আন্তর্জাতিক ডেস্ক : সুইডিশ জলবায়ু কর্মী গ্রেটা থুনবার্গ জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য ফ্যাশন শিল্পকে দায়ী করেছেন।
ভোগ স্ক্যান্ডিনেভিয়া নামের একটি ম্যাগাজিনের সাক্ষাৎকারে জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে আলাপকালে ফ্যাশন শিল্পের নিন্দা করেছেন।
তিনি বলেন, ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলোকে তাদের পণ্যের পরিবেশগত প্রভাবের দায় নিতে হবে।
টুইট বার্তায় তিনি জানান, কিছু কোম্পানি বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে ‘গ্রিনওয়াশ’ করছে। তাদের পোশাককে তারা টেকসই হিসেবে উপস্থাপন করছে। আর মৌসুমী পণ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে তাদের আরও বেশি পরিবেশবান্ধব হতে হবে।
১৮ বয়সী থুনবার্গকে ওই ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদ করা হয়েছে। প্রচ্ছদে দেখা গেছে, থুনবার্গ একটি বনের মধ্যে একটি ঘোড়াকে আদর করছেন। তার পরনে একটি বড় আকারের ট্রেঞ্চ কোট ছিল।
সাক্ষাৎকারে থুনবার্গ বলেছিলেন, তিনি তিন বছর আগে একটি পোশাক কিনেছিলেন; যেটি ‘সেকেন্ড হ্যান্ড’ ছিল। তিনি বলেছেন, আমি কেবল আমার পরিচিত লোকদের কাছ থেকে জিনিসপত্র ধার করি।
জাতিসংঘ বলছে, ফ্যাশন বিশ্বের দ্বিতীয় সবচেয়ে দূষণকারী শিল্প এটি সবাই বিশ্বাস করে। বিশ্বব্যাপী এই শিল্প ২০ শতাংশ পানি দূষণের জন্য দায়ী।
আর কার্বন নিঃসরণের জন্য এই শিল্প বিশ্বব্যাপী ৮ শতাংশ দায়ী। জাতিসংঘ বলছে, এটি সমস্ত আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ও শিপিংয়ের চেয়ে বেশি।
ইতিমধ্যে ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলো তাদের পরিবেশগত পদচিহ্ন কমাতে পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে।
এই কোম্পানিগুলোকে প্রায়ই গ্রিনওয়াশের অভিযোগ করা হয়। একটি পণ্যের পরিবেশগত গুণাবলি সম্পর্কে ভোক্তাদের বিভ্রান্ত করার মার্কেটিং পলিসির কারণেই তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়।
গ্রেটা থুনবার্গ কে?
সুইডেনের স্টকহোমে বেড়ে উঠেছেন গ্রেটা থুনবার্গ। তার ১৮ বয়স হয়েছে। তার মা ম্যালেনা আর্নম্যান একজন অপেরা গায়িকা।
তার বাবা স্ভান্তে থুনবার্গ একজন অভিনেতা এবং রসায়নে নোবেল পুরস্কার জয়ী বিজ্ঞানী স্ভান্তে আরহেনিয়াসের উত্তরসূরি।
গ্রেটার বাবা বলেন, তার বড় মেয়ে গ্রেটা আট বছর বয়সে জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে জানতে পারে। তবে তার বাবা মা কেউই অ্যাক্টিভিস্ট ধাঁচের ছিলেন না।
কবে থেকে তিনি ক্যাম্পেইনিং শুরু করলেন?
২০১৮ সালের মে মাসে গ্রেটার বয়স যখন ১৫, সেসময় গ্রেটা স্থানীয় এক পত্রিকার জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে এক রচনা প্রতিযোগিতায় পুরস্কার পান।
তিন মাস পর আগস্টে সুইডেনের পার্লামেন্ট ভবনের সামনে বিক্ষোভ করা শুরু করেন তিনি। সুইডেন সরকার যেন ২০১৫ সালের প্যারিস সম্মেলনে বিশ্বের শীর্ষ নেতাদের আলোচনায় ঠিক হওয়া সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কার্বন নির্গমন নিয়ন্ত্রণ করার বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়, সেলক্ষ্যে বিক্ষোভ করে গ্রেটা।
‘স্কুল স্ট্রাইক ফর ক্লাইমেট’ লেখা একটি লেখা সম্বলিত ব্যানার নিয়ে তিনি পার্লামেন্টের সামনে দাঁড়ান এবং শুক্রবার স্কুল ফাঁকি দেয়া শুরু করেন। বিশ্বব্যাপী ছাত্র-ছাত্রীদেরকেও তিনি আহ্বান জানান যেন তারা তার সাথে প্রতিবাদে যোগ দেন।
সোশ্যাল মিডিয়ায় তার বিক্ষোভ ভাইরাল হয় এবং তার প্রতিবাদের কারণ দিনদিন জনপ্রিয়তা পায়।
বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা গ্রেটার প্রতিবাদের আদলে প্রতিবাদ শুরু করে। সোশ্যাল মিডিয়া হ্যাশট্যাগ ফ্রাইডেজফরফিউচার জনপ্রিয় হয়।
২০১৮ সালের ডিসেম্বর মাসের মধ্যে অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, বেলজিয়াম, যুক্তরাষ্ট্র এবং জাপানের ২০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী গ্রেটার প্রতি সমর্থন জানিয়ে নিজ নিজ দেশে বিক্ষোভ প্রকাশ করেন।
ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ট্রেনে ভ্রমণ করে বিক্ষোভ কর্মসূচিতে যোগ দেন তিনি।
গ্রেটার অর্জন কী?
পুরো ২০১৯ সালই ক্যাম্পেইনিং করতে, জলবায়ু বিষয়ক সম্মেলনে যোগ দিতে এবং বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে যোগ দিতে গ্রেটা স্কুল থেকে ছুটি নেন।
২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের জলবায়ু বিষয়ক সম্মেলনে বক্তব্য দিতে নিউ ইয়র্কে যান গ্রেটা। যুক্তরাষ্ট্র যাওয়ার জন্য বিমানে উঠতে অস্বীকৃতি জানান তিনি, কারণ বিমানের জ্বালানি পুড়ালে পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ে।
গ্রেটা নিউইয়র্কে একটি রেসিং ইয়টে করে যান, যেই যাত্রায় তার সময় লাগে দুই সপ্তাহ।
নিউইয়র্কে পৌঁছানোর পর বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে মানুষ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সীমিত করার উদ্দেশ্যে প্রতিবাদ করে।
জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলনে গ্রেটা রাজনীতিবিদদের তীব্র সমালোচনা করে বলেন, তারা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রশ্নের উত্তরের জন্য তরুণদের ওপর নির্ভর করছেন।
গ্রেটা বলেন, তোমাদের কত দুঃসাহস। আমার এখানে থাকা উচিত না। আমার স্কুলে থাকার কথা। তবুও তোমরা আমাদের মত তরুণদের ওপর নির্ভরশীল হচ্ছো কীভাবে!
টাইম ম্যাগাজিনের বর্ষসেরা ব্যক্তিত্ব হিসেবে ঘোষণা করা হয় তাকে।
গ্রেটা কী চায়?
গ্রেটার মতে, বিশ্বের শক্তিশালী দেশগুলোর সরকাররা এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো কার্বন নিঃসরণ সীমিত রাখার জন্য যথেষ্ট দ্রুততার সাথে পদক্ষেপ নিচ্ছে না।
তরুণদের ভবিষ্যত ঝুঁকির মধ্যে ফেলার জন্যও নেতাদের সমালোচনা করেন গ্রেটা।
প্রাথমিক ধাপে তার বিক্ষোভ ছিল সুইডিশ সরকারের জলবায়ু বিষয়ক লক্ষ্যমাত্রার বিপক্ষে। তবে বিশ্বজুড়ে শিক্ষার্থীদের প্রতি তিনি আহ্বান জানান যেন তারা তাদের নিজ নিজ দেশে একই ধরণের দাবি তুলে প্রতিবাদ শুরু করে।
খ্যাতি বাড়ার সাথে সাথে বিশ্বের নানা দেশের সরকারের কাছে বিভিন্ন ধরনের দাবি তুলে ধরেন।
২০১৯ সালে জাতিসংঘের জলবায়ু বিষয়ক সম্মেলন, এ বছরে দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের সম্মেলন ছাড়াও বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বক্তব্য দেন তিনি। এরপরত তিনি নোবেল শান্তি পুরস্কারেও মনোনীত হয়েছিলেন।
সূত্র: বিবিসি
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


