বাংলাদেশ ২০৩০ সালের মধ্যে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমাতে একটি স্পষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। সর্বশেষ জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদান অনুযায়ী, নির্ধারিত Business as Usual পরিস্থিতির তুলনায় ৬.৭৩ শতাংশ নির্গমন কমানোর প্রতিশ্রুতি রয়েছে, যা পরিমাণে প্রায় ২৭.৫৬ মিলিয়ন টন কার্বন ডাই-অক্সাইড সমতুল্য। আন্তর্জাতিক সহায়তা পেলে এই কমানোর পরিমাণ ২১.৮৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব, যা প্রায় ৮৯.৪৭ মিলিয়ন টনের সমান। এই লক্ষ্য পূরণের প্রধান দায়ভার বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের ওপর নির্ভরশীল হলেও, প্রাকৃতিক কার্বন শোষণ ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে একটি কৌশলগত সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের পরিকল্পনাকে কেবল একটি প্রতীকী কর্মসূচি হিসেবে দেখলে ভুল হবে। বৃহৎ আকারের বনায়ন প্রকল্প জাতীয় কার্বন ভারসাম্যে ধীর কিন্তু স্থিতিশীল অবদান রাখে। একটি পূর্ণবয়স্ক গাছ বছরে গড়ে ১৫ থেকে ২২ কেজি পর্যন্ত কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করতে সক্ষম বলে বৈজ্ঞানিকভাবে গ্রহণযোগ্য হিসাব রয়েছে। তবে এই শোষণ ক্ষমতা অর্জনের আগে গাছকে কয়েক বছর ধরে সুস্থভাবে বেড়ে উঠতে হয়।
যদি ২৫ কোটি রোপিত চারার একটি বড় অংশ টিকে থাকে এবং দীর্ঘমেয়াদে পরিণত গাছে রূপ নেয়, তাহলে বছরে কয়েক মিলিয়ন টন কার্বন শোষণের সক্ষমতা তৈরি হতে পারে। এটি ২০৩০ সালের নির্ধারিত আনকন্ডিশনাল লক্ষ্যমাত্রা একাই পূরণ করবে এমন নয়, কিন্তু একটি সহায়ক প্রাকৃতিক ভান্ডার হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব। ১৫ থেকে ২০ বছরের ধারাবাহিক সবুজায়ন একটি স্থায়ী কার্বন স্টক তৈরি করতে পারে, যা দেশের নির্গমন বৃদ্ধির প্রবণতার বিপরীতে ভারসাম্য রক্ষায় সহায়ক হবে।

উপকূলীয় অঞ্চলে ম্যানগ্রোভ সম্প্রসারণ হলে এই অবদান আরও তাৎপর্যপূর্ণ হতে পারে। ম্যানগ্রোভ বন কেবল ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের সময় সুরক্ষা দেয় না, বরং মাটির গভীরে দীর্ঘমেয়াদে কার্বন ধরে রাখে। একই সঙ্গে নদীতীর, বাঁধসংলগ্ন এলাকা ও উঁচু জমিতে পরিকল্পিত বনায়ন মাটি ক্ষয় রোধ এবং ভূমির স্থিতিশীলতা বাড়াতে পারে।
নগরাঞ্চলেও বৃক্ষরোপণের প্রভাব বহুমাত্রিক। ঘনবসতিপূর্ণ শহরে গাছের ছায়া ও সবুজ আচ্ছাদন বৃদ্ধি স্থানীয় তাপমাত্রা কমাতে সাহায্য করে। তাপপ্রবাহের সময় কুলিং চাহিদা কিছুটা হ্রাস পেলে বিদ্যুৎ ব্যবহারের চাপও কমতে পারে। ফলে বনায়ন সরাসরি কার্বন শোষণের পাশাপাশি পরোক্ষভাবে নির্গমন কমানোর কাঠামোতেও ভূমিকা রাখে।
তবে প্রকৃত সাফল্যের শর্ত হলো রোপণের পর টেকসই ব্যবস্থাপনা। মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা বলছে, প্রথম দুই বছর গাছের জন্য সবচেয়ে স্পর্শকাতর সময়। নিয়মিত পরিচর্যা, আগাছা নিয়ন্ত্রণ, সুরক্ষা ব্যবস্থা এবং ক্ষতিগ্রস্ত চারা প্রতিস্থাপন নিশ্চিত না হলে সারভাইভাল রেট দ্রুত কমে যায়। গাছ যখন নির্দিষ্ট উচ্চতা ও কাণ্ডের দৃঢ়তা অর্জন করে, তখনই তার কার্বন শোষণ ক্ষমতা স্থিতিশীলভাবে বৃদ্ধি পায়।
বাংলাদেশের নির্গমন বাস্তবতা বিবেচনায় জ্বালানি খাতই এখনো প্রধান উৎস। তাই বৃক্ষরোপণকে এনার্জি ট্রানজিশনের বিকল্প হিসেবে নয়, বরং সহায়ক প্রাকৃতিক সমাধান হিসেবে দেখা উচিত। নবায়নযোগ্য জ্বালানি, দক্ষ বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা ও শিল্পখাতের নির্গমন নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি একটি বৃহৎ ও টেকসই বনভিত্তিক কার্বন ভান্ডার তৈরি হলে জাতীয় জলবায়ু কৌশল আরও শক্ত ভিত্তি পাবে।
২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি তাই তাৎক্ষণিক ফলের প্রতিশ্রুতি নয়; এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ। ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে আগামী দুই দশকে দেশের সবুজ আচ্ছাদন দৃশ্যমানভাবে বাড়তে পারে। জীববৈচিত্র্য পুনরুদ্ধার, উপকূল সুরক্ষা, নগর পরিবেশ উন্নয়ন এবং কার্বন ভারসাম্য রক্ষায় এটি একটি কৌশলগত স্তম্ভ হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশের NDC লক্ষ্য পূরণে পথ এখনো দীর্ঘ। তবে প্রাকৃতিক সমাধানকে পরিকল্পিতভাবে যুক্ত করা গেলে জাতীয় কার্বন হ্রাস কাঠামো আরও বাস্তবসম্মত ও বহুমাত্রিক হয়ে উঠবে। ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের উদ্যোগ সেই বৃহত্তর কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে উঠতে পারে, যদি তা ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়িত ও সংরক্ষিত হয়।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


