
মৌলিকভাবে, যখন নিসাব পূর্ণ হয় এবং জাকাতের বছর অতিক্রান্ত হয়, তখন জাকাত ফরজ হয়ে যায়। সেই জাকাত কোরআনে নির্ধারিত হকদার শ্রেণির এক বা একাধিকের কাছে পৌঁছে দেওয়া আবশ্যক। জাকাতের মূল উদ্দেশ্য হলো, অধিকারপ্রাপ্ত মানুষের হক দ্রুত আদায় করা।
এই কারণেই ফকিহরা সাধারণত বলেছেন, জাকাত ফরজ ও সংগৃহীত হওয়ার পর অযথা বিলম্ব না করে তা বিতরণ করা উচিত। বৈধ কারণ ছাড়া বিলম্ব করা অনুচিত। কারণ, একবার জাকাতের অর্থ পৃথক করা হলে, কার্যত তা হকদারদের সম্পদে পরিণত হয়।
তবে এর অর্থ এই নয় যে প্রতিটি ক্ষেত্রে তা মুহূর্তের মধ্যেই পৌঁছে দিতে হবে। ইসলামী শরিয়ত বাস্তবতা, প্রশাসনিক প্রক্রিয়া ও সংগঠনিক প্রয়োজনকে স্বীকৃতি দেয়। যখন জাকাত একটি বৈধ প্রতিনিধি সংস্থার কাছে অর্পিত হয়, যেমন—একটি নিবন্ধিত সংস্থা যা সংগ্রহ ও বিতরণের অনুমোদিত দায়িত্ব পালন করে, তখন সেই সংস্থা শরিয়তসম্মতভাবে হকদারদের কাছে অর্থ পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব গ্রহণ করে।
এ অবস্থায়, যদি সংস্থা যথাযথ নিয়ম মেনে দায়িত্ব পালন করে, তবে দাতার জাকাত আদায় হয়ে যায়, অর্থ সংস্থার নিকট সঠিকভাবে জমা ও নির্ধারিত খাতে বরাদ্দ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই।
কৌশলগত প্রয়োজনের কারণে এক চন্দ্র বছর পর্যন্ত জাকাত সংরক্ষণ করার প্রসঙ্গে বলা যায়, যদি এতে প্রকৃত হকদারদের স্পষ্ট উপকার সাধিত হয়, তবে তা বৈধ হতে পারে। যেমন—মাসিক ভাতা, ধাপে ধাপে সহায়তা, অথবা দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা কর্মসূচি, যদি এসব পদ্ধতি দরিদ্রদের জীবনে অধিক স্থিতি ও কল্যাণ নিশ্চিত করে, তাহলে অনেক সমকালীন আলিম এ ধরনের পরিকল্পনাকে অনুমোদন করেছেন; শর্ত এই যে নির্দিষ্ট কিছু বিধান মানা হবে।
যাকাতের অর্থ সম্পূর্ণরূপে হকদারদের জন্য নির্ধারিত থাকতে হবে; তা অন্য কোনো প্রকল্পে স্থানান্তর করা যাবে না; এবং অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকির মধ্যে ফেলা যাবে না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, বিলম্ব যেন স্বীকৃত কল্যাণের জন্য হয় এবং জরুরি প্রয়োজনগ্রস্ত মানুষের কোনো ক্ষতির কারণ না হয়।
জাকাতের উদ্দেশ্য কষ্ট লাঘব করা। অতএব, যদি অসহায় ও ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের জন্য তাত্ক্ষণিক সহায়তা প্রয়োজন হয়, তবে প্রশাসনিক সুবিধা বা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ওপর তাদের প্রয়োজনকেই অগ্রাধিকার দিতে হবে।
প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, যাচাই-বাছাই, প্রকৃত হকদার চিহ্নিতকরণ, লজিস্টিক প্রস্তুতি কিংবা আন্তর্জাতিক অর্থ স্থানান্তরের মতো কারণে যে স্বল্পমেয়াদি বিলম্ব ঘটে তা সাধারণভাবে অনুমোদনযোগ্য। উদাহরণস্বরূপ—নির্দিষ্ট কোনো গ্রামে সুষ্ঠুভাবে বণ্টনের ব্যবস্থা করতে যদি প্রায় তিন সপ্তাহ সময় লাগে, তবে তা স্বাভাবিক কার্যপরিধির মধ্যেই গণ্য হবে, শর্ত এই যে সেখানে এমন কেউ না থাকেন যিনি তাত্ক্ষণিক বিপদের মধ্যে আছেন এবং জরুরি সহায়তার প্রয়োজন আছে।
একইভাবে, বৈধ ব্যাংকিং বা অর্থ প্রেরণের প্রক্রিয়াগত বিলম্বও জাকাতকে বাতিল করে না; যতক্ষণ পর্যন্ত অর্থ নিরাপদভাবে সংরক্ষিত থাকে, নির্ধারিত খাতেই বরাদ্দ থাকে এবং ওই সময়ের মধ্যে অন্য কোনো কাজে ব্যবহার না করা হয়।
যা অবশ্যই পরিহার করতে হবে তা হলো, স্পষ্ট কল্যাণ ছাড়া অযৌক্তিক বিলম্ব, অথবা এমনভাবে জাকাত আটকে রাখা যাতে হকদাররা প্রয়োজনের মুহূর্তে বঞ্চিত হন। জাকাত নির্দিষ্ট শ্রেণির মানুষের প্রাপ্য অধিকার; আর তা ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা সংস্থা কেবল একজন আমানতদার। তাদের কর্তব্য হলো, এই অধিকার যথাযথভাবে পৌঁছে দেওয়া।
অতএব মূলনীতি হলো ভারসাম্য : বণ্টনে দ্রুততা, আর পরিকল্পনায় প্রজ্ঞা। যদি সুসংগঠিত ও কাঠামোবদ্ধ সহায়তা জাকাতের দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা বৃদ্ধি করে এবং উপকারভোগীদের জীবনে বাস্তব উন্নতি আনে, তবে তা শরিয়তের সীমারেখার ভেতরে গ্রহণযোগ্য। কিন্তু যখনই দুঃখ-কষ্ট প্রতিরোধে তাত্ক্ষণিক বণ্টন প্রয়োজন হবে, তখন সেটিই অগ্রাধিকার পাবে।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


