
জুমবাংলা ডেস্ক : টিকটক মডেল করার লোভ দেখিয়ে ভারতে নারী পাচার চক্রের সদস্যদের গ্রেপ্তার অভিযান অব্যাহত রেখেছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। প্রাথমিক অনুসন্ধানে দেশি-বিদেশিসহ এই চক্রের আন্তত ৫০ জনের তথ্য পেয়েছে র্যাব।
এ ধারাবাহিকতায় ঝিনাইদহ, যশোর ও অভয়নগরে অভিযান চালিয়ে ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে চক্রের শীর্ষ নেতা আশরাফুল ইসলাম ওরফে ‘বস’ রাফি ও তার ঘনিষ্ঠ শাহিদা আক্তার, আরমান শেখ ও মোহাম্মদ ইসমাইলকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব। সোমবার (৩১ মে) রাতে গ্রেপ্তার করা হয় তাদের।
আজ মঙ্গলবার কাওরানবাজারে র্যাবের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে টিকটক সম্পর্কিত এমন আরো অনেক তথ্য জানানো হয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত র্যাবের লিগ্যাল এ্যান্ড মিডিয়া শাখার পরিচালক কমান্ডার এ কে খন্দকার আল মঈন বলেন, চক্রের অন্যতম সদস্য রাফি আন্তর্জাতিক নারীপাচার চক্রের অন্যতম মূলহোতা। সংক্ষিপ্ত ভিডিও শেয়ারিং প্ল্যাটফর্ম টিকটকে মডেল করার লোভ দেখিয়ে ভারতে নারী পাচারের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
জিজ্ঞাসাবাদে রাফির তথ্যের বরাত দিয়ে র্যাব জানায়, গ্রেপ্তার হওয়ার আগে বিভিন্ন সময়ে রাফি ও তার সহযোগীরা রাজধানীর উপকণ্ঠে টঙ্গীতে ফাইভ স্টার আদলে একটি হোটেলে টিকটক গ্রুপের পুল পার্টির আয়োজন করত। এই পুল পার্টিতে উঠতি বয়সের তরুণীরা অংশ নিত। তারা টিকটক ভিডিও প্রদর্শন করার পর যোগ্যতা অনুযায়ী তাদের মধ্য থেকে পাচারের জন্য বাছাই করত। ঠিক একইভাবে দেশের আরো অনেক জেলা শহরের পার্টিতে টিকটক মডেল করার লোভ দেখিয়ে তরুণীদের কৌশলে হাত করত তারা। পুল পার্টি থেকে এ পর্যন্ত কয়েক শ তরুণীকে পাচার করা হয়েছে প্রতিবেশী ভারত ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত র্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া শাখার পরিচালক কমান্ডার এ কে খন্দকার আল মঈন বলেন, তরুণীদের বৈধ বা অবৈধ উভয় পথেই সীমান্ত অতিক্রম করানো হতো। তারা কয়েকটি ধাপে পাচারের কাজটি করত। প্রথমত ভুক্তভোগীদের তারা দেশের বিভিন্ন স্থান হতে সীমান্তবর্তী জেলা যেমন, যশোর, সাতক্ষীরা, ঝিনাইদহ নিয়ে আসত। তারপর তাদরেকে সীমান্তবর্তী বিভিন্ন সেফ হাউজে নিয়ে যেত। সেখান থেকে সুবিধাজনক সময়ে লাইন ম্যানের মাধ্যমে অরক্ষিত এলাকা দিয়ে সীমান্ত অতিক্রম করাত। পরে পার্শ্ববর্তী দেশের এজেন্টরা তাদেরকে রিসিভ করে সীমান্ত নিকটবর্তী সেফ হাউজে রাখত। সুবিধাজনক সময়ে কলকাতার সেফ হাউজে পাঠাত। পরে কলকাতা থেকে বেঙ্গালুরু। বেঙ্গালুরু পৌঁছানোর পর রাফি তাদের রিসিভ করে বিভিন্ন সেফ হাউজে নিয়ে যেত। পরে ব্ল্যাকমেইল ও মাদকাসক্তে অভ্যস্ত করে অমানবিক নির্যাতন করত। বাংলাদেশ থেকে ভারতে পাচার করার সময় বিভিন্ন সেইফ হাউজগুলোতে তাদের জোরপূর্বক মাদক সেবন এবং পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য করা হতো। সেইফ হাউজগুলো হতে তাদের ১০/১৫ দিনের জন্য বিভিন্ন খদ্দেরের কাছে সরবরাহ করা হতো। এক্ষেত্রে পরিবহন ও খদ্দেরের নির্ধারিত স্থানে অবস্থানের জন্য বিশেষ নিরাপত্তা নেওয়া হতো।
র্যাব জানায়, গ্রেপ্তার রাফির শিক্ষাগত যোগ্যতা অষ্টম শ্রেণি। ব্যাঙ্গালুরে ট্যাক্সি চালক, হোটেলে রিসোর্ট কর্মচারী ও কাপড়ের ব্যবসা করত। পরে সে সেখানেই তামিল ভাষা রপ্ত করেছিল। একপর্যায়ে সে রিং লিডার হয়ে যায়। দুই বছর আগে তার সঙ্গে টিকটক হৃদয়ের পরিচয় ঘটে। সে টিকটক হৃদয়ের মাধ্যমে প্রাপ্ত প্রায় অর্ধ শতাধিক তরুণীকে পার্শ্ববর্তী দেশে পাচার করেছে। টিকটক হৃদয় ছাড়াও তার অন্যান্য এজেন্ট রয়েছে। পার্শ্ববর্তী দেশের এজেন্ট তাকে খদ্দের প্রতি ১০/১৫ হাজার টাকা কমিশন দিত।
ব্যাঙ্গালুরে যে তরুণীকে নির্যাতন করা হয়েছে সে মূলত দুজন বাংলাদেশি নারীকে দেশে পালিয়ে আসতে সহযোগিতা করায় তাকে নির্মম অত্যাচার করা হয়। তাকেও বলা হয়, সে যদি পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে তাহলে ভিডিওটি তার স্বজনদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে।
র্যাব আরো জানায়, রাফির অন্যতম নারী সহযোগী ম্যাডাম সাহিদা। তার তিনটি বিয়ে হয়েছে। সে এবং তার দুই মেয়ে সোনিয়া ও তানিয়া পাচার চক্রের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও সক্রিয়ভাবে জড়িত। সোনিয়া ও তানিয়া বর্তমানে ব্যাঙ্গালুরে অবস্থান করছে। ভাইরাল ভিডিওতে তানিয়াকে সহযোগী হিসেবে দেখা গেছে। সাহিদা দেশে একাধিক সেফ হাউস পরিচালনা করছে। সাহিদা দীর্ঘ ১০ বছর ধরে এই পেশায় জড়িত। এছাড়া গ্রেপ্তার ইসমাইল ও আরমান শেখ মূলহোতা বস রাফির বিশেষ সহযোগী হিসেবে পাচার তদারকি করে থাকে। তারাও নারী পাচারের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
র্যাব জানায়, নারীদেরকে প্রতারণামূলক ফাঁদে ফেলে এবং প্রলোভনে ফেলা এ চক্রের দেশি-বিদেশিসহ প্রায় ৫০ জন জড়িত রয়েছে। চক্রের মূলহোতা বস রাফি এবং গ্রেপ্তারকৃত অন্যান্য সদস্যরা তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী। এছাড়া ভারতে গ্রেপ্তার টিকটক হৃদয় তার অন্যতম সরবরাহকারী বা এজেন্ট। এছাড়া তার আরো এজেন্ট বা সরবরাহকারী রয়েছে।
প্রসঙ্গত, সম্প্রতি বাংলাদেশের এক তরুণীকে ভারতে বিবস্ত্র করে নির্যাতনের ভিডিও ভাইরাল হয় ও শারীরিক নির্যাতনের সময় ২২ বছরের ওই তরুণীকে দলবেঁধে ধর্ষণও করার তথ্য প্রকাশ পায়। ওই ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে ভারতের ব্যাঙ্গালুরু পুলিশ এ পর্যন্ত ছয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে। এদের মধ্যে হৃদয়সহ দুজন পালানোর সময় গুলিবিদ্ধ হয়েছে বলে জানিয়েছে ভারতের পুলিশ। তারা সবাই বাংলাদেশি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে। তবে এদের কাছে ভ্রমণ সংক্রান্ত কোনো বৈধ কাগজপত্র এখনো পাওয়া যায়নি।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


