তারেক বিন ওমর : উচ্চ বেতনের লোভ দেখিয়ে বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি জ্ঞানসম্পন্ন তরুণদের কম্বোডিয়ায় পাচার করছে একাধিক আন্তর্জাতিক দালালচক্র। মাসে এক থেকে দেড় লাখ টাকা আয়ের প্রলোভন দেখিয়ে দেশটিতে নিয়ে যাওয়ার পর এসব তরুণকে ২ থেকে ৫ হাজার ডলারে বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে চাইনিজ মাফিয়াদের নিয়ন্ত্রিত ‘সাইবার স্ক্যামিং কম্পাউন্ডে’। সেখানে বাধ্য করা হচ্ছে আন্তর্জাতিক ডিজিটাল প্রতারণার অংশ হতে। অস্বীকৃতি জানালেই কপালে জুটছে ইলেকট্রিক শক, অনাহার ও পৈশাচিক নির্যাতন।

কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ও বেসরকারি সংস্থার (এনজিও) সহায়তায় সম্প্রতি কম্বোডিয়ার এসব টর্চার সেল থেকে মুক্ত হয়ে দেশে ফিরেছেন প্রায় ২৫০ জন বাংলাদেশি তরুণ। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আগামী দুই মাসের মধ্যে আরও প্রায় তিন হাজার বাংলাদেশিকে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া চলছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, বিদেশে ভালো চাকরির প্রলোভন দিয়ে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (BMET) ছাড়পত্র নিয়েই তাদের কম্বোডিয়ায় পাঠানো হয়েছিল।
যেভাবে পাতা হয় ফাঁদ ও বিক্রি প্রক্রিয়া
অনুসন্ধানে জানা যায়, চীন, কম্বোডিয়া, থাইল্যান্ড ও মিয়ানমারের অন্ধকার ডিজিটাল অপরাধ জগতের মাফিয়াদের সঙ্গে সরাসরি যোগসাজশ রয়েছে বাংলাদেশি দালালদের। শরীয়তপুরের এক ভুক্তভোগী জানান, স্থানীয় দালাল ৫ লাখ টাকার বিনিময়ে তাকে কম্বোডিয়ায় ৬০-৭০ হাজার টাকা বেতনের চাকরির প্রস্তাব দেয়। গত বছরের ৫ জুন ঢাকা থেকে মালয়েশিয়া হয়ে তিনি কম্বোডিয়ার নমপেন শহরে পৌঁছান। সেখান থেকে তাকে সিয়ানোক শহরের একটি বিশাল স্ক্যামিং কলোনিতে নিয়ে এক চাইনিজ বসের কাছে ২,০৮৭ ডলারে বিক্রি করে দেওয়া হয়। বিক্রির পর দেশি দালালরা সব ধরনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়।
জামালপুরের আরেক ভুক্তভোগীকে সাড়ে ৫ লাখ টাকা খরচে কম্বোডিয়া এনে ভিয়েতনাম সীমান্তের কাছাকাছি চেরাইথন এলাকার একটি কম্পাউন্ডে ৩ হাজার ডলারে বিক্রি করা হয়।
টর্চার সেলের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা
ভুক্তভোগীরা জানান, ৫০-৬০ তলার বিশাল সব ভবনে হাজার হাজার তরুণ-তরুণীকে রেখে কম্পিউটার ও সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে স্ক্যামিং করতে বাধ্য করা হয়। জামালপুরের ওই ভুক্তভোগী কাজে আশানুরূপ পারফরম্যান্স না করায় তাকে একটি অন্ধকার টর্চার সেলে নিয়ে যাওয়া হয়। তিনি বলেন:
“৬ জন চাইনিজ মিলে আমাকে দফায় দফায় মারধর করে। এমন একটি ঘরে রাখা হয়েছিল যেখানে ঠিকমতো বসা বা ঘুমানো যায় না। টানা ১১ দিন আমাকে কোনো খাবার দেওয়া হয়নি, সারাক্ষণ গায়ে পানি ঢালা হতো। প্রায়ই মারধর ও ইলেকট্রিক শক দিয়ে আধমরা অবস্থায় আমাকে আরেকটি স্ক্যামার বসের কাছে ৫ হাজার ডলারে বিক্রি করা হয়।”
যেভাবে চলে ডিজিটাল স্ক্যামিং
পাচার হওয়া তরুণদের মূলত ইউরোপ ও আমেরিকার ধনী ব্যক্তিদের ফাঁদে ফেলার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
১. ফেক প্রোফাইল তৈরি : প্রথমে ইনস্টাগ্রাম বা ফেসবুকে ধনী ও বিলাসী মেয়েদের ছবি ব্যবহার করে ফেক অ্যাকাউন্ট খোলা হয়।
২. বন্ধুত্ব স্থাপন : এই অ্যাকাউন্টগুলো মূলত বাংলাদেশি তরুণরা চালালেও ওপাশ থেকে কোনো ধনী ব্যক্তি ভিডিও কল দিলে, সেন্টারে থাকা কোনো চীনা বা স্থানীয় তরুণীকে সামনে এনে কথা বলিয়ে বিশ্বাস অর্জন করা হয়।
৩. বিনিয়োগের নামে প্রতারণা : বন্ধুত্ব গভীর হলে চাইনিজ স্ক্যামারদের তৈরি করা ভুয়া বিনিয়োগ সাইটে টাকা খাটাতে প্রলোভন দেখানো হয়। শুরুতে কিছু মুনাফা দিলেও, বড় অঙ্কের টাকা বিনিয়োগ করার পরপরই পুরো অর্থ হাতিয়ে নিয়ে অ্যাকাউন্ট ব্লক করে দেওয়া হয়।
এটি ‘মানব পাচারের নতুন ধরন’: বিশেষজ্ঞ মতামত
এই ভয়াবহ চক্র নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান। তিনি বলেন,
“সাইবার স্ক্যামের এই জগৎটি মানব পাচারের এক নতুন ধরন। বাংলাদেশের প্রযুক্তিজ্ঞানসম্পন্ন এবং ইংরেজি জানা তরুণদের টার্গেট করে কয়েকটি দেশ মিলিয়ে এই আন্তর্জাতিক অপরাধ (Transnational Crime) ঘটানো হচ্ছে। উন্নত বিশ্বের নাগরিকরা এই ফাঁদে পড়ে বিলিয়ন ডলার খুইয়েছেন, যার কারণে বিশ্বজুড়েই আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি হয়েছে।”
আরও পড়ুন : ২০২৬ সালে যে ৮ দক্ষতা আপনাকে সফলতা এনে দেবে
তিনি আরও যোগ করেন, পররাষ্ট্র, স্বরাষ্ট্র এবং প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের এই বিষয়ে দ্রুত কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। কম্বোডিয়া, থাইল্যান্ড, মিয়ানমার বা ভিয়েতনামে যাওয়ার ছাড়পত্র দেওয়ার আগে নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ও কাজের সত্যতা কঠোরভাবে যাচাই-বাছাই করা প্রয়োজন। পাশাপাশি কেউ বিপদে পড়লে ইন্টারপোল ও আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে দ্রুত উদ্ধারের ব্যবস্থা করার তাগিদ দেন তিনি।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।



