ফুটবল ম্যাচ যদি হয় একটা দাবার বোর্ড, তবে লিওনেল স্কালোনি হলেন সেই গ্র্যান্ডমাস্টার যিনি প্রতিপক্ষের চাল দেখে নিজের ঘুঁটি সাজাতে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসেন। ফুটবল বিশ্ব তাকে চেনে একজন ‘ট্যাকটিক্যাল গিরগিটি’ হিসেবে, যিনি দলের কোনো নির্দিষ্ট বা অনমনীয় ফর্মুলা নেই। প্রতিপক্ষকে কাটাছেঁড়া করে ম্যাচের আবহাওয়া বুঝে নিজের রূপ বদলানোই স্কালোনীর আসল শক্তির জায়গা। কাতার বিশ্বকাপের সেই মহাকাব্যের পর, ২০২৬-এর উত্তর আমেরিকার মঞ্চেও স্কালোনীর এই রণকৌশল আর্জেন্টিনাকে করে তুলেছে অপ্রতিরোধ্য।

আর্জেন্টিনা অতিরিক্ত মেসির নির্ভর, যা জানালেন স্কালোনি
এবারের বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে স্কালোনি কোনো একটি নির্দিষ্ট ফর্মুলায় আটকে ছিলেন না। প্রথম দুই ম্যাচে তিনি দলকে খেলিয়েছেন প্রথাগত ৪-৩-৩ এবং ৪-৪-২ (ডায়মন্ড) ফর্মুলার এক দারুণ মিশ্রণে, যেখানে মাঝমাঠের দখল রাখা এবং উইং দিয়ে আক্রমণ শাণানোই ছিল মূল লক্ষ্য। কিন্তু গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে জর্ডানের বিপক্ষে যখন শেষ ৩২ নিশ্চিত হয়েই গিয়েছিল, তখন স্কালোনি এক ধাক্কায় বেঞ্চের শক্তি পরীক্ষা করতে দল ৪-৩-৩ ফর্মুলায় সাজান এবং শুরুর একাদশে ৯টি পরিবর্তন আনেন। ফল? ৩-১ গোলের অনায়াস জয়। কিন্তু নকআউটের মঞ্চে গল্পটা সম্পূর্ণ ভিন্ন।
গ্রুপ পর্বের সেই ফর্মুলা এবং স্কালোনীর দর্শন
স্কালোনীর ট্যাকটিক্সের মূল ভিত্তি হলো মিডফিল্ডের ‘ফ্লুইডিটি’ বা নমনীয়তা। এনজো ফার্নান্দেজ, আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার এবং রদ্রিগো ডি পলের ত্রয়ী মাঝমাঠের পুরো নিয়ন্ত্রণ নিজেদের পায়ে রাখে। গ্রুপ পর্বের ম্যাচগুলোতে স্কালোনীর ছক ছিল এমন:
বল পজেশন ও প্রেসিং: জর্ডানের বিপক্ষে ম্যাচেই আর্জেন্টিনার বল পজেশন ছিল ৭৩ শতাংশ। প্রতিপক্ষ বল কেড়ে নেওয়ার আগেই স্কালোনীর দল হাই-প্রেসিং করে বল পুনরুদ্ধার করেছে।
বাম প্রান্তের আক্রমণাত্মক জুটি: এই টুর্নামেন্টে স্কালোনীর সবচেয়ে বড় আবিষ্কার বাম প্রান্তে ফ্যাকুন্দো মেদিনা এবং থিয়াগো আলমাদার রসায়ন। এই জুটি প্রতিপক্ষের ডিফেন্সকে একপাশে টেনে নিয়ে অন্যপাশে লিওনেল মেসির জন্য জায়গা তৈরি করে দিচ্ছে।
কেপ ভার্দের ইস্পাতকঠিন দেয়াল ভাঙার ‘নতুন’ ফর্মুলা:
শুক্রবার মায়ামির হার্ড রক স্টেডিয়ামে কেপ ভার্দের মুখোমুখি হওয়ার আগে স্কালোনীর টেবিলে এখন মস্ত বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ, আফ্রিকার এই নবাগত দলটি এবারের বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় ‘সারপ্রাইজ প্যাকেজ’। তাদের রক্ষণাত্মক দেয়াল ভাঙতে স্কালোনি নকআউটের প্রথম ম্যাচে তার সবচেয়ে বিশ্বস্ত ৪-৪-২ ফর্মুলায় ফিরছেন।
মার্তিনেজ, মোলিনা, রোমেরো, লিসান্দ্রো, মেদিনা, ডি পল, ম্যাক অ্যালিস্টার, এনজো, আলমাদা, মেসি ও আলভারেজ থাকতে পারেন শুরুর একাদশে।
এই ফর্মুলার আসল রহস্য লুকিয়ে আছে আক্রমণভাগে। জর্ডান ম্যাচে লাউতারো মার্তিনেজ গোল করলেও, কেপ ভার্দের বিপক্ষে স্কালোনি মেসির সঙ্গী হিসেবে ফিরিয়ে আনছেন হুলিয়ান আলভারেজকে। গোড়ালির চোট কাটিয়ে পুরোপুরি ফিট হওয়া আলভারেজের নিরলস রানিং এবং ডিফেন্ডারদের ব্লক করার ক্ষমতা কেপ ভার্দের ডিফেন্সে ফাটল ধরাতে সাহায্য করবে। ৩৯ বছর বয়সী মেসি খেলবেন ‘ফ্রি রোল’-এ, অর্থাৎ তার ওপর পজিশনের কোনো বাধ্যবাধকতা থাকবে না।
মাঝমাঠে ডি পল ডান প্রান্ত সামলাবেন, আর থিয়াগো আলমাদা বাম প্রান্ত থেকে ভেতরে ঢুকে ‘ইনসাইড ফরোয়ার্ড’ হিসেবে খেলবেন, যা কেপ ভার্দের মিডফিল্ডের ব্লকিং জোনগুলোকে এলোমেলো করে দেবে।
ডিফেন্সে চোট কাটিয়ে ক্রিস্টিয়ান রোমেরোর প্রত্যাবর্তন স্কালোনিকে দিচ্ছে ৪-৪-২ ফর্মুলাতে আরও নিখুঁতভাবে কাউন্টার অ্যাটাক ঠেকানোর লাইসেন্স।
আরও পড়ুন : ২০২৬ সালে যে ৮ দক্ষতা আপনাকে সফলতা এনে দেবে
স্কালোনীর এই দাবাড়ুর চাল কেপ ভার্দের নীল হাঙরদের নীল নকশাকে চুরমার করতে পারবে কি না, তা দেখার জন্য এখন অধীর অপেক্ষায় পুরো ফুটবল বিশ্ব।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।



