জাহিদ ইকবাল: নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রাজনীতির সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষায় পড়ে নির্বাচনের পর। কারণ ভোটের আগে বলা কথা জনআস্থার বিনিয়োগ, আর ভোটের পর তার বাস্তবায়নই রাজনৈতিক সততার প্রমাণ।

এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে সংসদ সদস্যরা সরকারি প্লট ও ট্যাক্স–ফ্রি গাড়ি গ্রহণ করবেন না—এমন ঘোষণা রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি ব্যতিক্রমী বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমান প্রকাশ্য সমাবেশে যে অঙ্গীকার করেছেন, তা বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের সংসদীয় চর্চায় নতুন মানদণ্ড তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশে সংসদ সদস্যদের জন্য বরাদ্দ সুবিধার মধ্যে রয়েছে সরকারি প্লট, শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানির সুযোগ, বিভিন্ন ভাতা ও লজিস্টিক সাপোর্ট। আইনগত কাঠামোর মধ্যেই এসব সুবিধা দেওয়া হয়, তবে নৈতিক প্রশ্নও সমানভাবে ওঠে—জনপ্রতিনিধিত্ব কি সেবার জায়গা, নাকি সুবিধা ভোগের? যখন দেশের বড় অংশের মানুষ আবাসন, চিকিৎসা ও শিক্ষার মৌলিক নিশ্চয়তা থেকে বঞ্চিত, তখন জনপ্রতিনিধিদের অতিরিক্ত আর্থিক সুবিধা গ্রহণ নিয়ে জনমনে অস্বস্তি তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক নির্বাচনে বড় দলগুলোর অধিকাংশ প্রার্থীই উচ্চ সম্পদশালী। কোটিপতি ও শতকোটি টাকার মালিক প্রার্থীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। অর্থাৎ বাস্তবতা হলো—সংসদে প্রবেশকারী অনেকেরই ব্যক্তিগত আর্থিক সক্ষমতা আছে। সে বিবেচনায় রাষ্ট্রীয় বিশেষ সুবিধা স্বেচ্ছায় বর্জন করলে তা কার্যত রাষ্ট্রের ওপর চাপ কমাবে এবং নৈতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করবে। এতে জনগণের কাছে একটি বার্তা যাবে—রাজনীতি মানে শুধু ক্ষমতা নয়, আত্মসংযমও।
অন্যদিকে অপেক্ষাকৃত নতুন ও ছোট রাজনৈতিক শক্তির অনেক প্রার্থীর সম্পদ তুলনামূলক কম—যা তাদের হলফনামায় প্রতিফলিত। ফলে প্রশ্ন আসে, সুবিধা বর্জনের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হলে কি সমান্তরালভাবে একটি স্বচ্ছ সহায়ক কাঠামোও দরকার? যেমন—যাতায়াত, গবেষণা সহায়তা, নির্বাচনী এলাকার অফিস পরিচালনার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সাপোর্ট—যা ব্যক্তিগত সম্পদের ওপর নির্ভর করবে না, বরং প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নিয়ন্ত্রিত হবে। এতে সুবিধা নয়, কার্যকারিতা হবে মূল লক্ষ্য।
রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন সাধারণত আইন দিয়ে শুরু হলেও বিশ্বাসযোগ্যতা আসে আচরণ দিয়ে। যদি কোনো দল স্বেচ্ছায় সুবিধা ত্যাগের দৃষ্টান্ত স্থাপন করে এবং তা ধারাবাহিকভাবে মেনে চলে, তবে অন্য দলগুলোর ওপরও নৈতিক চাপ তৈরি হয়।
প্রতিযোগিতামূলক রাজনীতিতে তখন “কে কত সুবিধা নিল” নয়—“কে কতটা ছাড় দিল”—সেটিও আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়াতে পারে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে “সুবিধাভোগী রাজনীতি” নিয়ে সমালোচনা আছে—পদ মানেই সুযোগ, ক্ষমতা মানেই প্রাপ্তি—এমন ধারণা গভীরভাবে গেঁথে গেছে। এই চক্র ভাঙতে হলে প্রতীকী কিন্তু দৃশ্যমান পদক্ষেপ দরকার। সরকারি প্লট ও ট্যাক্স–ফ্রি গাড়ি বর্জনের মতো সিদ্ধান্ত ঠিক তেমনই একটি প্রতীকী পদক্ষেপ, যা বড় ধরনের সংস্কার আলোচনার দরজা খুলে দিতে পারে।
জনগণের প্রত্যাশা এখন স্পষ্ট—নতুন সংসদ শুধু নতুন মুখ নয়, নতুন আচরণও দেখাবে। স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, ব্যয়ের সংযম এবং নৈতিক নেতৃত্ব—এই চার স্তম্ভের ওপর দাঁড়ালে তবেই পরিবর্তনের রাজনীতি বিশ্বাসযোগ্য হবে। অঙ্গীকার বাস্তবায়িত হলে তা কেবল একটি দলের কৃতিত্ব হবে না; বরং বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রায় একটি মানদণ্ড হয়ে থাকবে।
আরও পড়ুনঃ
এমন নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রত্যাশাই আজকের বাংলাদেশের—যেখানে নেতৃত্ব মানে আগে ত্যাগ, পরে প্রাপ্তি; আগে জবাবদিহি, পরে সুবিধা। জনগণের কষ্টার্জিত অর্থের প্রতি সংবেদনশীলতা, রাষ্ট্রীয় সম্পদের ব্যবহারে সংযম এবং প্রতিশ্রুতির বাস্তব প্রয়োগ—এই তিনের সমন্বয়েই গড়ে উঠতে পারে আস্থাভিত্তিক গণতন্ত্র। ঘোষণা নয়, বাস্তবায়নই হবে শেষ কথা—আর সেখান থেকেই শুরু হতে পারে দায়িত্বশীল ও নৈতিক রাজনীতির নতুন অধ্যায়।
লেখক পরিচিত: সিনিয়র সাংবাদিক ও সভাপতি, বাংলাদেশ অনলাইন জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


