করোনার টিকার তথ্য জানতে চাইলেই যেন আঁতকে ওঠেন স্বাস্থ্য প্রশাসনের একেকজন কর্মকর্তা। রীতিমতো ঠেলাঠেলি অবস্থা শুরু হয়ে যায়। একজন আরেকজনকে দেখিয়ে দেন। চলে এড়িয়ে যাওয়ার সব রকম চেষ্টা। এর মধ্য দিয়ে ফুটে ওঠে ‘লুকোচুরি’ ভাব। কেউ কেউ গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বললেও কখনো নিজের নাম প্রকাশ না করার জন্য বারবার অনুরোধ করেন, আবার কখনো নাম প্রকাশ করলেও বক্তব্য দেন একেবারেই দায়সারা বা অনেকটা গুরুত্বহীন পর্যায়ের। আর নতুন দায়িত্ব নেওয়া স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব এ বিষয়ে একেবারেই মুখ বন্ধ করে রেখেছেন বা ফোনও ধরেন না বেশির ভাগ সময়। এমনকি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের টিকাসংক্রান্ত পরিকল্পনার দায়িত্বে থাকা কেউ কেউও এড়িয়ে চলেন।
বিশেষজ্ঞরা জানান, টিকার পথচলায় অল্প এগিয়েই যখন সংকটে হোঁচট খেতে হয়েছে, প্রায় ১৪ লাখ মানুষ প্রথম ডোজ নেওয়ার পর দ্বিতীয় ডোজ নেওয়ার ক্ষেত্রে পড়েছেন অন্ধকার পরিস্থিতিতে কিংবা অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকাপ্রাপ্তি নিয়ে নানামুখী অনিশ্চয়তা ঘিরে ধরেছে, তখন মানুষের ভরসা শুধুই সঠিক তথ্যটি জানা।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজীর আহম্মেদ বলেন, মানুষ সংকট মেনে নিয়ে কিংবা দীর্ঘসূত্রতা ঘটলেও জানতে চায়—সরকার কখন কী করছে বা কতটা চেষ্টা করছে, কিভাবে চেষ্টা করছে। কিন্তু এই জানার ক্ষেত্র বন্ধ থাকলেই মানুষের মধ্যে অনিশ্চয়তা, সন্দেহ, বিভ্রান্তির ডালপালা ছড়ায়। সেদিকে নজর রেখেই তখন গণমাধ্যম সর্বাত্মক চেষ্টা চালায় যেকোনোভাবেই হোক মানুষকে তথ্য দিয়ে আশ্বস্ত করতে বা ভরসা জোগাতে। কিন্তু গণমাধ্যমেরও তথ্যপ্রাপ্তি বাধাগ্রস্ত হলে সামগ্রিকভাবেই বিপদ বেড়ে যায়।
ওই বিশেষজ্ঞ বলেন, টিকার ক্ষেত্রে তথ্যের স্বচ্ছতা যত বেশি থাকবে, ততই মানুষ বেশি আশ্বস্ত হবে। এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও গোপনীয়তার বিষয়গুলো প্রকাশ না করলেও যতটা সম্ভব টিকা কেনাকাটায় দরদাম কিংবা কবে টিকা পাওয়া যাবে না যাবে, সে বিষয়গুলো সব মানুষেরই সময়মতো জানার অধিকার আছে। সরকারের পক্ষ থেকে স্বতঃপ্রণোদিতভাবেই তা জানানো উচিত।
এমন পরিস্থিতির দিকে নজর রেখেই গত ১৭ মে কভিড-১৯ সংক্রান্ত জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সভাপতি অধ্যাপক মোহাম্মদ সহিদুল্লাহর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় বলা হয়, বৈশ্বিক সংকট এবং প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী টিকা না পাওয়ার কারণে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষের দ্বিতীয় ডোজের টিকাপ্রাপ্তি অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। সরকার এ বিষয়ে আন্তরিক ও সক্রিয়ভাবে প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে এবং বিকল্প অনুসন্ধান করছে। তবে এর পাশাপাশি স্বাস্থ্য বিভাগকেও এ ব্যাপারে টিকার পরিস্থিতি ও সরকারের বিকল্প পরিকল্পনা মানুষকে অবহিতকরণের ব্যবস্থা করতে হবে।
এমনকি কভিড-১৯ সংক্রান্ত জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সদস্য ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘শুধু সাধারণ মানুষই নয়, অনেক সময় আমরাও অনেক তথ্যই জানতে পারি না বা জানানো হয় না; যেটা আমাদের পরামর্শ দেওয়ার জন্যই জানা উচিত বা জরুরি। এ ছাড়া টিকাসংক্রান্ত বৈজ্ঞানিক বিষয়গুলো বাদ দিয়ে বাকি সব তথ্যই সাধারণ মানুষকে জানানো যায়। তাতে সরকারের ওপরই মানুষের আস্থা বাড়ে। আর তথ্য না জানালে মানুষ মনে করে লুকোচুরি করা হচ্ছে কিংবা স্বচ্ছতার অভাব আছে। অন্তত টিকার ক্ষেত্রে সেটা আশা করা যায় না।’
তিনি বলেন, একটি ক্রয় বা চুক্তিপ্রক্রিয়ায় সবটাই তো আর রাষ্ট্রীয় গোপনীয় বিষয় থাকতে পারে না। টিকার দাম কত পড়েছে, কবে নাগাদ টিকা পাওয়া যাবে কিংবা না পেলেও কেন পাওয়া যাচ্ছে না সেটা তো খোলামেলা মানুষকে জানানোই যায়। এগুলো জানতে পারলে মানুষের ধৈর্য ধরতে সহায়ক হয়। এদিকে গতকাল বুধবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বুলেটিনের অন্যতম মুখপাত্র ও অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের লাইন ডিরেক্টর অধ্যাপক ডা. রোবেদ আমীন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এক টিকার প্রথম ডোজ দেওয়ার পর দ্বিতীয় ডোজ অন্য টিকা দেওয়ার ব্যাপারে আমরা দেশের টিকাসংক্রান্ত কারিগরি উপদেষ্টা গ্রুপ নাইটেগের কাছে পরামর্শ চেয়েছি। তারা যা পরামর্শ দেবে আমরা সে অনুসারে পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করব।’
স্পেনের ৪০০ মানুষের ওপর একটি গবেষণার উদ্ধৃতি তুলে ধরে তিনি বলেন, সেখানে প্রথম ডোজ এক টিকা থেকে দিয়ে এবং দ্বিতীয় ডোজ অন্য টিকা দেওয়ার পর ভালোই ফল পাওয়া গেছে। – কালের কণ্ঠ
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।