জাহিদ ইকবাল: হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা শিক্ষা কাউন্সিলের চেয়ারম্যান পদে নতুন নিয়োগকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে চিকিৎসক সমাজের একটি বড় অংশের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ, প্রশ্ন ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রস্তাবিত প্রার্থী ডা. শফিকুর ইসলাম সরকারকে ঘিরে যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা এবং পেশাগত গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা চললেও দ্রুত নিয়োগ প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে সংশ্লিষ্ট মহল থেকে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উচ্চ পর্যায়ে ইতোমধ্যে এ নিয়োগের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। তবে চিকিৎসক, শিক্ষক ও সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের অভিযোগ—এই গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ প্রক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় স্বচ্ছতা, যাচাই-বাছাই এবং অংশীজনদের মতামত যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে না।
চিকিৎসকদের একটি অংশ দাবি করছেন, প্রস্তাবিত প্রার্থীর পেশাগত অবদান ও দীর্ঘমেয়াদি সম্পৃক্ততা প্রশ্নবিদ্ধ। তাদের মতে, গত প্রায় দেড় দশক ধরে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা শিক্ষা বা সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কার্যক্রমে তার দৃশ্যমান কোনো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেই। একই সঙ্গে তার শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে।

বর্তমান কাঠামো অনুযায়ী, বিএইচএমএস (BHMS) কোর্স একটি পূর্ণাঙ্গ একাডেমিক প্রোগ্রাম, যার মেয়াদ ৫ বছর এবং এর সঙ্গে ১ বছরের বাধ্যতামূলক ইন্টার্নশিপ যুক্ত—মোট ৬ বছরের প্রশিক্ষণ। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মানদণ্ডের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ যোগ্যতার কাউকে কাউন্সিলের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে বসানো হলে তা পুরো খাতের মান ও বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রায় ৬৬টি হোমিওপ্যাথিক কলেজ এবং ২টি ডিগ্রি প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের একাডেমিক মান নিয়ন্ত্রণ, কারিকুলাম উন্নয়ন এবং প্রশাসনিক তদারকির জন্য একটি দক্ষ, অভিজ্ঞ ও দূরদর্শী নেতৃত্ব অপরিহার্য।
এদিকে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক প্রভাব ও তদবিরের অভিযোগও সামনে এসেছে। চিকিৎসকদের ভাষ্য, দেশে প্রায় ৪৬ হাজার ডিপ্লোমা চিকিৎসক এবং আড়াই হাজারের বেশি বিএইচএমএস ডিগ্রিধারী চিকিৎসকের পেশাগত ভবিষ্যৎ অনেকাংশে এই কাউন্সিলের কার্যক্রমের ওপর নির্ভরশীল। ফলে এ ধরনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে বিতর্কিত নিয়োগ পুরো খাতকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলতে পারে।

এ প্রসঙ্গে সবচেয়ে জোরালো অবস্থান নিয়েছেন ডা. আরিফুর রহমান মোল্লা, যিনি সাবেক সরকার মনোনীত বোর্ড সদস্য, সাবেক সহ-সভাপতি (জাসাস জাতীয় নির্বাহী কমিটি) এবং সভাপতি—বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক দল কেন্দ্রীয় কমিটি। তিনি এই নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে প্রকাশ্যে উদ্বেগ জানিয়ে বলেন, “যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার প্রশ্ন এড়িয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তা পুরো হোমিওপ্যাথিক খাতের জন্য ক্ষতিকর হবে।”
জানা গেছে, ডা. আরিফুর রহমান মোল্লা ইতোমধ্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রীর সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাৎ করে চিকিৎসক সমাজের উদ্বেগ তুলে ধরেছেন। তিনি মন্ত্রীর কাছে অনুরোধ জানিয়েছেন, যেন চেয়ারম্যান নিয়োগের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা বজায় রাখা হয় এবং কোনো বিতর্কিত বা অযোগ্য ব্যক্তিকে দায়িত্ব না দেওয়া হয়।
তিনি আরও বলেন, দেশের হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা শিক্ষা ও সেবার মান উন্নয়নের জন্য একটি শক্তিশালী, দক্ষ ও অভিজ্ঞ নেতৃত্ব অপরিহার্য। এ ক্ষেত্রে কাউন্সিলের চেয়ারম্যান পদে এমন ব্যক্তিকে নিয়োগ দিতে হবে, যিনি একাডেমিক, পেশাগত এবং প্রশাসনিক—সবদিক থেকেই গ্রহণযোগ্য।
এদিকে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক ডা. সৈয়দ মোহাম্মদ মহিউদ্দিনও সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “চেয়ারম্যান নিয়োগের ক্ষেত্রে যদি যোগ্যতা ও সক্ষমতার বিষয়টি উপেক্ষিত হয়, তাহলে তা খাতটির জন্য নেতিবাচক বার্তা বহন করবে।”

তবে এ বিষয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কিংবা প্রস্তাবিত প্রার্থীর পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
চিকিৎসক সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, চেয়ারম্যান নিয়োগের আগে কাউন্সিলের রেজিস্ট্রার, বিভিন্ন কলেজের অধ্যক্ষ, অভিজ্ঞ শিক্ষক ও পেশাজীবীদের মতামত গ্রহণ করা জরুরি। একই সঙ্গে একটি নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ যাচাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রার্থীর যোগ্যতা মূল্যায়নের দাবি জানিয়েছেন তারা।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সত্যকে মিথ্যা, মিথ্যাকে সত্যে পরিণত করেন: শফিকুর রহমান
সংশ্লিষ্ট মহলের প্রত্যাশা, চলমান পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় সব ধরনের চাপ, প্রভাব ও বিতর্ক এড়িয়ে যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা এবং সর্বজনগ্রহণযোগ্যতার ভিত্তিতে চেয়ারম্যান নিয়োগ দিতে হবে। এতে দেশের হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা শিক্ষা ও সেবার মানোন্নয়ন নিশ্চিত হবে এবং খাতটি একটি সুসংগঠিত ও গতিশীল অবস্থানে পৌঁছাতে পারবে।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


