স্বল্প দূরত্বে যাতায়াতের সাশ্রয়ী মাধ্যম হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা ব্যাটারিচালিত রিকশা বা ই-রিকশা এবার কঠোর নিয়ন্ত্রণের আওতায় আসছে। সরকারি খসড়া নীতিমালায় চালককে বাংলা পড়া ও লেখা জানতে হবে, বয়স হতে হবে ন্যূনতম ১৮ বছর, এবং লাইসেন্স বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ‘সিটি করপোরেশন এলাকায় তিন চাকার স্বল্পগতির ব্যাটারিচালিত রিকশা (ই-রিকশা) চলাচল নীতিমালা-২০২৫’ চূড়ান্ত হলে নগর এলাকায় ই-রিকশার নিরাপদ ও নিয়ন্ত্রিত চলাচল নিশ্চিত হবে।
নীতিমালায় বলা হয়েছে, নতুন ই-রিকশার নকশা অনুমোদন দেবে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই)। এরপর বিদ্যমান পুরোনো রিকশা ধীরে ধীরে বন্ধ করে শুধুমাত্র নতুন অনুমোদিত নকশার রিকশা চলাচল করবে।
স্থানীয় সরকার বিভাগের উপসচিব মাহবুবা আইরিন জানান, খসড়া নীতিমালা ইতোমধ্যে লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগে পাঠানো হয়েছিল। কিছু পর্যবেক্ষণ যুক্ত করে খসড়া ফেরত আসার পর সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হলে নীতিমালাটি শিগগিরই চূড়ান্ত করা হবে।
জানা যায়, ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচলের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করে হাইকোর্টের রায়ের আলোকে রূপরেখা প্রণয়নে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), ঢাকা উত্তর-দক্ষিণ সিটি করপোরেশনসহ বিশেষজ্ঞ প্রতিনিধির সমন্বয়ে এই কমিটি করা হয়। গত বছর ২৭ নভেম্বর স্থানীয় সরকার বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (নগর উন্নয়ন) এ এইচ এম কামরুজ্জামানকে আহ্বায়ক এবং উপসচিব মাহবুবা আইরিনকে সদস্য সচিব করে আট সদস্যের কমিটি এক বছরেও নীতিমালা চূড়ান্ত করতে পারেনি। এই কমিটি গত ২৮ নভেম্বর, ১৯ ডিসেম্বর, ২৮ জানুয়ারি এবং ২৫ ফেব্রুয়ারি চারটি সভার আয়োজন করে। সর্বশেষ ১২ নভেম্বর পঞ্চম সভাটি হয়। এর মধ্যে এ এইচ এম কামরুজ্জামানকে স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে গত ২৭ আগস্ট বদলি করা হয়।
বর্তমানে দায়িত্ব পালন করা স্থানীয় সরকার বিভাগের অতিরিক্ত সচিব সুরাইয়া আখতার জাহান বলেন, আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর শুধু একটি বৈঠক হয়েছে।
ঢাকা নগরে চলাচল করা ব্যাটারিচালিত রিকশার সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান পাওয়া না গেলেও অনেকের ধারণা, এ সংখ্যা ১০ লাখের মতো।
ঢাকা মহানগরীতে ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচলের বিষয়ে করণীয় নির্ধারণের লক্ষ্যে সড়ক পরিবহন ও সেতু, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় উপদেষ্টা এবং প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়) উপস্থিতিতে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় খসড়াটি প্রস্তুত করা হয়। খসড়া নীতিমালার ওপর ইতোমধ্যে বুয়েট থেকে মতামত পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, বিদ্যমান রিকশা বন্ধ করে নতুন নকশার রিকশা চালু করার সিদ্ধান্তের কারণে নীতিমালা চূড়ান্ত করতে পারছে না সরকার।
স্থানীয় সরকার বিভাগ সূত্রে জানা যায়, সড়ক পরিবহন ও সেতু এবং প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়) জানিয়েছেন, ব্যাটারিচালিত রিকশায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি অনেক বেশি। এ জন্য বিদ্যমান রিকশা বন্ধ করে যাত্রীদের যাত্রীদের সুরক্ষা উপযোগী নতুন রিকশা চালু করতে হবে।
খসড়া নীতিমালায় বলা হয়েছে, লাইসেন্স নবায়নের ক্ষেত্রে পাঁচ বছর অন্তর ড্রাইভিং পরীক্ষা নেওয়া হবে। শিল্প মন্ত্রণালয় অনুমোদিত কারখানা বা ওয়ার্কশপের মাধ্যমে ই-রিকশা প্রস্তুত করতে বলা হয়েছে। ই-রিকশার উচ্চতা, টার্নিং রেডিয়াস, গ্রাউন্ড ক্লিয়ারেন্স অনুমোদিত স্ট্যান্ডার্ড নকশা গাইডলাইন অনুযায়ী নির্ধারণ করা হবে। ই-রিকশার মোটর, চেসিস, বডির সুরক্ষা ব্যবস্থাসহ সব যন্ত্রাংশ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত স্ট্যান্ডার্ড নকশার গাইডলাইন অনুযায়ী মানসম্মত হতে হবে। এ ছাড়া প্রতিটি ই-রিকশায় লুকিং গ্লাস বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্য বলছে, গত ঈদে ১৩ দিনে ঢাকায় ঘটে যাওয়া ৩১৫টি সড়ক দুর্ঘটনার প্রায় ১৫ শতাংশ ঘটেছে ব্যাটারিচালিত রিকশার কারণে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শারীরিক অবস্থা ঠিক থাকলেই রিকশার লাইসেন্স দেওয়া যেতে পারে। কারণ, হাত-পা ছাড়াও অনেকে এখন ব্যাটারিচালিত রিকশা চালাচ্ছেন।
বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক কাজী মো. শিফুন নেওয়াজ বলেন, রিকশা নির্মাতাদের কঠোরভাবে তদারকি করতে হবে। যাতে এসব যানবাহনের নকশায় প্রতি ঘণ্টায় সর্বোচ্চ গতি ২০ কিলোমিটারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। বর্তমানে ব্যাটারিচালিত রিকশা ঘণ্টায় ৩০ কিলোমিটার পর্যন্ত গতি তুলতে পারে। সরু রাস্তায় এই গতি দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।
যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, অবাধে আমদানি, স্থানীয় গ্যারেজে সহজলভ্যতা, সহজে রাস্তায় নামানোর সুযোগ থাকায় স্বল্প পুঁজিতে লাখ লাখ শ্রমজীবী মানুষ ব্যাটারি রিকশা কিনে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সড়কে নেমে পড়ছেন। এ জন্য শিগগির নীতিমালা প্রয়োজন।
ব্যাটারির রিকশাচালক ও তাদের সংগঠনের সদস্যরা বলছেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সড়কে ব্যাটারির রিকশার সংখ্যা বেশ বেড়েছে। সেই সঙ্গে নড়বড়ে পুলিশি ব্যবস্থার কারণে তারা অলিগলি থেকে চলে আসে মহাসড়কে, উঠে যায় উড়াল সড়কে।
এর মধ্যে গত ১৯ নভেম্বর হাইকোর্ট নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার পরদিন থেকেই রাস্তায় নামেন ব্যাটারিচালিত রিকশাচালকরা। বাস-ট্রেন আটকে তারা বিক্ষোভ করেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষেও জড়ান। ফলে হাইকোর্ট নিষেধাজ্ঞা দিলেও আপিল বিভাগের স্থিতাবস্থায় ঢাকার রাস্তায় চলার অনুমতি পেয়ে যায় ব্যাটারি রিকশা।
এর আগেও বিভিন্ন সময়ে ব্যাটারি রিকশা বন্ধের উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে আন্দোলনের মুখে তা বাস্তবায়ন করতে পারেনি আগের কোনো সরকার।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।



