দেশে আবারও বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে পাইকারি ও খুচরা—উভয় পর্যায়ে মূল্য সমন্বয়ের একটি প্রস্তাব সোমবার (৪ মে) বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)-এ পাঠানো হয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগের পক্ষ থেকে। প্রস্তাব অনুযায়ী, পাইকারি পর্যায়ে প্রতি ইউনিটে প্রায় ১ টাকা ২০ পয়সা থেকে দেড় টাকা পর্যন্ত এবং খুচরা পর্যায়ে সর্বোচ্চ ১ টাকা ৩৮ পয়সা পর্যন্ত দাম বাড়তে পারে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, গ্রাহকের বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণ অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন হারে মূল্য নির্ধারণ করা হবে। তবে স্বল্প ব্যবহারের লাইফলাইন গ্রাহকদের এই বাড়তি চাপের বাইরে রাখার কথা বলা হয়েছে।
সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, বিদ্যুৎ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোই বিইআরসির কাছে মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব জমা দেয়। ইতোমধ্যে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)সহ বিভিন্ন বিতরণ সংস্থা প্রস্তাব তৈরির কাজ শুরু করেছে। বিদ্যুৎ বিভাগের নির্দেশনা অনুসারে এসব প্রস্তাব তৈরি করা হচ্ছে এবং চলতি সপ্তাহের মধ্যেই তা কমিশনে জমা পড়তে পারে। বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ সংবাদ মাধ্যমকে জানিয়েছেন, প্রস্তাব পাওয়ার পর আইন অনুযায়ী তা পর্যালোচনা করা হবে।
পিডিবির চেয়ারম্যান রেজাউল করিমও জানান, তারা প্রস্তাব চূড়ান্ত করার কাজ করছেন। পরে কমিশন বিধি মেনে গণশুনানি আয়োজন করে নতুন দর ঘোষণা করবে। সবকিছু ঠিক থাকলে জুনের শুরু থেকেই নতুন মূল্য কার্যকর হতে পারে বলে জানা গেছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের মতে, জ্বালানি আমদানির ব্যয় বৃদ্ধি, উৎপাদন খরচ ও বিক্রয়মূল্যের বড় ব্যবধান এবং ভর্তুকির চাপ মোকাবিলার জন্যই এই মূল্যবৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর আগে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বাড়তি ব্যয় সামাল দিতে অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়। সেই কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতেই এ প্রস্তাব এসেছে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, মাসে ৪০০ ইউনিটের বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রে প্রতি ইউনিটে প্রায় ১ টাকা ৩৮ পয়সা পর্যন্ত দাম বাড়তে পারে। অন্যদিকে ৭৬ থেকে ৪০০ ইউনিট ব্যবহারকারীদের জন্য এই বৃদ্ধি প্রায় ৭০ পয়সা হতে পারে। তবে ৭০ ইউনিট পর্যন্ত ব্যবহারকারী বা লাইফলাইন গ্রাহকদের আপাতত এ বাড়তি চাপ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
বর্তমানে দেশে প্রায় ৪ কোটি ৯৭ লাখ বিদ্যুৎ গ্রাহক রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৩৭ শতাংশ গ্রাহক সরাসরি মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব অনুভব করতে পারেন। বাকি ৬৩ শতাংশ স্বল্প ব্যবহারকারী তুলনামূলকভাবে কম প্রভাবিত হবেন। তবে শিল্প ও বাণিজ্যিক খাতে বিদ্যুতের খরচ বাড়লে তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত পণ্য ও সেবার দামে পড়তে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। এতে একদিকে ভর্তুকির চাপ কিছুটা কমলেও অন্যদিকে উৎপাদন ব্যয় ও জীবনযাত্রার খরচ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বর্তমানে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে গড় খরচ গ্রাহকদের কাছ থেকে আদায়কৃত দামের তুলনায় প্রায় ৫ টাকা ৫০ পয়সা বেশি। এই ব্যবধানের কারণে ভর্তুকির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিপিডিবির সম্ভাব্য ঘাটতি প্রায় ৫৬ হাজার ৪৭৫ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির উচ্চমূল্যের কারণে অতিরিক্ত আরও প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকির প্রয়োজন হতে পারে। ইতোমধ্যে সরকার এ খাতে ৩৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে।
বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ব্যবহৃত এলএনজি, কয়লা ও তেলের বড় অংশ আমদানিনির্ভর। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে এসব জ্বালানির দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উৎপাদন ব্যয়ও বেড়ে যাচ্ছে।
এছাড়া অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র পুরোপুরি উৎপাদনে না থাকলেও চুক্তি অনুযায়ী ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ পরিশোধ করতে হচ্ছে। মেঘনাঘাট, আরপিসিএল-নোরিনকোর কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র এবং রূপসা ৮০০ মেগাওয়াট কেন্দ্রের মতো প্রকল্পগুলো এই আর্থিক চাপ আরও বাড়াচ্ছে।
২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে সর্বশেষ বিদ্যুতের খুচরা মূল্য গড়ে ৮ দশমিক ৫০ শতাংশ বাড়ানো হয়েছিল। তখন প্রতি ইউনিটের গড় খুচরা মূল্য নির্ধারণ করা হয় ৮ টাকা ৯৫ পয়সা এবং পাইকারি মূল্য ৫ দশমিক ০৭ শতাংশ বাড়িয়ে ৭ টাকা ৪ পয়সা করা হয়।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


