করে পশুগুলোকে ঠান্ডা রাখার চেষ্টা করছেন ব্যবসায়ীরা। কেউ কেউ নিয়মিত পানি খাওয়াচ্ছেন।

রাজধানীর দিয়াবাড়ী হাটের পশুচিকিৎসক ইমরুল হোসেন বলেন, গরমের কারণে একটি বড় গরু অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। পরে সেটি কসাইয়ের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়।

খামারিরা বলছেন, গরমের কারণে পশুর পরিচর্যায় খরচ আরও বেড়েছে। সারাক্ষণ ফ্যান চালাতে হচ্ছে। পরিবহনের সময়ও পশু দুর্বল হয়ে পড়ছে।

পোস্তগোলা ও ধোলাইখালেও একই চিত্র

পুরান ঢাকার পোস্তগোলা শ্মশানঘাট পশুর হাটে এখনও পুরোপুরি জমেনি কেনাবেচা। ফরিদপুরের ভাঙ্গা থেকে ৪৩টি গরু নিয়ে আসা ব্যবসায়ী ইউসুফ বলেন, ক্রেতারা আসছেন, দেখে যাচ্ছেন, কিন্তু কিনছেন না। চুয়াডাঙ্গা থেকে ১৮ মণ ওজনের গরু নিয়ে আসা আরেক ব্যবসায়ী বলেন, ১৫ লাখ টাকা দাম চাচ্ছেন। এখনও একটা গরুও বিক্রি হয়নি। হাটটির পরিচালক রক্তিম আহমেদ বলেন, এবার ইতোমধ্যে ৯ হাজারের বেশি গরু হাটে ঢুকেছে। গত বছরের তুলনায় সংখ্যা বেশি।

ধোলাইখাল পশুর হাটেও সরবরাহ যথেষ্ট থাকলেও বেচাকেনা ধীর। তবে স্থানীয় বাসিন্দারা যানজট ও জনদুর্ভোগের অভিযোগ করেছেন।

ধূপখোলার বাসিন্দা কাজী মুরাদ বলেন, দয়াগঞ্জ এলাকায় এমনিতেই যানজট থাকে। এখন রাস্তার ওপর হাট বসায় দুর্ভোগ আরও বেড়েছে।

নজর কাড়ছে ‘কিং খান’ দুম্বা, উট ও মানিক-রতন

রাজধানীর তেজগাঁও পশুর হাটের এবারের অন্যতম আকর্ষণ ‘কিং খান’ নামের একটি বিশাল আকৃতির দুম্বা। মহাখালীর খামারি সন্দ্বীপ ডোম বলেন, চলচ্চিত্র তারকা শাকিব খানের প্রতি ভালোবাসা থেকেই দুম্বাটির নাম রাখা হয়েছে ‘কিং খান’। মাত্র দুই মাস বয়স থেকে তিনি এটি লালনপালন করছেন। বর্তমানে তিন বছর বয়সী দুম্বাটির ওজন প্রায় ১৭০ কেজি। বাজারে এর দাম হাঁকা হচ্ছে ১০ লাখ টাকা।

তেজগাঁও হাটে নজর কেড়েছে ‘মানিক-রতন’ নামের আরেক জোড়া বিশাল গরুও। প্রায় সমান গড়নের এই দুই গরুর ওজন প্রায় এক হাজার কেজি করে। নরসিংদীর খামারি আহসান সিকদার জানান, দীর্ঘদিন ধরে তিনি গরুর খামার পরিচালনা করছেন। এবারের কোরবানির বাজারে মানিক-রতনকে ঘিরে ক্রেতাদের আগ্রহ বেশ ভালো। যশোরের শার্শা উপজেলার গোগা ইউনিয়নের খামারি আতিয়ান চারটি উট নিয়ে এসেছেন তেজগাঁও পশুর হাটে। এর মধ্যে ২৮ মণ ওজনের একটি উট ২৫ লাখ টাকায়, ২৭ মণ ওজনের আরেকটি ২৪ লাখ টাকায় এবং ১৮ মণ ওজনের একটি উট ১৫ লাখ টাকায় বিক্রি করেছেন।

অন্যদিকে, খিলক্ষেতের বনরূপা আবাসিক প্রকল্পের কোরবানির হাটে তুলনামূলকভাবে ক্রেতা কম দেখা গেছে। জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার বাহাদুরাবাদ ইউনিয়নের খামারি মো. জালাল উদ্দিন বলেন, তিনি শতভাগ বেলজিয়ান ব্রিডের ১৪ মণ ওজনের একটি গরু নিয়ে এসেছেন। গরুটির দাম চাওয়া হচ্ছে সাত লাখ টাকা। কিন্তু এখনও প্রত্যাশিত ক্রেতা পাচ্ছেন না।

বনরূপা আবাসিক প্রকল্প হাটের পরিচালক আসলাম বলেন, এখন পর্যন্ত প্রায় তিন হাজার গরু হাটে এসেছে। আরও বিপুল সংখ্যক পশু আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। বাজারে নিরাপত্তা নিশ্চিতে পুলিশ প্রশাসনের পাশাপাশি নিজস্ব স্বেচ্ছাসেবক মোতায়েন রয়েছে। পর্যাপ্ত সিসিটিভি ক্যামেরা ও মেডিকেল টিমও কাজ করছে। সরকারি ভেটেরিনারি দলের পাশাপাশি হাট কর্তৃপক্ষের নিজস্ব চিকিৎসক দল সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করছে।

আজ থেকে বেনাবেচা জমবে– আশা ব্যবসায়ীদের

খামারি ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, রাজধানীতে আজ সোমবার থেকে সরকারি ছুটি শুরু হলে এবং ঈদ যত ঘনিয়ে আসবে, ততই বাড়বে কেনাবেচা। তাদের মতে, মূল বেচাকেনা হবে আগামী দুদিন।
চুয়াডাঙ্গা থেকে ৪৬টি গরু নিয়ে আসা ডাবলু মিয়া বলেন, ২৭ বছর ধরে হাট করছেন। ঈদের আগের দুই দিনেই সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়।

নতুন পে-স্কেলে শিক্ষক-কর্মচারীদের কার কত বেতন বাড়ছে ?

অন্যদিকে, ক্রেতাদের অনেকে এখনও অপেক্ষায় আছেন। তাদের ধারণা, শেষ সময়ে দাম কিছুটা কমতে পারে। গাবতলীর হাটে মোহাম্মদপুর থেকে আসা মাহবুবুর রহমান বলেন, আজ কিনতে আসেননি। বাজারটা বুঝতে এসেছেন। আরও দুই দিন দেখে তার পর কিনবেন।

Zoom Bangla News
Zoom Bangla News
inews.zoombangla.com
Follow

Follow Zoom Bangla News On Google

Open the Google follow page and tap the checkmark option to receive more updates from Zoom Bangla News in your Google news feed.

Follow Zoom Bangla News On Google

Md Elias is a journalist at Zoom Bangla News, contributing to news writing and editorial support. He is involved in refining content to ensure accuracy, clarity, and consistency across digital platforms. His work reflects a commitment to responsible journalism and reader-focused reporting.