বিশ্বকাপ ফাইনাল। ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ৯০ মিনিট। যেখানে একটি ম্যাচ বদলে দিতে পারে ইতিহাস, জন্ম দিতে পারে কিংবদন্তির। ১৯৩০ সালে যাত্রা শুরুর পর থেকে বিশ্বকাপ ফাইনাল শুধু চ্যাম্পিয়নই তৈরি করেনি, উপহার দিয়েছে অসংখ্য নাটকীয়, রহস্যময় এবং অবিশ্বাস্য ঘটনার।

দুই বল দিয়ে ফাইনাল খেলা, দুই দেশের হয়ে ফাইনাল খেলা ফুটবলার, মারাকানাজোর ট্র্যাজেডি কিংবা ফাইনালের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা অদ্ভুত সব অভিশাপ। এসব গল্প আজও ফুটবলপ্রেমীদের বিস্মিত করে। চলুন জেনে নেওয়া যাক বিশ্বকাপ ফাইনালের ইতিহাসের ১০টি সবচেয়ে অবিশ্বাস্য ঘটনা।
১. প্রথম বিশ্বকাপ ফাইনালে ব্যবহার হয়েছিল দুই বল
১৯৩০ সালের প্রথম বিশ্বকাপ ফাইনালে মুখোমুখি হয় আর্জেন্টিনা ও উরুগুয়ে। কিন্তু ম্যাচ শুরুর আগেই দেখা দেয় অদ্ভুত সমস্যা। দুই দেশই নিজেদের তৈরি বলে খেলতে চেয়েছিল, কেউই প্রতিপক্ষের বল ব্যবহার করতে রাজি ছিল না।
শেষ পর্যন্ত বেলজিয়ান রেফারি জন ল্যাঙ্গেনাস মাঠে দুটি বল নিয়ে আসেন। টসের মাধ্যমে ঠিক হয় প্রথমার্ধে আর্জেন্টিনার বল এবং দ্বিতীয়ার্ধে উরুগুয়ের বল ব্যবহার হবে। প্রথমার্ধ শেষে আর্জেন্টিনা ২-১ গোলে এগিয়ে থাকলেও, দ্বিতীয়ার্ধে উরুগুয়ে নিজেদের বল দিয়ে দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তন করে ৪-২ ব্যবধানে জিতে প্রথম বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়।
২. একই খেলোয়াড় দুই দেশের হয়ে খেলেছেন টানা দুই বিশ্বকাপ ফাইনাল
আর্জেন্টিনায় জন্ম নেওয়া লুইস মন্টি বিশ্বকাপ ইতিহাসের একমাত্র ফুটবলার, যিনি দুই ভিন্ন দেশের হয়ে টানা দুই বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলেছেন। ১৯৩০ সালে তিনি আর্জেন্টিনার হয়ে ফাইনাল খেলেন। পরে ইতালির নাগরিকত্ব নিয়ে ১৯৩৪ সালে ইতালির হয়ে আবারও ফাইনাল খেলেন এবং শিরোপা জেতেন। মজার বিষয়, দুই ফাইনালেই তাকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছিল। ১৯৩০ সালে উরুগুয়ের সমর্থকদের কাছ থেকে এবং ১৯৩৪ সালে ইতালির স্বৈরশাসক বেনিতো মুসোলিনির চাপের মুখে।
৩. ব্রাজিলকে ট্রফি দিতে নেমে পড়েছিলেন ফিফা সভাপতি, কিন্তু চ্যাম্পিয়ন হয়ে যায় উরুগুয়ে
১৯৫০ সালের ঐতিহাসিক মারাকানাজো ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে নাটকীয় ঘটনার একটি। ব্রাজিল এগিয়ে থাকায় ফিফা সভাপতি জুলে রিমে আগেভাগেই ট্রফি নিয়ে মাঠে নেমে পড়েন। কিন্তু মাঠে পৌঁছানোর আগেই উরুগুয়ে ম্যাচ ঘুরিয়ে ২-১ ব্যবধানে জিতে যায়। মাঠে নেমে কান্নায় ভেঙে পড়া ব্রাজিলিয়ানদের দেখে রিমে কিছুক্ষণ বুঝতেই পারেননি আসলে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে কে।
৪. সুইডেনের দোকান থেকে কেনা জার্সি পরে সুইডেনের বিপক্ষেই ফাইনাল খেলে প্রথম বিশ্বকাপ জেতে ব্রাজিল
১৯৫৮ সালের ফাইনালে স্বাগতিক সুইডেন ও ব্রাজিল। দুই দলই হলুদ জার্সি পরতো। লটারিতে সুইডেন নিজেদের জার্সি রাখার অধিকার পায়। বিকল্প নীল জার্সি অনুশীলনে ব্যবহার করে ফেলায় ব্রাজিলের কর্মকর্তারা বাধ্য হয়ে সুইডেনের স্থানীয় একটি দোকান থেকে নতুন নীল জার্সি কিনে আনেন। পরে তাতে হাতে সেলাই করে নম্বর ও জাতীয় প্রতীক লাগানো হয়। সেই জার্সি পরেই পেলের জাদুতে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ জেতে ব্রাজিল।
৫. বিতর্কিত গোলের লাইন্সম্যানের নামে রয়েছে একটি স্টেডিয়াম
১৯৬৬ সালের ফাইনালে জিওফ হার্স্টের শট ক্রসবারে লেগে গোললাইন ছুঁয়ে ফিরে আসে। আজও বিতর্ক রয়েছে বলটি পুরোপুরি গোললাইন অতিক্রম করেছিল কি না।
তবুও আজারবাইজানের লাইন্সম্যান তোফিক বাহরামভ গোলের সংকেত দেন। সেই সিদ্ধান্তে এগিয়ে গিয়ে শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ জিতে ইংল্যান্ড। পরে বাকুর জাতীয় স্টেডিয়ামের নাম রাখা হয় তোফিক বাহরামভ রিপাবলিকান স্টেডিয়াম।
৬. জার্মানি বলে স্পর্শ করার আগেই ০-১ ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ে ফাইনালে
১৯৭৪ সালের ফাইনালে নেদারল্যান্ডস এমনভাবে ম্যাচ শুরু করে যে জার্মানির কোনো খেলোয়াড় বল স্পর্শ করার আগেই পেনাল্টি আদায় করে। মাত্র ৮৮ সেকেন্ডে জোহান নেস্কেন্স গোল করে বিশ্বকাপ ফাইনালের ইতিহাসে দ্রুততম গোলের রেকর্ড গড়েন। তবে শেষ পর্যন্ত স্বাগতিক পশ্চিম জার্মানি ২-১ ব্যবধানে ম্যাচ জিতে শিরোপা ঘরে তোলে।
৭. না খেলেই বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছেন যারা
বিশ্বকাপে এমন অনেক খেলোয়াড় আছেন, যারা একটি মিনিটও না খেলেই বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছেন। এই তালিকায় আছেন আর্জেন্টিনার ড্যানিয়েল পাসারেলা, ইতালির ফ্রাঙ্কো বারেসি এবং ব্রাজিলের কিংবদন্তি রোনালদো নাজারিও। ১৯৯৪ সালে মাত্র ১৭ বছর বয়সে রোনালদো দলে থাকলেও মাঠে নামার সুযোগ পাননি। তবে ২০০২ সালে তিনি টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়ে ব্রাজিলকে বিশ্বকাপ জেতান।
৮. ফাইনালের মাঝেই রেফারিকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘আমরা কি ফাইনাল খেলছি?’
২০১৪ সালের ফাইনালে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে খেলতে নেমে জার্মান মিডফিল্ডার ক্রিস্টোফ ক্রামার মাথায় গুরুতর আঘাত পান। কনকাশনের কারণে তিনি ম্যাচ চলাকালেই রেফারি নিকোলা রিজোলিকে জিজ্ঞেস করেন, ‘আমরা কি বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলছি?’ পরে তাকে বদলি করা হয়। হাসপাতাল থেকে ফিরে তিনি জানান, পুরো ম্যাচের কোনো স্মৃতিই তার মনে নেই।
৯. বিশ্বকাপ ফাইনালের সঙ্গে জড়িয়ে আছে তিনটি অদ্ভুত অভিশাপ
বিশ্বকাপ ইতিহাসে তিনটি কুসংস্কার বা অভিশাপ বারবার সত্যি হয়েছে—
• বিদেশি কোচ কখনো বিশ্বকাপ জেতাতে পারেননি।
• যে বছর ব্যালন ডি’অর জেতেন, সেই বছর ওই খেলোয়াড় বিশ্বকাপ জেতেন না।
• ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে এক নম্বরে থেকে টুর্নামেন্ট শুরু করা দল কখনো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়নি।
এর পাশাপাশি আরও দুটি কম পরিচিত কুসংস্কার রয়েছে — ৬০ বছরের বেশি বয়সী কোনো কোচ বিশ্বকাপ জেতেননি এবং গ্রুপ পর্বে কোনো গোল না খাওয়া দলও কখনো শিরোপা জিততে পারেনি।
আরও পড়ুন : ২০২৬ সালে যে ৮ দক্ষতা আপনাকে সফলতা এনে দেবে
১০. বিশ্বকাপ ট্রফি স্পর্শ করা শুধু কুসংস্কার নয়, ফিফার নিয়মও
অনেক ফুটবলার বিশ্বাস করেন, ফাইনালের আগে বিশ্বকাপ ট্রফি স্পর্শ করলে দুর্ভাগ্য নেমে আসে। তবে এটি শুধু কুসংস্কার নয়। ফিফার নিরাপত্তা প্রটোকল অনুযায়ী, আসল বিশ্বকাপ ট্রফি খালি হাতে স্পর্শ করার অধিকার কেবল বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ফুটবলার, কোনো রাষ্ট্রপ্রধান অথবা ফিফা সভাপতির রয়েছে। তাই ফাইনালের আগে বেশিরভাগ খেলোয়াড় ট্রফির দিকে তাকাতেও সতর্ক থাকেন।
প্রায় এক শতাব্দীর ইতিহাসে বিশ্বকাপ ফাইনাল শুধু শিরোপা নির্ধারণ করেনি, লিখেছে অসংখ্য অবিশ্বাস্য গল্প। এসব ঘটনাই প্রমাণ করে, ফুটবল শুধু একটি খেলা নয়। এটি ইতিহাস, আবেগ, নাটক এবং বিস্ময়ের এক অনন্ত অধ্যায়।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।



