আহত সাংবাদিক ফরিদ। ছবি সংগৃহীত
Advertisement

জুমবাংলা ডেস্ক : টেকনাফ থানার সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাশের ক্রসফায়ার বাণিজ্য ও নানা অপকর্মের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ করাই কাল হয়েছে স্থানীয় সাংবাদিক ফরিদের। অমানুষিক নির্যাতন ও বর্বরতা চালানো হয় ফরিদ ও তার পরিবার-পরিজনের ওপর।

মিথ্যা মামলার বোঝা নিয়ে দীর্ঘ এক বছর ধরে জেলের ঘানি টানছেন সাংবাদিক ফরিদুল মোস্তফা খান। আর অসহায়ভাবে খেয়ে না খেয়ে চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্য দিয়ে দিনাতিপাত করছেন তার তিন সন্তান, স্ত্রী ও অবিবাহিত দুই বোনসহ বৃদ্ধ মা।

ফরিদুল মোস্তফার স্ত্রী হাসিনা আক্তার বলেন, ঢাকার মিরপুর থানা, কক্সবাজার মডেল থানা ও টেকনাফ থানার পুলিশকে ব্যবহার করে আমার স্বামী ফরিদুল মোস্তফার ওপর নির্যাতন, নিপীড়ন ও বর্বরতা চালায় ওসি প্রদীপ কুমার দাশ।

২০১৯ সালের মাঝামাঝি সময়ে ‘টেকনাফ থানায় টাকা না পেলে ক্রসফায়ার দিচ্ছে ওসি প্রদীপ’- শিরোনামে আমার স্বামী ফরিদুল মোস্তফার সম্পাদিত স্থানীয় দৈনিক ‘কক্সবাজার বাণী’র অনলাইন ভার্সনে এবং ‘জনতারবাণী’ শিরোনামের অনলাইন নিইজ পোর্টালে সংবাদটি প্রকাশ করা হয়।

এরপরই তিনি প্রদীপের রোষানলে পড়েন। পরে টেকনাফ থানার নিজের লোককে বাদী করে ওসি প্রদীপ কুমার দাশের পরিকল্পনা মতে আমার স্বামীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি মামলা করেন। এরপর থেকেই পুলিশি নির্যাতনের ভয়ে পরিবারের লোকজন নিয়ে পালিয়ে বেড়ান তিনি।

জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বরাবর আবেদন করলেও শেষরক্ষা হয়নি আমাদের। ঢাকা মিরপুরের একটি বাড়িতে পরিবার-পরিজন নিয়ে আত্মগোপনে ছিলাম আমরা।

তখন ওসি প্রদীপ মিরপুর থানার পুলিশকে ব্যবহার করে গত বছরের ২১ সেপ্টেম্বর রাতে ওই বাসা থেকে আমার স্বামীকে গ্রেফতার করে টেকনাফে নিয়ে যান।

সাংবাদিক ফরিদের স্ত্রী হাসিনা আক্তার আরও জানান, ফরিদকে টেকনাফ নিয়ে যাওয়ার পর চলে অকথ্য নির্যাতন ও বর্বরতা। তার চোখ উপড়ে ফেলার চেষ্টা করা হয়।

পরে তাকে কক্সবাজার মডেল থানার সহযোগিতায় কক্সবাজার শহরের সমিতিপাড়ায় আমাদের কুঁড়েঘরে অভিযানের নামে নাটক সাজিয়ে উদ্ধার করা হয় ইয়াবা, অস্ত্র ও বিদেশি মদের বোতল।

পুলিশ বাদী হয়ে করে পৃথক তিনটি মামলা। পাঠানো হয় জেলে। এরপর থেকে তিনি কারাগারেই আছেন। প্রদীপের নির্যাতনে বর্তমানে চোখ হারানোর অবস্থা তার। দেয়া হয়নি কোনো ভালো চিকিৎসা সেবা। যার কারণে চোখের আলো নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ঘটনার সময় স্থানীয় কোনো সাংবাদিক বিষয়টি নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করেননি। কারণ ফরিদের বর্বরতা দেখে ওসির বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস পাননি কেউ।

তার বিরুদ্ধে সংবাদ করলেই নির্যাতন করত এ ওসি। ওসি প্রদীপের ক্ষোভের শিকার হয়ে ১১ মাস ধরে ৬টি মিথ্যা মামলা মাথায় নিয়ে কক্সবাজার কারাগারে আছেন ফরিদ।

স্ত্রীর দাবি, ফরিদের চোখে মরিচের গুঁড়া দিয়ে নির্যাতন করা হয়। পাশাপাশি পায়খানার রাস্তায় দেয়া হয় মরিচ ও গরম পানি। প্লাস দিয়ে উপড়ে নেয়া হয় দুই হাতের সব নখ। ভেঙে দেয়া হয় হাত-পা ও আঙুলের জয়েন্ট।

এছাড়া ফরিদকে নিয়ে কথিত অভিযানে গিয়ে কক্সবাজার শহরের সমিতিপাড়ায় বাড়ি থেকে গুলিসহ ২টি অস্ত্র, ৪ হাজার পিস ইয়াবা ও বিদেশি মদের বোতল উদ্ধার দেখায় টেকনাফ থানার ওসি প্রদীপের নেতৃত্বে কক্সবাজার মডেল থানা পুলিশ।

ফরিদুল মোস্তফার স্ত্রী হাসিনা আক্তার বলেন, গত বছরের ২১ সেপ্টেম্বর মিরপুর-১ নম্বর সেকশনের শাহ আলীবাগের প্রতীক হাসনাহেনা নামক বাসায় অভিযান চালিয়ে কথিত চাঁদাবাজির মামলায় ফরিদকে গ্রেফতার করা হয়।

মিরপুর মডেল থানা পুলিশের সহায়তায় টেকনাফ ও কক্সবাজার থানা পুলিশ এ অভিযানে অংশ নেয়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মাদক সিন্ডিকেট, কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের ঘুষ, দুর্নীতিসহ টেকনাফ থানা ও কক্সবাজার থানার ওসির বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে সংবাদ প্রকাশ করে আসছিলেন।

এ ঘটনার প্রতিশোধ নিতে কঠোর গোপনীয়তার মধ্যে গত বছরের ৩০ জুন সাংবাদিক ফরিদুল মোস্তফা খানের বিরুদ্ধে টেকনাফ থানায় কয়েকজনকে বাদী সাজিয়ে চাঁদাবাজির মামলা করা হয় ৩টি।

পুলিশি নির্যাতন ও সাজানো মামলা থেকে বাঁচতে ও নিজের পরিবারের জানমালের নিরাপত্তা চেয়ে প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, পুলিশের মহাপরিদর্শক বরাবর গত বছরে ২৮ জুলাই পৃথকভাবে মানবিক আবেদন করেন ফরিদুল মোস্তফা খান।

এসব আবেদন করার পরেও ওসি প্রদীপের কাছ থেকে বাঁচতে পারেননি তিনি।

ফরিদের স্ত্রী হাসিনা আক্তার আরও জানান, কক্সবাজার শহরের অভিযানের সময় আমার দুই ঘুমন্ত ননদ সালমা খানম ও ফাতেমা খানমকে ওসি প্রদীপ কুমারের নেতৃত্বে কক্সবাজার মডেল থানা ও টেকনাফ থানা পুলিশ শারীরিক নির্যাতন ও শ্লীলতাহানি করে।

এমনকি প্রদীপ নিজেই তাদের লাথি মারে এবং চুল ধরে টানাহেঁছড়া করে। পাশাপাশি আটকের ভয়ভীতি দেখিয়ে রাতের অন্ধকারে ঘর থেকে বের করে দেয়া হয় তাদের।

এরপর নাটকীয়ভাবে ২টি অস্ত্র, ৪ হাজার ইয়াবা ও ১১ বোতল বিদেশি মদ উদ্ধার দেখায় পুলিশ। তখন পুলিশ বাসায় তালা লাগিয়ে দিয়ে চলে যায়।

ওই সাজানো অভিযানের ঘটনা দেখিয়ে একই দিন কক্সবাজার সদর থানায় অস্ত্র, ইয়াবা ও বিদেশি মদ উদ্ধার দেখিয়ে পুলিশ বাদী হয়ে পৃথক ৩টি মামলা করে।

সাজানো মামলায় গ্রেফতারের ৩ দিন পর সন্ধ্যা ৭টায় কঠোর গোপনীয়তায় গুরুতর জখম অবস্থায় বিনা চিকিৎসায় তাকে আদালতে হাজির করা হয়। আদালত তাকে জেলহাজতে প্রেরণের আদেশ দেন।

ফরিদুল মোস্তফার বৃদ্ধ মা বেগম বাহার জানান, ওসি প্রদীপ ও মডেল থানার তৎকালীন ওসি ফরিদুল আলম খন্দকারের নেতৃত্বে সেই সময়ে আমার ছেলের ওপর লোমহর্ষক নিপীড়ন কখনও ভোলার নয়।

আমার (ফরিদের মা) ছেলে নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে পানি খেতে চেয়েছিল। তখন প্রদীপ টয়লেটের কমোড থেকে পানি নিয়ে তাকে খাওয়ায়। দুনিয়ার মানুষ এ বিচার না করলেও আল্লাহ একদিন তার সঠিক বিচার করবে। আমার বিচার আমি আল্লাহকে দিয়েছি।

ফরিদের মা আরও জানান, বর্তমানে ফরিদ প্রায় এক বছর মিথ্যা মামলায় কারাগারে আছে। সেখানে সে কিছুটা সুস্থ হলেও এখনও একটি হাত ও একটি পা নাড়াচাড়া করতে পারে না। চোখে স্পষ্ট করে কিছু দেখতে পায় না। বাম পাশের চোখটি বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, ফরিদের বিরুদ্ধে চলমান ৬টি মামলার মধ্যে বিদেশি মদের বোতল উদ্ধার মামলাটিতে জামিনে আছেন। বাকি ৫টি মামলা এখনও জামিন শুনানিতে আছে।  সূত্র : যুগান্তর

Zoom Bangla News
Zoom Bangla News
inews.zoombangla.com
Follow

Follow Zoom Bangla News On Google

Open the Google follow page and tap the checkmark option to receive more updates from Zoom Bangla News in your Google news feed.

Follow Zoom Bangla News On Google

Sabina Sami is a Journalist. He is the Sub-Editor of Zoom Bangla News. He is also a good writer.