
আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে বিপুল ভোটার উপস্থিতির সম্ভাবনা থাকলেও ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা, ভয়ভীতি ও জালিয়াতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ভোটাররা।
দেশব্যাপী পরিচালিত একটি জরিপে এই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তারা।
এছাড়া, জরিপটিতে পরিচয় বা ধর্মীয় ইস্যুর চেয়ে দুর্নীতি ও অর্থনৈতিক সংকটকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি নেতৃত্বের ক্ষেত্রে জনদরদী ও কার্যকর নেতার পক্ষে ভোটারদের ঝুঁকতে দেখা গেছে।
‘আনকাভারিং দ্য পাবলিক পালস: আ নেশনওয়াইড সার্ভে’ শীর্ষক একটি গবেষণা প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। এতে দেশব্যাপী ১১ হাজার ৩৮ জন ভোটারের ওপর পরিচালিত জরিপের ফলাফল তুলে ধরা হয়। গবেষণাটি যৌথভাবে পরিচালনা করেছে বেসরকারি ও অলাভজনক সংস্থা কমিউনিকেশন অ্যান্ড রিসার্চ ফাউন্ডেশন (সিআরএফ) এবং বাংলাদেশ ইলেকশন অ্যান্ড পাবলিক ওপিনিয়ন স্টাডিজ (বিইপিওএস)।
রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) এক সংবাদ সম্মেলনে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। এতে ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে ভোটারদের অংশগ্রহণ, অগ্রাধিকার ও রাজনৈতিক আচরণ বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন গবেষক ও সিআরএফ-এর স্ট্র্যাটেজিক কো-অর্ডিনেটর জাকারিয়া পলাশ। সংবাদ সম্মেলনে বিশেষজ্ঞ আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব রিডিং-এর অর্থনীতি বিভাগের ভিজিটিং প্রফেসর ড. এম. নিয়াজ আসাদুল্লাহ এবং শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. সাহাবুল হক।
জরিপের ফলাফলে দেখা যায়, ৯০ শতাংশের বেশি ভোটার আসন্ন নির্বাচনে ভোট দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। মাত্র প্রায় ৮ শতাংশ ভোটার এখনো অনিশ্চিত বা ভোটে অংশ নেওয়ার পরিকল্পনা করছেন না। লিঙ্গ, বয়স, শিক্ষা বা বসবাসের স্থানভেদে ভোটদানের আগ্রহে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য পাওয়া যায়নি।
নির্বাচনী ইস্যুর ক্ষেত্রে দুর্নীতিকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন ভোটাররা। জরিপে অংশ নেওয়া ৬৭ দশমিক ৩ শতাংশ ভোটার দুর্নীতিকে প্রধান ইস্যু হিসেবে উল্লেখ করেছেন, যেখানে ধর্মীয় বিষয়কে গুরুত্ব দিয়েছেন মাত্র ৩৫ দশমিক ৯ শতাংশ ভোটার। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হওয়া সত্ত্বেও ধর্মীয় ইস্যু তুলনামূলকভাবে কম অগ্রাধিকার পেয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
নেতৃত্বের প্রশ্নে ভোটাররা ব্যক্তিগত ক্যারিশমার চেয়ে মানুষের কথা ভাবেন এমন এবং কার্যকর নেতৃত্ব দিতে সক্ষম নেতাদের প্রতি বেশি আস্থা প্রকাশ করেছেন। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে এবং সব বয়সী ভোটারদের মধ্যেই এই প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে।
রাজনৈতিক তথ্য পাওয়ার ক্ষেত্রে ভোটাররা টেলিভিশন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—উভয়ের ওপর নির্ভর করছেন। জরিপে দেখা যায়, অধিকাংশ ভোটার একটি মাত্র উৎসের পরিবর্তে একাধিক মাধ্যম থেকে তথ্য গ্রহণ করেন।
তবে নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগও স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে প্রতিবেদনে। ভোটারদের মতে, প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার চেয়ে ভোটকেন্দ্রের সরেজমিন নিরাপত্তা তাদের বেশি উদ্বিগ্ন করছে। ভয়ভীতি প্রদর্শন, জালিয়াতি ও ব্যালট দখলের আশঙ্কা সব দলের ভোটারদের মধ্যেই সাধারণ উদ্বেগ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
দলীয় পছন্দের ক্ষেত্রেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। জরিপ অনুযায়ী, আগে আওয়ামী লীগকে ভোট দেওয়া প্রায় ৪৮ শতাংশ ভোটার এখন বিএনপির প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। অন্যদিকে, ২০০৮ সালের পর প্রথমবার ভোট দিতে যাওয়া ভোটারদের মধ্যে ৩৭ দশমিক ৪ শতাংশ জামায়াতকে পছন্দ করছেন।
ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্তে প্রার্থীর ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ বলে উঠে এসেছে জরিপে। প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ভোটার জানিয়েছেন, তারা ভোট দেওয়ার সময় প্রার্থীকে বিবেচনায় নেন। এর মধ্যে ৩০ দশমিক ২ শতাংশ শুধুমাত্র প্রার্থীকে ভিত্তি করে ভোট দেওয়ার কথা বলেছেন, আর ৩৩ দশমিক ২ শতাংশ ভোটার প্রার্থী ও দল—উভয় বিষয়ই বিবেচনা করেন।
প্রতিবেদনটি সাতটি অংশে বিভক্ত এবং এতে জরিপ পরিচালনার ক্ষেত্রে স্ট্রাটিফাইড র্যান্ডম স্যাম্পলিং পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে। ২০২৫ সালের ২০ নভেম্বর থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দুই ধাপে মাঠপর্যায়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে এসব তথ্য সংগ্রহ করা হয়।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


